প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ বাড়লেও কমেছে খাতওয়ারি ব্যয়ের হার। আগামী অর্থবছরের জন্য এ খাতে চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। নতুন বাজেটে স্বাস্থ্যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয় মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বা ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পুরনো পরিকল্পনা ও পরিচালন ক্ষেত্র ধরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ বাজেট নতুন কিছু বয়ে আনবে না।
আগামী বাজেটে ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার খরচ কমাতে ক্যান্সারের ওষুধের আরো কিছু বিদ্যমান ওষুধের কাঁচামাল সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইভি ক্যানুলা উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপাদান সিলিকন টিউব রেয়াতি সুবিধায় আমদানির সুযোগ দেয়ারও প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দের মধ্যে ২৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য। আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৮ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে অবশ্য স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য ২৯ হাজার ২৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে তা ২৩ হাজার ৫২ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে ৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বাজেটের সংশোধিত আকার দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে তাতে নতুনত্ব কিছু নেই বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হলে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগে কর্মসূচি হাতে নিয়ে তবেই বাজেটের বরাদ্দের বিষয়টি ভাবনায় আনতে হবে। যদিও সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চাইলেই হয়তো বরাদ্দ বাড়ানো কঠিন।’ ড. আবদুল হামিদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয়ে সব পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের অবহেলা রয়েছে। ফলে দেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রসার কাগজে-কলমে যতটুকু দেখানো হচ্ছে বাস্তবে তার থেকে অনেক পিছিয়ে। আন্তরিকতা ও পরিকল্পনার অভাবে জনস্বাস্থ্যের ধারণাটি বাংলাদেশে যথাযথ স্থান দখল করতে পারেনি।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘মানসম্মত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে কভিডকালীন স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন সংগ্রহ ও তার ব্যবস্থাপনা, দ্রুততম সময়ে ভ্যাকসিন ক্রয় ও প্রয়োগ করেছি। জনগণকে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন দেয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম পাঁচ দেশের মধ্যে অবস্থান করছে।’
নাগরিকের জন্য গুণগত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির আওতায় ৩১টি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার কথা বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), পরীক্ষামূলকভাবে স্বাস্থ্যসুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে), প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিকের বিষয়েও অগ্রগতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে নতুন বাজেটে। দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার এবং মৌলিক গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণার অবকাঠামো তৈরি, গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা, স্বাস্থ্য খাতের নতুন উদ্ভাবনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ‘সমন্বিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল’-এ বরাদ্দ অব্যাহত থাকছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।





