জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস আজ। দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

জ্বালানি নিরাপত্তার বা তার অবকাঠামো উন্নয়নে কোনো অগ্রগতি হয়নি। জ্বালানি আহরণের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলো শেল গ্যাসে বিনিয়োগ করেছে। অর্থাৎ দেশের বাইরে জ্বালানি আহরণের জন্য বিলিয়নস অব ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারত ও মালয়েশিয়া তার উদাহরণ।

একমাত্র রিফাইনারি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করার জন্য প্রায় ১০ বছর আগে নেয়া উদ্যোগের কোনো অগ্রগতি নেই। ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল না করে এফএসআরইউ দেয়া হচ্ছে। এফএসআরইউ বছরের চার মাস পরিচালনা করে মনসুনকালে বন্ধ থাকে অথচ আমাদের প্রচুর পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান করতে হয়। এতে দেশ লাভবান হচ্ছে না।

দেশের জ্বালানি খাতে এলপিজি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে গ্যাস সংযোগ না থাকায় বাসাবাড়িতে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। এ খাতে জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কতটুকু গড়ে তোলা গেছে?

এলপিজির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু এলপিজি নীতিমালার পরিবর্তন প্রয়োজন। এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য যে ডিপ সি টার্মিনাল করার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। এলপিজির ৯৮ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করে থাকে। সেজন্য ডিপ সি টার্মিনালও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে দেয়া বাঞ্ছনীয়।

দেশে জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও এলপিজির ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে পেট্রোলিয়াম আইন সংশোধন করে এ সেক্টরে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। রিফাইনারি অবিলম্বে সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করে তার সক্ষমতা প্রতিদিন ৩৫ হাজার ব্যারেল থেকে বাড়িয়ে দেড় লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে হবে। ইনভেন্টরিতে কমপক্ষে ৯০ দিনের মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। ডাবলমুরিং ব্যবস্থা অবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে। তাছাড়া ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বেসরকারি খাতকে আমদানি ও বিতরণের সুযোগ দিতে হবে।

এলএনজি ও এলপিজির প্রস্তাবিত ল্যান্ড বেজড ডিপ সি টার্মিনাল মাতারবাড়ীতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যোগ্যতাসম্পন্ন কোম্পানিকে প্রদান করতে হবে। আমদানি ও বিতরণ আধুনিক পদ্ধতিতে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। যাতে ভোক্তা ক্রয়কৃত পণ্যের গুণগত মান ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়। এলপিজি বিতরণ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ক্রস ফিলিংসহ অবৈধ কাজে সম্পৃক্ত। লিখিত অভিযোগ করার পরেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগ দান করতে হবে। এখন পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। অপারেটরদের বিভিন্ন লাইসেন্স নবায়নে সময় ব্যয় করা হয়। বিইআরসিকে দুর্নীতিমুক্ত ও রিস্ট্রাকচার করতে হবে, বিইআরসির লাইসেন্স ফি কমাতে হবে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে শিল্প খাত প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা দেশে কী রকম?

আমাদের দেশে মিশ্র জ্বালানির মজুদ গড়ে তুলতে হবে। শুধু এলএনজি আমদানি নির্ভরশীল হওয়া সঠিক হবে না। জাপান সম্পূর্ণ জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রথম সারিতে রয়েছে।

আমদানি সম্প্রসারণ, মজুদ ও ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হলে শিল্পে প্রতিযোগিতামূলক জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব। বর্তমান আমদানি লজিস্টিক ও দুর্নীতিতে যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে বা বেশি দাম দিতে হচ্ছে সেটা দূর করতে পারলে জ্বালানির ক্রয়মূল্য অনেক কমে যাবে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম স্থিতিশীল। সরকার বলছে এ খাতে আরো বিনিয়োগ দরকার, সেই প্রচেষ্টা আপনারা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু খুব বেশি অগ্রসর লক্ষ করা যাচ্ছে না উদ্যোক্তাদের। পিছিয়ে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতা কী কী হতে পারে?

বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা আগেই উল্লেখ করেছি। আমাদের অর্থনীতি গতিশীল এবং চাহিদা বাড়ার কারণে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে। বেসরকারি খাত যাতে সহজে উপযোগী ভূমি পেতে পারে সরকারের সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বেসরকারি খাত কীভাবে ও কতটুকু ভূমিকা রাখছে?

সরকার যেসব খাত বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে, সেগুলো স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বমানের লুব্রিক্যান্টস ট্রান্সফরমার অয়েল, গ্রিজ, এলপিজি ও বিটুমিন খাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এগুলো কেপিআই ও এসব খাতে সরবরাহে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হননি গ্রাহক।

গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মতো এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় আকারে অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় কিনা?

এলপিজির জন্য বড় ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমান নীতিমালার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এ সেক্টরে বিনিয়োগের জন্য এলপিজি অপারেটররা খুবই আগ্রহী। বিনিয়োগ প্রণোদনা প্রদান করলে আগামী এক বছরে এলপিজি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।

এনার্জি খাতে সবাই টেকসই ও নিরাপত্তার কথা বলছে, বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য। নিরাপত্তার যেসব আইনকানুন আছে সেগুলোর তদারকি হচ্ছে না। তাছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর এ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য আমরা সরকারের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছি।

এ বছর জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসে লোয়াবের পক্ষে আপনার পরামর্শ বা মতামত জানতে চাই।

দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নয়নে একটি অভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করা সময়োপযোগী। সরকার ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।