বিশ্বের সেরা ১৫টি পরিবেশবান্ধব সবুজ পোশাক কারখানার মধ্যে ১৩টিই বাংলাদেশের। এরই মধ্যে দেশের ২০০ কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) সনদ পাওয়ায় পোশাক শিল্প একটি নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে। তৈরি পোশাক মালিক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে প্রথম পরিবেশবান্ধব কারখানার যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। মাত্র ১১ বছরে ডাবল সেঞ্চুরি করেছে সবুজ কারখানার সনদে। ২০০ কারখানার মধ্যে ৭৩টি প্লাটিনাম, ১১৩টি গোল্ড, ১০টি সিলভার ও চারটি সার্টিফায়েড কারখানা রয়েছে। এ তালিকায় নাম লেখাতে প্রক্রিয়াধীন আরো ৫০০টি কারখানা। 

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউএসজিবিসি। তারা (এলইইডি) লিড নামে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার সনদ দিয়ে থাকে। লিডের পূর্ণাঙ্গ রূপ লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন। লিড সনদের জন্য নয়টি শর্ত পরিপালনে মোট ১১০ পয়েন্ট আছে। এর মধ্যে পয়েন্ট ৮০-এর ওপরে হলে লিড প্লাটিনাম, ৬০-৭৯ হলে লিড গোল্ড, ৫০-৫৯ হলে লিড সিলভার ও ৪০-৪৯ হলে লিড সার্টিফায়েড সনদ মেলে। সনদটি পেতে একটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হয়।

পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াতে এলইইডির সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমেই জানতে চায়, তাদের পণ্য কোথা থেকে এসেছে, কোন পরিবেশে তৈরি হয়েছে। সেখানে কীভাবে উৎপাদন হয়েছে বা কোনো ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে কিনা। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে লিড সার্টিফিকেটের বিকল্প নেই। শিল্পায়ননির্ভর অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। চার দশকে একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পেছনে আমাদের যে যাত্রা তার মূলে রয়েছে শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ, বিশেষ করে শ্রমনির্ভর ম্যানুফ্যাকচারিং খাত।

সত্তর দশকের শেষদিকে যাত্রা শুরু করে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। প্রায় ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস এ শিল্পের জিডিপিতে অবদান ১১ শতাংশ। দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে অব্যাহত অবদান রাখার পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে শ্রমিকের ক্ষমতায়ন এবং সবুজ শিল্পায়নেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এ শিল্প।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিবেশ ও জলবায়ুর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণাটি আমাদের দেশে খুব বেশি পুরনো নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। গ্রিন ফ্যাক্টরির ধারণা আমাদের পোশাক শিল্পে ব্যাপকভাবে চালু হওয়ায় গোটা অর্থনীতিতে এর চমৎকার অনুকূল প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

এর মাধ্যমে সারা দেশে একে একে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি। এগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণাটি আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগামীতে আরো অনেক পোশাক কারখানাকে সবুজায়নের আওতায় আনার প্রক্রিয়া জোরেশোরে চলছে। শ্রমিকবান্ধব কারখানা প্রতিষ্ঠায় মালিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সুফল বয়ে এনেছে এবং অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে বলা যায়। এতে বিদেশী ক্রেতারা অবশ্যই আকৃষ্ট হবেন। রফতানির পরিমাণ বেড়ে যাবে বহুগুণ। বর্তমানে যারা নতুন কারখানা চালু করছেন, তারা উপলব্ধি করেছেন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারখানা না হলে বিদেশী ক্রেতারা অর্ডার দেবেন না। তাই উদ্যোক্তারা ব্যবসার আইনকানুনের পাশাপাশি দেশে প্রচলিত বিভিন্ন আইন মেনে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আবার সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্স না হলে নতুন কোনো কারখানাকে বিজিএমইএ থেকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না।

একটি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানায় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে পানি, বিদ্যুৎ, রঙ ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশবান্ধব উপায়ে হচ্ছে কিনা তা দেখা হয়। অধিকাংশ পোশাক শিল্প-কারখানা ইটিপি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গতানুগতিক ইটিপির পরিবর্তে বায়োলজিক্যাল ইটিপি ব্যবহার করছে, যা সবুজ বিপ্লবেরই একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

গার্মেন্ট সামগ্রী ক্রেতা দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা গোষ্ঠী এখন পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশবান্ধব শ্রমিকবান্ধব নানা শর্ত আরোপ করছে। যেসব শর্ত পূরণের 

মাধ্যমেই কেবল তাদের সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। এজন্য এখন পোশাক শিল্পের কমপ্লায়েন্সকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। অতীতে বিষয়টিকে এক প্রকার অগ্রাহ্য করা হয়েছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পেছনেও বিদেশী ক্রেতাগোষ্ঠীর চাপ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।

তারই ধারাবাহিকতায় সাভারের আশুলিয়ায় বাড়ইপাড়া এলাকায় প্রায় ২৭ বিঘা জমির ওপর মাহমুদ ফ্যাশন লিমিটেড নামের একটি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা গড়ে ওঠে। কারখানাটি ২০১৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয়। প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই গ্রিন ফ্যাক্টরিটি ২০১৯ সালে লিড (গোল্ড) সার্টিফিকেট পেয়ে যায়। কারখানাটির ব্যবহৃত ফ্লোরের পরিমাণ ৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৯৩ বর্গফুট এবং উৎপাদন এলাকা ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭২ বর্গফুট।

২০১৮ সালে ক্যারিফোরের পণ্য উৎপাদন দিয়ে কারখানাটির যাত্রা শুরু। শুরুতে ছয়টি সেলাই লাইন, ছয়টি ওয়াশিং মেশিন ও ৫০০ শ্রমিক নিয়ে যাত্রা করে এখন ২৫টি লাইন ও ১৫টি ওয়াশিং মেশিন চলছে। বর্তমানে প্রায় চার হাজার কর্মীর মধ্যে নারী ৭০ ও পুরুষ ৩০ শতাংশ।

এ কারখানায় মাসিক কাট টু প্যাক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ পিস। প্রতি মাসে কারখানাটির সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১৮ লাখ পিস। এর মূল প্রডাক্ট ডেনিমের ম্যান, উইম্যান ও গার্লস বাটন এবং উল্লেখযোগ্য বায়ার বেস্টসেলার, নেক্সট, কেমার্ট, ক্যারিফোর, সিঅ্যান্ডএ, হেমা, বেল্ক ইত্যাদি। কারখানাটিতে গত অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ছিল ১০৪ মিলিয়ন ডলার এবং এ বছরে ১২৫ মিলিয়ন ডলার।

গ্রিন ফ্যাক্টরি ও সাধারণ ফ্যাক্টরির মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায় জানতে চাইলে মাহমুদ গ্রুপের কনসালট্যান্ট (সাসটেইনেবিলিটি সিএসআর ও কমপ্লায়েন্স) আলী আকবর খান বলেন, ‘‌কারখানাটি শুরু থেকেই সব শ্রমিককে আইনানুগ সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছে। নির্ধারিত রুটে ১২টি বাসে শ্রমিকদের ফ্রি যাতায়াত ব্যবস্থা। নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতার সুবিধা, ফ্রি চেকআপ ও চিকিৎসা সুবিধা এবং ইউনিসেফ প্রোগ্রামের আওতায় মা ও শিশুর বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। এর বাইরে সবার জন্য মাসিক ৫০০ টাকা হাজিরা বোনাস, বেস্ট প্রডাকশন লাইন অ্যাওয়ার্ড, বার্ষিক পিকনিক, শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ফ্রি স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চক্ষুশিবির ও জরায়ু ক্যান্সার শনাক্তকরণ ক্যাম্প, ডিসকাউন্ট মূল্য ও ক্রেডিটে মাসিক বাজারের জন্য ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে পণ্য ক্রয়ের সুবিধা।’ 

তিনি আরো জানান, কারখানার এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটির মধ্যে রয়েছে ২৫০ ঘনমিটার বায়োলজিক্যাল ইটিপি। প্রায় ২৫ শতাংশ ইটিপির শোধিত পানি পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে টয়লেট ফ্লাশ গার্ডেনিং ও ডোমেস্টিক কাজে। রয়েছে এক লাখ গ্যালন সক্ষমতার রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং। সার্কুলেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে ঝুট বয়লার, ঝুট রিসাইক্লিং পদ্ধতি কার্যকর করা হয়েছে। সাধারণ কারখানার তুলনায় গ্রিন ফ্যাক্টরির ব্যয় ২০ শতাংশ বেশি। প্রডাক্টের মূল্য বেশি না পেলেও কাস্টমাররা অর্ডার দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাই বেশি অর্ডার পাওয়া যায় এবং সাসটেইনেবল প্রডাক্টে ১৫-২৫ শতাংশ বেশি মূল্য পাওয়া যায়। পানি কম আহরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। গ্রিন ফ্যাক্টরির ইউটিলিটি খরচও তুলনামূলক কম। এলইডি লাইট, দিনের আলোর ব্যবহার, প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ইত্যাদি।

কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে গ্রিন ফ্যাক্টরি নির্মাণের স্বপ্ন বুনেছিলেন জানতে চাইলে মাহমুদ গ্রুপের চেয়ারম্যান রাফি মাহমুদ বলেন, ‘‌আজকের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে, ক্রেতাদের চাহিদা কোন দিকে আবর্তিত হচ্ছে, কাঁচামাল আহরণ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিশ্ব জলবায়ু ও অনবায়নযোগ্য সম্পদ ব্যবহারের পরিণতি কী হচ্ছে, মালিক হিসেবে এগুলোকে বিবেচনায় নিয়েই আমাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নত দেশের দিকে ধাবিত হওয়ার অহংকার আমাদের যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জিএসপি সুবিধার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। ইউরোপ ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোর নেট-জিরো প্রোগ্রামের মাধ্যমে কার্বন-ট্যাক্স পরিহার করা এখন এ ব্যবসায় টিকে থাকতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্ব পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মূলত সবুজ কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হলেও মাহমুদ গ্রুপ প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকতে চায় এবং সে লক্ষ্যেই মাহমুদ ফ্যাশন লিমিটেড কারখানাটি গড়ে উঠেছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণের আগেই আমরা কারখানাটি স্থাপন শুরু করি এবং এটি এখন বাংলাদেশে গ্রিন ফ্যাক্টরির রোল মডেল। সামাজিক ও বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার এ জায়গায় থেকেই আমরা ব্যবসাকে জনকল্যাণে আরো এগিয়ে নিয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ।’


লেখক: সাংবাদিক