২০১৪ সালে যাত্রা করে ২০২৩ সালে বিশ্বের এক নম্বর বা শীর্ষ পরিবেশবান্ধব পোশাক শিল্প-কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাংলাদেশের গ্রিন টেক্সটাইল লিমিটেড। বিশ্বসেরা পরিবেশবান্ধব এ পোশাক কারখানা ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত। গ্রিন টেক্সটাইল দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত একটি পোশাক কারখানা। হংকংভিত্তিক এপিক গ্রুপ ও বাংলাদেশের এনভয় লেগ্যাসি যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত এ কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) মান সনদে পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে ১১০-এর মধ্যে ১০৪ নম্বর পেয়ে বিশ্বসেরা পরিবেশবান্ধব কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করে। চলতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিবিসি মান সনদে এ কারখানাকে পরিবেশবান্ধব কারখানার সনদ ইস্যু করে। ভালুকায় কোম্পানিটির চারটি ইউনিট রয়েছে। এ চারটি ইউনিটের মধ্যে চতুর্থটি পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি পেয়েছে। বাকি তিনটি ইউনিটের মধ্যে তৃতীয়টিও ‘লিড প্লাটিনাম’ কারখানার স্বীকৃতি পেয়েছে। অন্য দুটি ইউনিট ‘গোল্ড’ সনদ পায়।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ভালুকার নিঝুরীতে প্রতিষ্ঠিত ৫৪ হাজার বর্গফুটের কারখানাটি তৈরির কাজ শুরু করা হয় ২০১২ সালে। ২০১৪ সাল থেকে উৎপাদন শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে কারখানার জন্য নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহ করা হয়। পরিবেশ ও প্রাকৃতিক উৎসকে প্রাধান্য দেয়া হয় নির্মাণকাজে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের শর্তের প্রতিটি ধাপই পূরণ করে গ্রিন টেক্সটাইল লিমিটেড। তারই অংশ হিসেবে কারখানায় ৬৫ শতাংশ পানি ব্যবহার করা হয় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে। এছাড়া কারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বেশি করা হয়। কারখানার বিদ্যুতের চাহিদার ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় সৌরবিদ্যুতের প্যানেল থেকে। আর প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করার কারণে কারখানাটি অতিরিক্ত তাপমুক্ত থাকে। কারখানা তৈরিতে প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহার করায় স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে অন্তত ১০ শতাংশ তাপ কম অনুভূত হয়ে থাকে। এ কারখানায় ইটিপি চালু থাকায় পানি শোধনের পর তা আবার ব্যবহার করা যায়। যার ফলে কর্মীরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেন। আর কর্মীদের জন্য নানা সুবিধাসহ ও যথাসময়ে বেতন-বোনাস প্রদান করায় কর্মীরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে থাকেন। কারখানার ভেতরে প্রায় ৩০ শতাংশ খোলা জায়গা রয়েছে। এছাড়া কারখানাটির আশপাশে থাকার ব্যবস্থা থাকায় কর্মীরা সহজেই কারখানায় যাতায়াত করতে পারেন। কর্মীবান্ধব ও সবুজ পরিবেশ থাকায় কর্মীরাও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে থাকেন।
গ্রিন টেক্সটাইল লিমিটেড ৫৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে সাতটি ভবন রয়েছে। একটি ভবনে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আরেকটি ভবনে কর্মীদের জন্য ডরমিটরি ও অফিস। অন্য চারটি ভবনে চারটি ইউনিট রয়েছে। এখানে প্রতিটি কর্মী সমান সুবিধা ভোগ করেন। কর্মীদের জন্য রয়েছে পরিবহন সুবিধা। মোট ৬ হাজার ৭০০ কর্মচারী কাজ করেন এ কারখানায়। তাদের জন্য রয়েছে চিকিৎসা সুবিধা। রয়েছে নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার। কর্মীরা এখান থেকে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ফ্রিতে ওষুধ পেয়ে থাকেন। নারী কর্মীরা শিশু বাচ্চাদের ডে কেয়ারে রেখে নিশ্চিন্তে কর্মস্থলে কাজ করেন। নারী কর্মীদের এক-চার বছরের বাচ্চারা বিনামূল্যে থাকেন। ফ্রি বিস্কিট ও দুধ দেয়া হয়। কর্মীদের বিনোদনের জন্য বছরে একবার কোম্পানির খরচে বার্ষিক বনভোজন করানো হয়। বেস্ট লাইন বা দক্ষ কর্মী হলে কর্মীদের পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। ঈদের সময় ও বিভিন্ন উৎসবে বোনাস ও কর্মীদের উৎসাহিত করার জন্য লটারির ব্যবস্থা থাকে। উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে প্যান্ট-শার্ট সরাসরি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রফতানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১০০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি করেছে।
গ্রিন টেক্সটাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ জানান, পরিবেশবান্ধব কারখানার প্রতিযোগী দেশগুলোর কেউই বাংলাদেশের ধারেকাছে নেই। গ্রিন টেক্সটাইল লিমিটেডের এ অর্জন পোশাক খাত এবং দেশের জন্য গর্বের। ভবিষ্যতে এ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, ওই প্রতিযোগিতায় টিকতে পোশাক খাতে নতুন নতুন ইনোভেশন প্রয়োজন হবে। জ্বালানি নিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে, পানির অপচয় কমিয়ে, ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে গ্রিন টেক্সটাইল অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।





