বর্তমানে দেশের ক্রেডিট কার্ডের বাজার কেমন যাচ্ছে?

গত বছর ক্রেডিট কার্ডের বাজারে ভালো প্রবৃদ্ধি ছিল। মূলত কভিডের কারণে মানুষের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রবণতা বেড়েছে, যা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্রেডিট কার্ড অনেকের কাছেই বিপদের বন্ধু হয়ে উঠেছে। আগে অনেকের কাছেই ৮-১০টি ক্রেডিট কার্ড থাকত। কিন্তু বর্তমানে এ প্রবণতা কমে গেছে। এর কারণ হচ্ছে আগে কেন্দীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোয় (সিআইবি) ক্রেডিট কার্ডের ঋণের তথ্য রেকর্ড থাকত না। কিন্তু বর্তমানে এটি রেকর্ড থাকে। এতে অনেকের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণ নেয়ার লিমিট কমে যায়। এ কারণে অনেকেই বাড়তি ক্রেডিট কার্ড কমিয়ে ফেলছেন। তবে নতুন কার্ডধারীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু বিদ্যমান কার্ডধারীর সংখ্যা কমে গেছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে গত বছর থেকে ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে ক্রেডিট কার্ডের বাজারে বড় একটি ধাক্কা লেগেছে। তবে বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের একটি বড় বাজার রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কিছু বিভাগীয় শহরেই মূলত ক্রেডিট কার্ডের বাজার সীমাবদ্ধ রয়েছে। এটিকে দেশের সব জেলা এমনকি উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এজন্য মার্চেন্টদের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) ডিভাইস সরবরাহ করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে পিওএস ডিভাইস বিতরণের বিষয়টি সমন্বয় করতে পারে। এতে তাদের সার্ভিস চার্জও কমে আসবে। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের বাজারও সম্প্রসারণ হবে। বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটা ও ই-কমার্সে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। ফলে এটি যদি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে মানুষ সার, কীটনাশকসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্যও কার্ডের মাধ্যমে কিনতে পারবে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক কম। কমপক্ষে এক কোটি কার্ডধারী থাকা উচিত।

ক্রেডিট কার্ডকে আরো বেশি জনপ্রিয় করে তোলা এবং গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হলে এর লেনদেন ব্যবস্থা, বিল জমা দেয়াসহ সবকিছুকে গ্রাহকের জন্য সহজ করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও শেয়ারিং আরো বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন কি?

ক্রেডিট কার্ড থেকে অ্যাড মানি অপশনের মাধ্যমে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ওয়ালেটে টাকা স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। শুরুতে বলা হয়েছিল যে কার্ড থেকে অ্যাড মানি করার ক্ষেত্রে কোনো ফি লাগবে না। কিন্তু পরে দেখা গেছে যে এটি ব্যাংকের জন্য লোকসান হয়ে যায়। কারণ কেউ যদি অ্যাড মানির মাধ্যমে কার্ড থেকে টাকা নিয়ে সেটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত দিয়ে দেয় তাহলে কিন্তু কোনো সুদ দিতে হয় না। অথচ ব্যাংক কিন্তু এক্ষেত্রে আমানতকারীদের টাকা কার্ডধারীকে ঋণ হিসেবে দিয়েছে। ব্যাংককে কিন্তু ঠিকই আমানতকারীকে সুদ দিতে হবে। এজন্যই কিন্তু এক্ষেত্রে একটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। সুবিধা নিতে গেলে আপনাকে কিছু ফি পরিশোধ করতেই হবে। তবে এটা ঠিক যে এমএফএসের ক্যাশ আউটের ফি অনেক বেশি। এটি কমিয়ে আনার বিষয় বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে কিন্তু এটিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মধ্যে শেয়ারিংয়ের প্রবণতা বাড়ছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নতুন এটিএম স্থাপন না করেই মাত্র ১০ টাকা ফির বিনিময়ে একজন আরেকজনের এটিএম ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে। এতে গ্রাহকের জন্যও সুবিধা হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকের খরচ বেঁচে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার ব্যাংক নিজেই এ ১০ টাকা ফি বহন করছে। একইভাবে এমএফএসগুলোও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও আলোচনার মাধ্যমে ফি কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। প্রয়োজনবোধে ব্যাংক ও এমএফএস সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে ফি কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। লংকাবাংলার ক্রেডিট কার্ডধারীরা ছয়টি নির্ধারিত ব্যাংকের পাশাপাশি নগদ, বিকাশ, আইপে, ডি মানির মাধ্যমে সহজেই ক্রেডিট কার্ডের বিল জমা দিতে পারছেন। আমাদের এখানে সবকিছুই একটু ধীরগতিতে হয়। কিছুটা দেরিতে হলেও আমাদের এখানেও অনেক পরিবর্তন আসবে। আমি মনে করি, পাঁচ বছরের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের বাজারেও অনেক পরিবর্তন আসবে।

রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের সঙ্গে জেলা ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের আয়ের ক্ষেত্রে তারতম্য রয়েছে। ক্রেডিট কার্ড দেয়ার ক্ষেত্রে আপনারা বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

একটা সময় পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ড শুধু উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। লংকাবাংলাই সর্বপ্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য ক্রেডিট কার্ড নিয়ে আসে। গত কয়েক বছরে আমরা এটি নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছি। ঢাকার মধ্যে স্কুলশিক্ষকদের সবার আগে আমরাই ক্রেডিট কার্ড দিয়েছি। ইন্টার্ন ডাক্তারদের আমরা কার্ড দিয়েছি। ১০ম থেকে ১২তম গ্রেডের  সরকারি চাকরিজীবীদেরও আমরা কার্ড দিয়েছি। এমনকি যাদের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা তারাও আমাদের কার্ড পেয়েছেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংকারাই মূলত ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক। তাদের লক্ষ্য করে যদি আমরা কাজ করতে পারি তাহলে ক্রেডিট কার্ডের বাজার আরো বড় হবে। ক্রেডিট কার্ড যদি আপনি যথাযথভাবে ব্যবহার করেন, সময়মতো বিল পরিশোধ করেন তাহলে আপনি কখনই বিপদে পড়বেন না। কিন্তু যদি ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা নিয়ে আপনি জমি কেনেন কিংবা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসান করেন তাহলে আপনি কার্ডের বিল দিতে সমস্যায় পড়বেন এবং এটি আপনার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের মধ্যে আচরণগত কোনো পরিবর্তন কি লক্ষ করেছেন?

একসময় যে গ্রাহক ক্রেডিট কার্ড নেয়ার চিন্তা করেননি কিংবা অনীহা ছিল তারাও কভিডের কারণে ক্রেডিট কার্ডের দিকে ঝুঁকেছেন। বর্তমানে গ্রাহকদের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা এসেছে। তারা আগের মতো ঝূঁকিপূর্ণ খাত যেমন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার্ডের অর্থ ব্যয় করা কমিয়ে দিয়েছেন। ই-কমার্স থেকে কেনাকাটায় কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। এমনকি আগে ব্যাংকের মাধ্যমে আমাদের সবচেয়ে বেশি বিল আদায় হতো। বর্তমানে এর বড় একটি অংশ আসছে ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে।

ক্রেডিট কার্ডের বাজারে লংকাবাংলার অবস্থান কী?

আপনারা জানেন, দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) মধ্যে একমাত্র লংকাবাংলা ফাইন্যান্সই ক্রেডিট কার্ডসেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে দেশের ৩৪টি ব্যাংক যারা ক্রেডিট কার্ডসেবা দিচ্ছে তাদের মধ্যে কার্ডের সংখ্যা ও পোর্টফোলিও বিবেচনায় আমাদের অবস্থান পঞ্চম। আমাদের ডুয়াল কারেন্সি কার্ড নেই, আমরা স্থানীয় পর্যায়ে সেবা দিচ্ছি। তবে যারা ডুয়াল কারেন্সি কার্ডসেবা দিচ্ছে তাদের তুলনায় আমরা কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা অন্যদের চেয়ে গ্রাহকদের বেশি সুবিধা দিচ্ছি। আমরা ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের অনুমোদন নেয়ার জন্য চেষ্টা করছি। এনবিএফআই হিসেবে আমাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিবিধানগত কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা সেটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্ট করছি। ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের অনুমোদন পেলে আমরা ক্রেডিট কার্ডের বাজারে ৩ নম্বর অবস্থানে উঠে আসতে পারব।

ক্রেডিট কার্ড নিয়ে লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা জানতে চাই।

দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ও সব শ্রেণীর গ্রাহকদের সেবা দেয়ার জন্য আমরা ডুয়াল কারেন্সি কার্ড আনতে চাই। বর্তমানে প্রত্যক্ষ উপস্থিতির মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। তবে আমরা চাইছি এটা ডিজিটাল মাধ্যমে করতে। এরই মধ্যে সীমিত পরিসরে এটি শুরুও হয়েছে। আমরা ভার্চুয়াল ক্রেডিট কার্ড চালুর পরিকল্পনা করছি। এটি গ্রাহকের ওয়ালেটে থাকবে। আমরা তাদের মোবাইলে আমাদের ফাইন্যান্স মার্ট অ্যাপটি ইনস্টল করে দেব। সেখানে লিমিট অনুসারে কার্ডের ব্যালান্স চলে যাবে। গ্রাহক সেটি ব্যবহার করে লেনদেন করতে পারবেন। কার্ড ছাড়াই তখন গ্রাহক এমএফএস কিংবা এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। আগামী জুনের মধ্যেই আমরা এটি চালু করতে চাই। সরকার চাইছে দেশে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে উঠুক। এক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডকে জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি ক্যাশলেস সোসাইটি বিনির্মাণকে এগিয়ে নিতে আমরা চাই এমন নিয়ম করা হোক যাদের ক্রেডিট কার্ডের লিমিট ৩ লাখ টাকা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে যেন ট্যাক্স রিটার্ন স্লিপ জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়া হয়। আমাদের পাশাপাশি অন্য এনবিএফআইগুলোও যাতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসায় আসতে পারে সেজন্য আইনি ও নীতিসহায়তা দেয়া হোক।

ক্রেডিট কার্ডে খেলাপির হার কেমন?

বরাবরই আমাদের কার্ডে খেলাপির হার ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু কভিডের মধ্যে এটি বেড়ে যায়। কেউ হয়তো করোনায় মারা গেছেন, কারো হয়তো চাকরি চলে গেছে কিংবা কারো হয়তো বেতন কমে যাওয়ার কারণে খেলাপি হয়ে পড়েছেন। এ বছরের জানুয়ারি থেকে প্রতি মাসেই খেলাপির পরিমাণ কমছে। আশা করছি আগামী জুনের মধ্যেই এটি আগের মতো ৮ শতাংশে চলে আসবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রসারের কারণে সুবিধা যেমন বাড়ছে অন্যদিকে ঝুঁকিও বাড়ছে। ক্রেডিট কার্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আপনারা কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে সার্ভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমরা যে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করি সেটার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আমাদের একটি দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি ইউনিট আছে। তারা প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে ঝুঁকি প্রশমনের কাজ করছে। এখন পর্যন্ত আমাদের ক্রেডিট কার্ডে কোনো ধরনের সাইবার হামলা কিংবা এ ধরনের কোনো কিছু হয়নি। তবে ছোট খাতে জালিয়াতির কিছু ঘটনা ঘটেছে। এজন্য আমরা প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের সচেতন করছি কার্ডের পিন কারো সঙ্গে যাতে শেয়ার করা না হয়। এমনকি লংকাবাংলা থেকে ফোন দেয়া হলেও দেবেন না। লংকাবাংলা কখনই গ্রাহকের কাছে পিন চাইবে না। তবে কেউ কেউ লংকাবাংলার কাস্টমার কেয়ারের নাম ভাঙিয়ে গ্রাহকদের ফোন করে পিন নম্বর চায়। এজন্যই আমরা গ্রাহকদের সতর্ক করছি যে কাউকে পিন নম্বর না দেয়ার জন্য। সম্প্রতি আমরা কার্ডের বিল জমা দেয়ার ক্ষেত্রে কার্ড নম্বরের পরিবর্তে একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর তৈরি করেছি। এতে গ্রাহক সেই অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করে টাকা জমা দেবেন। এতে অন্য কেউ গ্রাহকের কার্ড নম্বর জানতে পারবে না।