ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর চৌরাস্তার দক্ষিণ পাশে চৌধুরীবাড়ী এলাকাটির অবস্থান। মহাসড়কটির পশ্চিম পাশে বিশাল এ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে আজিজ চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট। এখানেই ২০১৬ সালে তরুণ শিল্পপতি সালাউদ্দিন চৌধুরী গড়ে তোলেন স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানা। মূলত ডেনিম ফ্যাব্রিকস ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রডাক্ট তৈরি করা হয় এ পোশাক কারখানায়। এখানকার পোশাক শ্রমিকরা তাদের দক্ষ হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি করছেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ব্র্যান্ড কারিভান, জার্মানির মালো, ভারতের রিলায়েন্স ও ইতালির বিভিন্ন স্টোরের শীর্ষ ব্র্যান্ডের পোশাক। বায়ারের অর্ডারের ওপর ভিত্তি করে এ কারখানা থেকে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন তিন থেকে সর্বোচ্চ আট লাখ পিস ডেনিম পোশাক তৈরি হয়।
জেলার শ্রীপুরের মাওনায় অবস্থিত কলম্বিয়া ওয়াশিং প্লান্ট লিমিটেড নামক পোশাক কারখানায় তৈরি হয় বিশ্বসেরা টারগেট, জারা, গ্যাপ ব্র্যান্ডের ডেনিম পোশাক। অন্যদিকে কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুরে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ডেনিম কারখানা মাহমুদ ডেনিমস থেকে তৈরি হয় ইউরোপ ও আমেরিকার শীর্ষ ব্র্যান্ড আমেরিকান ঈগল, সিঅ্যান্ডএ, এমঅ্যান্ডএস, লিভাইস, জেক অ্যান্ড জোন্স ব্র্যান্ডের ডেনিম পোশাক।
স্টাইলিশ, কলম্বিয়া কিংবা মাহমুদ ডেনিমস কারখানাই নয়, গাজীপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় তিন শতাধিক কারখানা রয়েছে, যেখানে ডেনিমসের নানা পণ্য উৎপন্ন করে তা রফতানি করা হয় ইউরোপ ও আমেরিকার মার্কেটগুলোয়। বিশ্বের শীর্ষ ব্যান্ডের ডেনিম পোশাক তৈরি করা হয় গাজীপুরের এসব কারখানা থেকেই। এসব শীর্ষ ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে লিভাইস, ডিসেল, জি স্টার, এইচঅ্যান্ডএম, ইউনিক্লো, টেসকো, র্যাংলার, এস অলিভার, হিউগো বস, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ প্রভৃতি। অন্যদিকে দেশের শীর্ষ ডেনিম কারখানাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে অবস্থিত উল্লেখযোগ্য কারখানাগুলো হচ্ছে, বেক্সিকো ডেনিমস লিমিটেড, হামিম ডেনিমস লিমিটেড, যমুনা ডেনিমস লিমিটেড, শামিম কম্পোজিট ফ্যাক্টরি, নাইস ডেনিম মিলস লিমিটেড, আরগন ডেনিমস লিমিটেড, পারটেক্স গ্রুপের আম্বার ডেনিম লিমিটেড, স্মার্ট জিন্স লিমিটেড, মাহমুদ ইন্ডিগো লিমিটেড প্রভৃতি।
ডেনিম হচ্ছে এক ধরনের ফ্যাব্রিক যা শতভাগ কটন থেকে তৈরি হয়। এই ডেনিম ফ্যাব্রিক দিয়েই তৈরি হয় জিন্সের প্যান্ট, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী, যা বিশ্বের মানুষের কাছে খুবই সমাদৃত। যদিও একসময় ডেনিম দিয়ে তৈরি মোটা জিন্সের প্যান্ট পরতেন পশ্চিমা দেশের শ্রমিকরা। এসব পরে তারা কাজ করতেন। কিন্তু এখন ডেনিম শুধু জিন্স হিসেবে নয়, ফ্যাশন হিসেবে পরিধান করা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ডেনিম থেকে তৈরি হচ্ছে প্যান্ট, জ্যাকেট, শার্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি এমনকি হিজাব। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের ফ্যাশনের চিন্তাধারা চেঞ্জ হয়ে গেছে। ফ্যাশনেবল মানুষের চাহিদার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনিম। পোশাক ছাড়াও ডেনিম দিয়ে এখন তৈরি করা হচ্ছে ব্যাগ, পার্স, জুতা, ম্যাট ও বিভিন্ন ধরনের গৃহসজ্জাসামগ্রী।
ডেনিম ফ্যাব্রিকস উৎপাদনকারী ও ডেনিম পোশাকপণ্য প্রস্তুতকারী বিভিন্ন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমাদের দেশে ডেনিম পণ্য উৎপাদনকারী পাঁচ শতাধিক কারখানা রয়েছে। তবে ডেনিম ফ্যাব্রিকস উৎপাদন করছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি কারখানা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডেনিমের কিছু কারখানা থাকলেও বেশির ভাগ ডেনিম কারখানা রয়েছে গাজীপুরে। দেশের শীর্ষস্থানীয় কারখানাসহ এখানে তিন শতাধিক কারখানা রয়েছে, যারা শুধু ডেনিম ফেব্রিক ব্যবহার করে শতভাগ রফতানিমুখী নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন করছে। এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, ডেনিম পণ্য উৎপাদনে বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার মার্কেটে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। চীন, পাকিস্তান কিংবা ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের এ অবস্থান ভবিষ্যতে আরো দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাদের অভিমত।
গার্মেন্ট শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করছেন স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বিজিএমইএর স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ-ফিলিপাইন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক। ২০১৬ সাল থেকে ডেনিম পণ্য প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক এ উদ্যোক্তা বণিক বার্তাকে জানান, ২০১৫-১৬ সালে আমরা চীনকে পেছনে ফেলে ইউরোপের মার্কেটে ডেনিম পণ্য রফতানিতে শীর্ষস্থান দখল করেছিলাম। বর্তমানেও ইউরোপ ও আমেরিকার মার্কেটে আমাদের অবস্থান শীর্ষে। বিশ্বব্যাপী ডেনিমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক যে সংকট বর্তমানে চলমান রয়েছে, তা মোকাবেলায় আমরা ডেনিমের ওপর ভর করেই অনেকটা টিকে আছি। করোনার সময় যুক্তরাষ্ট্র-চীন যে বাণিজ্যযুদ্ধ ছিল, সে সময়ও বাংলাদেশ চীনকে অতিক্রম করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। বর্তমানেও ডেনিমে ইউরোপ-আমেরিকার মার্কেটে বাংলাদেশ এক নম্বরে। তিনি বলেন, ‘ইউরোপে একটি কথা আছে, প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশী ডেনিম প্রডাক্ট ব্যবহার করে। এ ধারা আমেরিকায়ও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শুধু বৈশ্বিক সংকট না থাকলে আমরা এরই মধ্যে অনেক দূর চলে যেতাম। বিশ্ববাজারে ডেনিমে বাংলাদেশ শীর্ষে।’
এ খাতের সমস্যার কথা জানতে চাইলে সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের পণ্য ডেলিভারিতে অনেক সময় লাগে। এটা কমিয়ে আনতে হবে। এজন্য আমাদের বন্দরকে আধুনিক করতে হবে, হয়রানি মুক্ত করতে হবে। দ্রুত যাতে ডেলিভারি করা যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর রয়েছে জ্বালানি সংকট, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। ডেনিম নিয়ে যদি আমরা সামনে এগোতে চাই, তাহলে জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধা করতে হবে। গাজীপুরের কারখানাগুলোয় গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই। এসবের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অন্যদিকে ডেনিমের কাঁচামাল এখনো দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়। ৭০ ভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ডেনিমস ফ্যাব্রিক দিয়ে উৎপন্ন প্রডাক্টের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এক নম্বরে কিন্তু ফ্যাব্রিক উৎপাদনে এখনো আমরা পিছিয়ে রয়েছি। মাত্র ৪০টির মতো ফ্যাব্রিকস কারখানা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকার আমাদেরকে যে সাপোর্ট দিচ্ছে, সেগুলো আরো বাড়াতে হবে। যাতে আমরা টিকে থাকতে পারি, প্রডাকশন বাড়াতে পারি, কর্মসংস্থান টিকে থাকে। বিশেষ করে ব্যাংকের সুবিধা বৃদ্ধি, পোর্টের অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খরচ কমানো, ট্যাক্স রিলাক্স করা এসবের দিকে নজর দিতে হবে।’
প্রায় একই ধরনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন মাহমুদ ডেনিমসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু তালেব। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ডেনিমসের ব্যাপক চাহিদা ও বায়ারদের প্রচুর অর্ডার থাকা সত্ত্বেও শুধু গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের প্রডাকশন টার্গেট আমরা পূরণ করতে পারি না। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে অধিকাংশ সময়ই মেশিন বন্ধ রাখতে হয়। ফলে অনেক বায়ার চলে যান। এটা আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে অচিরেই গ্যাস সংকট দূর করতে হবে।’
এদিকে পরিবেশগত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জকেও পরিহার করা যাবে না বলে মনে করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা । কলম্বিয়া ওয়াশিং প্লান্ট লিমিটেডের সাসটেইনেবিলিটি রেসপনসিবল অফিসার সাইদ চৌধুরী জানান, বিশ্বব্যাপী ডেনিমের সব ধরনের ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া সত্যিই ভালোলাগার। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ডেনিম কারখানাগুলো যত বাড়ছে, পরিবেশ নিয়েও তত দুশ্চিন্তায় পড়ছে সবাই। তাই সাসটেইনেবল ফ্যাক্টরি বা টেকসই কারখানার গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে ডেনিম উৎপাদনকারী দেশ ও ক্রেতারা। তিনি বলেন, ‘সাধারণত গ্রিন বিল্ডিং, রিনিউয়েবল এনার্জির ব্যবহার বাড়ানো, পানির ব্যবহার কমানো, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো, শব্দ দূষণ রোধসহ অনেক বিষয় যুক্ত রয়েছে। যেমন সাসটেইনেবল প্রডাকশন রেসিপি ও কেমিক্যাল ম্যানেজমেন্ট, ওয়াশিং ও ডায়িং মেশিন যেগুলো পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস কম ব্যবহার করে অধিক প্রডাকশন দিতে সক্ষম, সেগুলো কারখানায় ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। ডেনিম শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সাসটেইনেবিলিটির দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে ভবিষ্যতে।
এদিকে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ডেনিমসের বাজার সম্প্রসারণ করা দরকার বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তারা জানান, এরই মধ্যে ব্রাজিলে বাংলাদেশী ডেনিমস রফতানি করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন তারা। এজন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে বাজার সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ বিশেষ করে মেলা ও পণ্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
এদিকে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ইউরোপে অনুষ্ঠিত হবে ফ্যাশন শো ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন রানওয়ে’। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় বাংলাদেশ অ্যাপারেলস এক্সচেঞ্জ কর্তৃক আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বেস্ট অব বাংলাদেশ শীর্ষক সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে গাজীপুরসহ দেশের কয়েকটি শীর্ষ পোশাক কারখানা ও ডেনিমস পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে। সেখানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করে টেকসইভাবে উৎপাদিত উদ্ভাবনী ও বৈচিত্র্যময় উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ডেনিম পণ্য প্রদর্শন করা হবে। এতে পশ্চিমা ক্রেতা ও ভোক্তাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বিশেষ করে ডেনিমস পণ্য তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যাপারেলস এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্টরা।
ডেনিমস পণ্যের উদ্যোক্তাদের দেয়া তথ্যমতে, বিশ্বে প্রায় ছয় হাজার কোটি ডলারের ডেনিমের বাজার রয়েছে। এ চাহিদার ২৫ শতাংশ পূরণ করতে পারছে বাংলাদেশ। বর্তমানে শুধু ইউরোপের মার্কেটে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডেনিম প্রডাক্ট রফতানি করা হচ্ছে আমাদের দেশ থেকে। বিশ্বে ডেনিম পোশাকের প্রধান দুটি বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা, যেখানে বাংলাদেশী ডেনিমসের রয়েছে জোরালো উপস্থিতি। যার অধিকাংশই যাচ্ছে গাজীপুর থেকে। তবে বাংলাদেশের জন্য খুবই সম্ভাবনাময় এ খাতের বিদ্যমান নানা সমস্যার দ্রুত সমাধান করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী ডেনিমসের অবস্থান ধরে রাখার আহ্বান এ খাতসংশ্লিষ্টদের।





