মেগাসিটি ঢাকার জন্য প্রথম স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) প্রণয়ন হয় ২০০৫ সালে। পরবর্তী সময়ে এটা জাইকার সহযোগিতায় রিভাইজ করে রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি) করা হয়। আমি ছিলাম রিভাইজড প্ল্যানের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য। সে পরিকল্পনায় ছয়টা এমআরটি, দুইটা বিআরটি, ছয়টা এলিভেটেড লাইন ও তিনটা রিংরোডের প্রস্তাব দিয়েছি আমরা। ছয়টি এমআরটি লাইনের মধ্যে যেটা এমআরটি-৬ করিডোর, যা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত; এটাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেহেতু এখানকার জনসংখ্যা বেশি এবং উত্তরা সম্ভাবনাময় এলাকা, বিধায় এই করিডোরকে প্রাধান্য দেয়া হয়। আমরা দেখেছি, এখানে একটি মিসিং লিংক ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি-৬ হবে। কিন্তু ট্রান্সপোর্ট করিডোর বিবেচনায় মেজর মাল্টিমোডাল হাব হবে কমলাপুর। তো একজন যাত্রী মতিঝিল নেমে কমলাপুর যাবে কীভাবে—এই মিসিং লিংকটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। সেখানে আমরা নগর পরিকল্পনাবিদরা যত সভায় অংশগ্রহণ করেছি প্রতিটিতেই বলেছি, এই মিসিং লিংকটা সংযুক্ত হওয়া প্রয়োজন। একজন মানুষ আন্তঃজেলা ট্রেনের জন্য কমলাপুর যাবে, তখন তো তাকে মতিঝিল নেমে আবার ভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর লাইনের ইন্টারসিটি ট্রেনগুলো কানেক্ট করতে চাইলে এই মিস লিংকটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আনন্দের কথা, দেরিতে হলেও লাইনটা কমলাপুর পর্যন্ত সংযুক্ত হয়েছে।
মেট্রোরেলের
মূল চ্যালেঞ্জ
ছিল ডিপোর
জায়গা পাওয়া।
তখন ২২
হেক্টরের মতো
প্রয়োজন ছিল।
এ পরিমাণ
জায়গা উত্তরা
ও আশপাশের
কোথাও ছিল
না। আবার
নতুন করে
যদি জমি
অধিগ্রহণ করা
হয় তাহলেও
অনেক সময়
লেগে যাবে।
তখন তত্কালীন
ডিটিসিবি (বর্তমানে
যা ডিটিসিএ)
থেকে সিদ্ধান্ত
নিল উত্তরা
থার্ড ফেইজ
থেকে কিচেন
মার্কেট এবং
বাস টার্মিনালের
জন্য নির্ধারিত
জায়গা হস্তান্তরের
জন্য। রাজধানী
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও
(রাজউক) ঢাকার
প্রথম ম্যাস
ট্রানজিটের ডিপোর
জন্য জায়গা
ডিটিসিএর অনুকূলে
বরাদ্দ দেয়ার
সিদ্ধান্ত নেয়।
পরবর্তী
সময়ে যখন
কাজ শুরু
হয়, তখন
এমআরটি লাইনের
যে মূল
কাজ—স্টেশন
ও স্টেশনকেন্দ্রিক
অবকাঠামো উন্নয়ন,
সেটা ডিপিপিতে
ছিল না।
পৃথিবীর বহু
দেশে যখন
মেট্রো স্টেশন
বা কনভেশনাল
রেল অথবা
ম্যাস র্যাপিড
ট্রানজিট নির্মাণ
হয়, এগুলোর
পরিচালন ব্যয়
কখনই যাত্রী
ভাড়া থেকে
উঠে আসে
না। এত
বিশাল বিনিয়োগ
শুধু যাত্রী
ভাড়া থেকে
উঠে আসা
সম্ভবও নয়।
তখন নন
রেলবিজনেস করা
জরুরি হয়ে
পড়ে। যেমন
জাপানে শুধু
সরকার নয়,
ব্যক্তি খাত
তথা রিয়েল
এস্টেট প্রতিষ্ঠানকেও
এমআরটি লাইন
নির্মাণের সুযোগ
দেয়া হয়।
রিয়েল এস্টেট
কোম্পানিগুলো স্টেশন
বানিয়ে আশপাশে
কমার্শিয়াল হাব
তথা শপিংমল,
হোটেল ইত্যাদি
তৈরি করে।
সেখান থেকে
যে লাভ
আসে তা
দিয়ে রেলের
পরিচালন ব্যয়
নির্বাহ করে।
এটাকে টিওডি
বা ট্রান্সজিট
অরিয়েন্টেটেড ডেভেলপমেন্ট
বলা হয়।
আমাদের এমআরটির
কাজ শুরু
হলে আমরা
দেখি যে
এই টিওডি
ডেভেলপমেন্টের বিষয়টি
অন্তর্ভুক্ত করা
হয়নি। আর
সেটা না
করার কারণ
হলো নতুন
কাজ, নতুন
অভিজ্ঞতা, আবার
যদি স্টেশনকেন্দ্রিক
অবকাঠামো নির্মাণ
করা হয়,
তাহলে তো
মূল কাজটিই
দেরি হয়ে
যাবে। পরবর্তী
সময়ে কাজের
শেষ পর্যায়ে
এসে ডিএমটিসিএল
(ঢাকা ম্যাস
ট্রানজিট কোম্পানি
লিমিটেড) দুটি
স্টেশনে বিষয়গুলো
অন্তর্ভুক্ত করে।
রাজউকের উত্তরা
থার্ড ফেইজ
প্রকল্প, যেখানে
কমার্শিয়াল প্লট
হিসেবে ডেভেলপমেন্ট
করার কথা
ছিল, সেটা
সরকারের সিদ্ধান্ত
অনুযায়ী ডিএমটিসিএলকে
হস্তান্তর করা
হয়। উত্তরা
সেন্টার ও
উত্তরা নর্থ
স্টেশনে এখন
স্টেশনকেন্দ্রিক অবকাঠামো
নির্মাণ হচ্ছে।
কিন্তু বাকি
আরো যে
১৪টি স্টেশন
আছে, সেখানে
কিন্তু এ
বিষয়ে কিছু
বলা নেই।
আমরা নতুন
ড্যাপে এ
বিষয়ে একটি
পলিসি গাইডলাইন
দিয়েছি। এমআরটি
স্টেশনকে কেন্দ্র
করে পৃথিবীর
বহু দেশে
২০০ মিটার
বা ৫০০
মিটার, ক্ষেত্রবিশেষ
এক হাজার
মিটার ক্যাচমেন্ট
এলাকায় টিওডি
উৎসাহিত করা
হয়।
স্টেশনকেন্দ্রিক
অবকাঠামো উন্নয়ন
এলাকায় সাধারণত
প্লটের আকারগুলো
বড় হয়।
সেখানকার ভূমি
আবাসিক কাম
বাণিজ্যিক এরিয়া
হিসেবেও ব্যবহার
হয়। হোটেল,
রেস্টুরেন্ট, পার্ক
ইত্যাদি প্রাধান্য
দেয়া হয়।
আর্থিকভাবে লাভবানের
পাশাপাশি বড়
একটি উদ্দেশ্য
থাকে, মানুষ
যেন পায়ে
হাঁটার দূরত্বেই
গাড়ি পেয়ে
যায়। কেউ
যদি এক
স্টেশন থেকে
আরেক স্টেশনে
যাওয়ার জন্য
৫০০ মিটার
হেঁটেই ট্রেন
পেয়ে যায়,
তাহলে সে
কিন্তু অন্য
কোনো যানবাহনে
চড়বে না।
ফলে রাস্তায়
গাড়ির পরিমাণ
কমে যাবে।
ডেভেলপাররা যেন
মেট্রো এলাকায়
বিনিয়োগ করেন,
এজন্য আমরা
ডিটেইল্ড এরিয়া
প্ল্যানে ২০২২-৩৫
(ড্যাপ) উচ্চ
ফ্লোর এরিয়া
রেশিও বা
ফার দিয়েছি।
বর্তমানে দশমিক
৫ ফার
বোনাস হিসেবে
প্রদান করা
হচ্ছে। এটার
পরিমাণ আরো
বাড়তে পারে।
আমাদের উদ্দেশ্য,
অধিকসংখ্যক যাত্রী
যেন মেট্রোরেল
ব্যবহার করে।
মানুষ যদি
বাস বা
প্রাইভেটকারে যাতায়াত
করে, তাহলে
কিন্তু মেট্রারেলের
সুফল খুব
একটা পাওয়া
যাবে না।
শুরুর
দিকে টিওডির
জন্য উত্তরা
ও গাবতলী—এ
দুই স্টেশনে
পাইলটিং করে
দেবে রাজউক।
এখানে দুটি
কনসেপচুয়াল ডিজাইন
করা হবে।
আমাদের পলিসি
গাইড পুরোপুরি
প্রস্তুত হয়ে
গেলে প্রাইভেট
প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডাকব।
তাদের উৎসাহিত
করব। আনন্দের
কথা হলো
এরই মধ্যে
বেশ কয়েকটি
প্রতিষ্ঠান টিওডিতে
আগ্রহ প্রকাশ
করেছে।
টিওডি
ইস্যুটা কিন্তু
সহজ নয়।
জাপানের মতো
দেশে কোথাও
কোথাও এটি
করতে ১০০
বছর পর্যন্ত
লেগে গেছে।
তার মানে
আমরা অনেক
পিছিয়ে তা
কিন্তু না।
যেহেতু আমাদের
অপারেশন শুরু
হয়েছে, ধরে
নিতে পারি
আমরা মূল
ধারায় আছি।
আমাদের দুর্বলতার
মধ্যে বড়
দুর্বলতা হলো
কয়েকটি স্টেশনে
এখনো মিসিং
লিংক রয়ে
গেছে। যেমন
শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া
স্টেশনে যদি
যাত্রী নামে;
তাকে ফুটপাথে
নেমে যেতে
হবে। আরেকটি
স্টেশনে যেতে
হলে তাকে
অন্য গাড়ি
ব্যবহার করতে
হবে। তবে
মনে রাখতে
হবে মেট্রোরেল
কখনো ডোর
টু ডোর
সেবা দিতে
পারে না।
এসব এলাকায়
যদি টিওডির
পরিকল্পনা নেয়া
হয়, তাহলে
আশা করি
সমস্যা কেটে
যাবে।
রাজউক থেকে আমরা এমআরটির যেকোনো কাজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। যখনই আমাদের কাছে কোনো ফাইল এসেছে, জমির ছাড়পত্র বা অন্যান্য যে চাহিদা ছিল সেটা যত দ্রুত সম্ভব করে দিয়েছি। ডিপোর জায়গা নির্বাচনের জন্য শুক্র-শনিবারও আমরা ঢাকার প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে স্থান নির্বাচনের কাজ করেছি। দেশের এত বড় স্বপ্নযাত্রার সঙ্গী হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।
সর্বোপরি,
দেরিতে হলেও
আমরা এমআরটির
যুগে প্রবেশ
করেছি। আসলে
ঢাকার মতো
এত জনঘনত্ব
এলাকায় এমআরটির
বিকল্প ছিল
না। আমাদের
নগর পরিকল্পনাবিদদের
দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা
ছিল মেগাসিটি
ঢাকায় এমআরটি
সেবা শুরু
হবে, সেটা
শুরু হয়েছে।
এজন্য মাননীয়
প্রধানমন্ত্রীকে জনগণের
পক্ষ থেকে
অভিনন্দন জানাতেই
হয়।
লেখক: প্রকল্প পরিচালক, ড্যাপ
কারিগরি সদস্য, রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি)।





