উচ্চমানের ডেনিম উৎপাদনকারী হিসেবে সারা বিশ্বে এক নামে পরিচিত, তবে এখন পোশাক খাতের নিট ও ওভেনেও বিনিয়োগ করেছে বহু বছর ধরে সেরা রফতানিকারক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ। ১৯৯৪ সালে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির শুরুর দিকে বার্ষিক লেনদেন ছিল ২ মিলিয়ন ডলার। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সেটি ৫০০ মিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। তবে আগামী পাঁচ বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ। রফতানিতে এ লক্ষ্য অর্জনে নিজের কর্মপরিকল্পনা ছাড়াও সামগ্রিক রফতানি খাত নিয়েও কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সহসভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান রাশেদ এইচ চৌধুরী
দেশের রফতানি খাত ৫০
বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। রফতানি আয়ে মোট
প্রবৃদ্ধি হয়েছে
৩৪ দশমিক
৩৮ শতাংশ। বাংলাদেশের পণ্য
রফতানির ইতিহাসে এটা যেমন
সর্বোচ্চ আয়
আবার বছরজুড়ে প্রবৃদ্ধি হিসেবেও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে
বেশি। দেশের
অন্যতম একজন
রফতানিকারক হিসেবে আপনার অনুভূতি কেমন?
রফতানি
৫০ বিলিয়ন
ডলার অতিক্রম
নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের
জন্য একটা
বড় প্রাপ্তি।
ফলে উৎসাহিত
হওয়ার পাশাপাশি
আমাদের আরো
দায়িত্ব বাড়বে।
রফতানি ২০২৪
সালের মধ্যে
৮ হাজার
কোটি ডলারে
নিয়ে যাওয়ার
কথা বলা
হয়েছে। এ
অগ্রযাত্রা টেকসই
করতে আরো
নিবিড়ভাবে আমাদের
কাজ করে
যেতে হবে।
পণ্য ও
বাজারে বৈচিত্র্য
আনাসহ উৎপাদনশীলতা
বাড়াতে হবে।
গত অর্থবছরে
যে আমদানি
হয়েছে তাতে
উল্লেখযোগ্য পরিমাণ
ক্যাপিটাল মেশিনারিজ
এসেছে। এটা
একটা গুড
সাইন। কারণ
এ মূলধনি
যন্ত্রপাতি উৎপাদনের
সঙ্গে যুক্ত
হয়ে আমদানিনির্ভর
পণ্যের চাহিদা
পূরণ করে
আমদানি ব্যয়
কমাবে। নতুবা
রফতানির প্রবৃদ্ধি
সুসংহত করবে।
আবার কর্মক্ষম
জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য
অংশ উৎপাদন
খাতে সম্পৃক্ত
হবে।
দেশের একক
উদ্যোগগুলোই একসঙ্গে রফতানি খাতকে
আজ এ
সম্মানজনক পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে। রফতানি বাড়ানোর সামনে যে
লক্ষ্য তাতে
বিনিয়োগের সম্পর্কটি প্রসঙ্গক্রমেই চলে
আসে।
রফতানি
আয় বাড়াতে
আমরা পণ্যের
বহুমুখীকরণে মনোযোগ
বাড়িয়েছি। নতুন
অর্থবছরে একটি
ভালো গ্রোথ
নিশ্চিত করতে
বিনিয়োগও বাড়াচ্ছি।
কোম্পানির লভ্যাংশ
না তুলে
পরবর্তী বিনিয়োগের
উদ্যোগ নেয়ার
কনসেপ্টটি আমার
বাবার ছিল।
আমাদের মূল
যে ডেনিম
উৎপাদন সেখানে
দুইটা পুরনো
ফ্যাক্টরি টেকওভার
করে কার্যক্রম
শুরু করে
দিয়েছি। এ
প্রক্রিয়ায় ২০-২৫
শতাংশ পর্যন্ত
সক্ষমতা বেড়েছে।
পাশাপাশি দেশের
রফতানি আয়ের
প্রধান খাত
তৈরি পোশাক
শিল্পের দুটি
উপখাত ওভেন
ও নিটেও
বিনিয়োগ করলাম।
নিট পণ্যে
এরই মধ্যে
ভার্টিক্যাল সেটআপ
করেছি। ওভেনের
ক্ষেত্রেও আমাদের
উৎপাদন ব্যতিক্রমী
হবে। অর্থাৎ
নিট ও
ওভেন দুই
ক্ষেত্রেই উচ্চমূল্যের
প্রডাক্ট তৈরির
লক্ষ্য ঠিক
করেছি। টেকসই
হওয়ার পাশাপাশি
আরো বিভিন্ন
উপায়ে মূল্য
সংযোজন (ভ্যালু
অ্যাডিশন) তৈরি
করে আমাদের
এগোতে হবে।
বর্তমানে ৩৫
হাজার সদস্য
যুক্ত থাকলেও
নতুন নতুন
উদ্যেগে আরো
বড় কর্মসংস্থান
হবে প্যাসিফিকে।
উপযুক্ত টিমওয়ার্কের
মাধ্যমে বার্ষিক
টার্নওভার ১
বিলিয়ন ডলারে
উন্নীত করতে
উৎপাদন ব্যবস্থাকে
গ্লোবাল লাইফ
সলিউশন বেজড
করব। এজন্য
প্রতিনিয়ত গবেষণা
ও উদ্ভাবন
কার্যক্রমে জোর
দিচ্ছি আমরা।
প্রবৃদ্ধি কিংবা
ব্যবসা টেকসই
করতে কোন
বিষয়গুলোকে বেশি
গুরুত্ব দেয়া
প্রয়োজন বলে
মনে করছেন?
লক্ষ্যে
পৌঁছাতে তিনটি
বিষয়ের ওপর
বেশ গুরুত্ব
দিয়ে এগোতে
হবে। প্রডাক্ট
ডাইভারসিফিকেশন, ভ্যালু
অ্যাডিশন ও
মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন।
আমরা কোম্পানির
ব্যবসায়িক গ্রোথ
নিশ্চিত করতেও
এ বিষয়গুলোকে
গুরুত্ব দিয়ে
অগ্রসর হচ্ছি।
এটা ভালো
খবর যে
আগে শুধু
প্রচলিত দেশেই
রফতানি হতো।
এখন অপ্রচলিত
বাজারেও দেশের
পণ্য রফতানি
হচ্ছে। ব্যবসার
টেকসই সম্প্রসারণের
জন্য যথাযথভাবে
প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন
প্রয়োগও একটি
অনেক বড়
দিক।
ইউক্রেনে চলমান
যুদ্ধ নিয়ে
শঙ্কা আরো
বেড়েই চলেছে। উৎপাদন কিংবা
রফতানি কার্যক্রমে এতে কতটা
ব্যাঘাত ঘটছে?
আন্তর্জাতিক
পরিস্থিতি একটা
অনিশ্চয়তার মধ্য
দিয়েই যাচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধের প্রভাব
আরো ঘনীভূত
হতে পারে।
তুলার উচ্চমূল্য
কতটা ভোগাচ্ছে
সেটা ব্যক্ত
করাটাও কঠিন।
লজিস্টিক কস্ট
বেড়ে যাওয়ায়
কারখানার উৎপাদন
খরচ বেড়ে
একটা ঝুঁকিও
তৈরি করে
রেখেছে। আমাদের
রফতানি প্রবৃদ্ধি
হয়েছে কিন্তু
মূল্য সংযোজন
৩৫ শতাংশ
হয়নি। এটার
সঠিক তথ্য-উপাত্ত
বিশ্লেষণ করা
দরকার। পোশাক
খাতের রফতানি
প্রবৃদ্ধি দেখে
আয় বেড়েছে
মনে করারও
কারণ নেই।
মূলত আন্তর্জাতিক
চলমান পরিস্থিতিতে
কাঁচামালসহ অন্যান্য
খরচ বৃদ্ধির
কারণে এমনটা
হয়েছে। তুলা
যেখানে ৮০
সেন্ট দিয়ে
আমদানি হয়েছে
দেশে, সেখানে
এখন ১
ডলার ৪০
সেন্ট। ফলে
বেশি দামে
সুতা বিক্রি
হয়েছে। ফ্যাব্রিকস
ও অ্যাকসেসরিজ
কারখানায় যে
লাভ হতো
সেটা অনেক
কমে গেছে।
ইউরোপ-আমেরিকাসহ
প্রধান রফতানি
গন্তব্যগুলোতে মূল্যস্ফীতির
কারণে গতি
ধীর হয়ে
যাওয়ার শঙ্কাও
তৈরি হয়েছে।
বায়াররা যেহেতু
বর্তমান পরিস্থিতিতে
তাদের একটা
নির্ধারিত প্রাইসে
বিক্রি করবে
তাই আমাদের
বলছে তোমরা
প্রাইস কমাও।
এখন ফ্যাব্রিকসের
যে দাম
বেড়েছে সেখানে
ছাড় দিতে
হয়েছে। এখন
এফওবি বেড়েছে
কিন্তু সিএম
কমেছে।
রফতানির সামনের লক্ষ্য পূরণে
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও
পলিসি বিষয়ে
কিছু বলুন।
আমি
প্রথমেই বলব
রফতানিতে যে
নীতি তৈরি
করা হয়
সেটি কমপক্ষে
পাঁচ বছরের
জন্য হলেও
স্থায়ী করতে
হবে। এটা
শুধু পোশাক
খাত নয়,
বরং পুরো
রফতানি খাতের
জন্যই জরুরি।
দ্রুত পলিসির
পরিবর্তন একজন
উদ্যোক্তাকে বেশ
সমস্যায় ফেলে
দেয়। প্রতি
বছর বাজেটে
এ নিয়ে
একটা শঙ্কা
থেকে যায়।
বাজেটে রফতানি
আয় থেকে
কর্তনকৃত উৎসে
কর শূন্য
দশমিক ৫
শতাংশ থেকে
বাড়িয়ে ১
শতাংশ করা
হলো। আরেকটি
বিষয় হলো
জ্বালানি সুরক্ষা।
গ্রোথ বাড়াতে
কারখানা বাড়াতেই
হবে। তখন
স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস
ও ইলেকট্রিসিটি
ডিমান্ড করবে।
ধরুন আমি
যথাযথ কর্তৃপক্ষের
আশ্বাস পেয়ে
কারখানা গড়ে
তুললাম কিন্তু
উৎপাদন শুরু
করতে যদি
গ্যাস পাওয়ার
জন্য বসে
থাকতে হয়
প্রতিদিন প্রতি
ঘণ্টা, তাহলে
এর খেসারত
দিয়ে যেতে
হবে। সময়মতো
ইউটিলিটি সার্ভিস
নিশ্চিত করা
না গেলে
ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ
উল্টো লায়াবিলিটিজ
হয়ে যাবে।
সঙ্গে দক্ষ
কর্মীও বাড়তে
হবে। এখন
পর্যন্ত এ
চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা
করা গেছে।
এর ধারাবাহিকতা
রক্ষা করা
না গেলে
দেশের রফতানি
খাতের লক্ষ্যে
যাওয়াটাও চ্যালেঞ্জিং
হবে। আরেকটি
বিষয় হলো
নির্বাচনের সময়
ঘনিয়ে আসছে।
ব্যবসা পরিকল্পনা
ও বিনিয়োগ
সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা
সামাজিক নিরাপত্তা
ও রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা চায়।
ব্যবসার উন্নয়নে
এটা জরুরি।
একটা সময়ে
শুল্কমুক্ত বাজার
সুবিধা না
পাওয়া গেলে
প্রতিযোগিতা ধরে
রাখতে কতটা
সক্ষম হবে
রফতানিকারকরা?
বাংলাদেশের
রফতানিকারকদের সক্ষমতা
এখন প্রতিষ্ঠিত।
শুল্কমুক্ত বাজার
সুবিধা যে
কাউকেই প্রতিযোগী
দেশ থেকে
এগিয়ে রাখবে।
২০২৬ সালে
স্বল্পোন্নত দেশের
(এলডিসি) থেকে
বাংলাদেশের বের
হওয়ার সময়সীমা
নির্ধারণ করা
হয়েছে। এলডিসি
তালিকা থেকে
বের হওয়ার
পর বাংলাদেশসহ
অন্যান্য এলডিসিভুক্ত
দেশ শুল্কমুক্ত
বাজার সুবিধা
পাচ্ছে, সেটা
আরো কয়েক
বছর অব্যাহত
রাখা প্রয়োজন।
তাই এলডিসির
পক্ষ থেকে
ডব্লিউটিওতে দেয়া
শুল্কমুক্ত বাজার
সুবিধার প্রস্তাব
বাংলাদেশের জন্য
খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু কিছু
দেশের সঙ্গে
এফটিএ করে
ফেলতে হবে।
যেটা ভিয়েতনাম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের
সঙ্গে সম্পন্ন
করে ফেলেছে।
আবার এশিয়ান
মার্কেটের বড়
বেনিফিট পেতে
আশিয়ানের মতো
ব্লকগুলোও কনফার্ম
করে ফেলতে
হবে। না
হয় রফতানি
নিয়ে আরেকটা
বড় চ্যালেঞ্জ
সামনে চলে
আসবে। সরকারের
সহায়তার পাশাপাশি
উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টা,
মেধা, শ্রমেই
লক্ষ্যে পৌঁছানো
সম্ভব হবে।
আগামী পাঁচ
বছরে নিজেকে কোথায় নিয়ে
যেতে চায়
প্যাসিফিক জিন্স
গ্রুপ?
প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ঠিক করাই আছে। রফতানিমুখী পোশাক খাতে গ্লোবাল লাইফ সলিউশন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি আমরা। অর্থাৎ একজন মানুষের সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত যত ধরনের পোশাক দরকার হয়, তার সবই প্রস্তুত করবে প্যাসিফিক জিন্স। আগামী পাঁচ বছরে ব্যবসা দ্বিগুণ করতে মোটা দাগে পাঁচ ধরনের নীতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানটির। এগুলো হলো একীভবন, গতি, উদ্ভাবন, মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।





