ড. এম শামসুল আলম জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় গঠিত কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা। ভোক্তার জ্বালানি অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষাসম্পর্কিত বিষয়ের ওপর গবেষণা করেন। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অনুপাতে চাহিদা বাড়েনি। এ কারণে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক শিল্প নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ব্যবহার করছে। এমন পরিস্থিতি টেকসই বিদ্যুৎ খাতের জন্য কতটা সহায়ক?

১০-১২ বছর আগে মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে এবং বিদ্যুৎ খাত পরিকল্পনার বিভিন্ন জায়গা চিহ্নিত করে আমরা বলেছিলাম, ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ের লক্ষ্যেই এসব পরিকল্পনা। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে ঘাটতি পূরণের বিষয়টি মহাপরিকল্পনা বা পাঁচসালা পরিকল্পনাগুলোর কোনোটাতেই তেমন গুরুত্ব পায়নি। যদিও এ খাত উন্নয়নে বারবার প্রতিযোগিতা সৃষ্টি ও সবার জন্য সমান ক্ষেত্র তৈরির কথা বলা হয়েছে। বিনিয়োগকারী, গ্রাহক ও উৎপাদন সংস্থা বা কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়। সে লক্ষ্যে প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করা হয়েছে, পক্ষদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রেগুলেটরি কমিশন করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান সবই মূলত অকার্যকর। এগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। তারা কখনই জ্বালানি অধিকার রক্ষায় ভোক্তাবান্ধব নৈপুণ্য দেখায়নি।

২০০৪-০৫ সাল থেকে বিতরণক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। আমরা বারবার বলেছিলাম মানুষকে যেহেতু বিদ্যুৎ দিতে পারছেন না, সেহেতু বিতরণক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ানো উচিত হবে না। তখন বলা হয়েছিল, একসময় তো কাজে লাগবেই। এ যুক্তিতেই হাজার হাজার কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। কতটুকু দরকার, সেই চাহিদা নিরূপণ করে বিতরণক্ষমতা বাড়ানো বা অবকাঠামো তৈরি হয়নি। বলা যেতে পারে, প্রান্তিক পর্যায়ে, বণ্টন পর্যায়ে কিছু অসাধু ব্যবসা তৈরি হয়েছে। কিছু ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে যে বিতরণ ইউটিলিটির ৪ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ছিল, এখন সে ইউটিলিটির সম্পদ ১৪ হাজার কোটি টাকার। তার মানে বিতরণে যে সম্পদ বাড়ানো হয়েছে, সেই অনুপাতে বিতরণক্ষমতা বেড়েছে কিনা, বাড়লে এর পুরোটা কাজে লাগে কিনা, দরকার আছে কিনা বা এত ব্যয়ে এ সম্পদ অর্জন করা যৌক্তিক ছিল কিনা—এসব প্রশ্ন কখনই খতিয়ে দেখা হয়নি।

আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা আছে কিন্তু কেবল সঞ্চালনক্ষমতার অভাবেই আমরা বিদ্যুৎ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠাতে পারছি না। এ অজুহাতে এখন সঞ্চালনক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সঞ্চালনক্ষমতা বৃদ্ধির একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সে কাজের জন্য ২০১৬ সালে বিওটি বেসিসে বিনা দরপত্রে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। ২০২১ সালে তা গতি পায়। বাতিল হয়নি। তারা বাইরের ব্যাংক থেকে অতি উচ্চসুদে ঋণ গ্রহণ করবে। সেই ঋণের অর্থে তারা সঞ্চালনক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, সঞ্চালন লাইনের আমূল সংস্কার করবে, গ্রিড সাবস্টেশন করবে, নতুন সঞ্চালন লাইন বসাবে, বিকল্প লাইন নির্মাণ করবে প্রভৃতি বলা হচ্ছে। যে পরিকল্পনার ভিত্তিতে এ আয়োজন, বাস্তব চাহিদার সঙ্গে তা অসংগতিপূর্ণ। তারপর আরো ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যে ইউনিট এখনো বসানোই হয়নি, যার কোনো দরকারও নেই, সেই ইউনিটের কয়লাবিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য তড়িঘড়ি করে লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের মধ্যে সেই সঞ্চালন লাইন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে সিওডি ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছে। ইউটিলিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে উৎপাদনক্ষমতা সারপ্লাস হবে প্রায় ৬৭ শতাংশ। তাই উন্নয়ন পর্যায়ে থাকা সব সঞ্চালন লাইন এবং উৎপাদনক্ষমতার সিওডি ঘোষণা ২০৩০ সালের পরে করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, প্রতি কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় প্রায় ৯৮ লাখ টাকা আর বাংলাদেশে ১০ কোটি টাকা। এই অত্যধিক অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় ও মানহীন বিদ্যুেসবাই প্রমাণ করে সরকার উদ্যোক্তা হিসেবে কতটা সফল!

কয়েক লাখ কোটি টাকা ব্যয় ধরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগোনো হচ্ছে। বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে। সিভিল কনস্ট্রাকশনে, যেমন রেস্ট হাউজ নির্মাণ, দালানকোঠা নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির আলামত পাওয়া যাচ্ছে। কারিগরিভাবে দক্ষ লোকবল বাইরে থেকে আনা হচ্ছে। এভাবে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। কাজেই আগেই বলেছি, কয়লা থেকে সরে আসাটাকে আমরা ইতিবাচক বলতাম, যদি এসব বিষয়ভিত্তিক সংশয় ও সন্দেহ এবং অভিযোগ যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করে আমাদের মনে এ আশা জাগানো হতো যে আগামীতে আমরা একটি স্বচ্ছ ও টেকসই প্রক্রিয়ার মধ্যে আসব, যার দ্বারা ভোক্তার জ্বালানি অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা প্রবৃদ্ধির মানদণ্ড ধরা হয়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি যত হবে, তার প্রায় দেড় গুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে, মূলত এটিই চাহিদা প্রাক্কলনের মানদণ্ড। কিন্তু উৎপাদন, সরবরাহ, সঞ্চালন বিতরণ ও সংরক্ষণ পর্যায়ে কার্যদক্ষতা দরকার, তা দেখা হয়নি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও তার প্রভাব বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধিতে ততটা জোরালো নয়। চাহিদার প্রাক্কলনে যদি ভুল থাকে, তাহলে পরিকল্পনাও ঠিক হয় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রাক্কলন যদি এসব বিবেচনায় করা হতো, তাহলে এত বেশি উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির দরকার হতো না। ভোক্তাদের এত বেশি মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতের শিকারও হতে হতো না। শিল্প খাতে একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কোটায়, অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুত্প্রাপ্তি অনিশ্চিত। তবে অনুৎপাদনশীল খাতে ভর্তুকিজনিত বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি উন্নয়নকে হুমকির মধ্যে রেখেছে। তাই এ খাত উন্নয়ন পরিকল্পনায় বর্ণিত বিষয়াদি আমলে নেয়া জরুরি।

সরকার থেকে বলা হচ্ছে, বিনিয়োগ উদ্যোগ আসছে এবং বাস্তবায়নাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। সে চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এ যুক্তি কি সঠিক?

লক্ষ্য ভালো, উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষুদ্র কুটির শিল্পকে প্রমোট করার জন্য বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছিল। সেগুলোকে বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা শক্তিশালী করতে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে তারা বঞ্চনার শিকার হয়েছে। বৃহৎ শিল্প ১৩২ কেভি লাইনে বিদ্যুৎ পায়। ক্ষুদ্র কুটির শিল্প এলটি লাইনে বিদ্যুৎ পায়। সে বিদ্যুৎ মানসম্মত না হওয়ায় তারা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের শিকার হয়েছে। তাদের উৎপাদন সক্ষমতা যথাযথ ব্যবহার করতে না পারায় এখন অনেকেই দেউলিয়া। এ অভিজ্ঞতা প্রথমেই নীতিনির্ধারকদের শোনা ও বোঝা দরকার। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিসিক শিল্পনগরীর মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। এখানে উদ্যোক্তা বড় ও দেশী-বিদেশী। আর বিসিকে ছোট ছোট দেশীয় উদ্যোক্তা। এর বাইরে আমি আর কোনো পার্থক্য দেখি না। অবকাঠামোগত সুবিধাসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের দায় সরকারের। সরকার এভাবে তার দায় মেটাতে চেয়েছে। বিদ্যমান শিল্পকেই এখন পর্যন্ত টেকসই ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। সেখানে নতুন বড় শিল্প-কারখানায় মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ কীভাবে জোগান দেবে? এমন অবস্থায় শিল্পে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণে অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ ও বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আমাদের উদ্যোক্তারা নিম্নমানের নৈপুণ্য দিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করতে পারেন, কিন্তু বিদেশী উদ্যোক্তারা কি এ সংগ্রামে লিপ্ত হবেন? সস্তায় কর্মী পাওয়ার প্রলোভনে তাদের এখানে টেনে আনার বিষয়টি যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের সাশ্রয়ী মূল্যে টেকসই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। নইলে তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবেন না। একদিকে টেকসই জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত। সরকার ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রাষ্ট্রীয় খাতে স্বল্প ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে উৎপাদনক্ষমতা বসিয়ে রেখে ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস দিয়েছে এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশি দামে কিনেছে। অনুরূপভাবে ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের দেশী শিল্পকে বঞ্চিত করে ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকে অসম জ্বালানি সুবিধা দেয়া হলে তার পরিণতি শুভ হবে না। এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের মহাপরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

কয়লা বিদ্যুৎ থেকে সরে আসা না-আসা, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে অযৌক্তিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কহীন। বরং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চীন ও ভারত ২০৪০ সাল পর্যন্ত নিজস্ব কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যদিও প্যারিস জলবায়ু চুক্তির সঙ্গে তাদের এ নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া ঘাটতি সমন্বয়ের বিদ্যমান কৌশল হলো ভর্তুকি প্রত্যাহার ও মূল্যবৃদ্ধি। কিন্তু মহাপরিকল্পনায় সে কৌশলের কোনো রদবদল নেই।

এখন আসি কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা থেকে সরকারের সরে আসা প্রসঙ্গে। এটি তেলবিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে ফিরে আসার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তৈরি হয়নি, সেগুলো সরকার আর তৈরি করবে না। সেগুলোর পরিবর্তে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হবে, সেটি স্পষ্ট করা হয়নি। মহাপরিকল্পনায় হয়তো স্পষ্ট করা হবে। পাশাপাশি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় প্রায় ৩৫ শতাংশ। এ উৎপাদনক্ষমতাই আসলে বিদ্যুৎ খাতে অর্থ ঘাটতির অন্যতম কারণ। এ ঘাটতি সমন্বয়ের জন্যই কি কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা পরিহার করা হচ্ছে? উপরন্তু সরকার কী বলেছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ে কেনা রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা হবে, যেখানে ভর্তুকির সিংহভাগ চলে যাচ্ছে। কিংবা বলা হয়েছে, সেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি নবায়ন করা হবে না। এসব কোনো কথাই সরকার বলেনি।

অধিকন্তু গ্যাস থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছিল, সেখানে এলএনজি আসার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকিতে গ্যাস দিতে গিয়ে এখন বাড়তি আর্থিক ঘাটতির শিকার হতে হচ্ছে। সবার ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে যেখানে ভর্তুকিতে বিদ্যুৎ দিতে হচ্ছে (প্রায় ৬১ শতাংশ বিদ্যুৎ বেশি দামে কিনে কম দামে দিতে হয়), সেখানে যদি তেলবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা যেত, তাহলে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধিতে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে সরকার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে যে কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে নেয়া হয়েছিল, কয়লার পরিবর্তে যে জ্বালানি নিতে চাইছে, তাতে আরো মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। ভোক্তা মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিয়ে কয়লার পরিবর্তন মেনে নিতে চায় না। আমরা কয়লার পরিবর্তন চাই। কয়লার পরিবর্তে অন্য বিকল্প জ্বালানি আসুক, যা পরিবেশবান্ধব হবে। কিন্তু সেখানে এমন ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনা থাকতে হবে, যাতে উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সেই ধরনের দিকনির্দেশনা আমরা দেখছি না। ভোক্তাবান্ধব নীতি ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মূল্য নিয়ন্ত্রণ, অর্থ ঘাটতি দূর করা এবং পরিবেশসহ মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব নয়। আজকের অবস্থার জন্য পরিকল্পনাগত অসংগতিই মূলত দায়ী।

জ্বালানি খাতের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু তা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। সরকার বরাবরই কতগুলো বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। একটি হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়া। আগে গ্যাস লাভজনক খাত ছিল। এলএনজি আসার পরে গ্যাস এখন লোকসানি খাত। আগে সরকার এ খাত থেকে ৪-৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেত। এখন এলএনজির জন্য প্রতি বছর ৭-৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগে। বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে। এ ভর্তুকি উত্তরোত্তর বাড়ছে। দ্বিতীয়টি হলো সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতিমুক্ত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকত, মূল্যবৃদ্ধি ও ভর্তুকির দরকার হতো না। তা না হওয়ায় মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পায় না। পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ে। দেখা যাচ্ছে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে পানি ও গণপরিবহনের মতো সেবার মূল্যও উত্তরোত্তর বাড়ানো হচ্ছে।

 

শ্রুতলিখন: হুমায়ুন কবির ও রুহিনা ফেরদৌস