বন্ধুরা আমাদের জীবনে ভূমিকা রাখে। আর ভালো বন্ধুর ভূমিকা আরো গভীর। তারা শক্তি আর সমর্থনের বড় উৎস। জীবনের সুখানুভূতিগুলো তারা সমৃদ্ধ করে। প্রতিকূল মুহূর্তে একজন ভালো বন্ধু আমাদের মর্মপীড়ার ভাগ নেয় এবং বোঝা হালকা করে দেয়। তারা জীবনের বেদনা থেকে বের হতে পথ দেখায় এবং সাহায্য করে।
প্রবীণ বয়সে এসে অনেকের মৃত্যুতে সংকুচিত হয়ে আসছে বন্ধুত্বের পরিসর, ঠিক সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যেন আরো বেশি করে উপলব্ধি করছি সত্যটা। জীবনটা আগে যেমন ছিল, এখন আর তেমন নেই। আমাদের ওপর ভর করেছে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার বিষণ্ন এক অনুভূতি। এক্ষেত্রে ইংরেজ পণ্ডিত স্যামুয়েল জনসনের দুটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা যায়। তিনি বলেন, ‘যার প্রতি হৃদয় স্থির, সমস্ত ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টা যার প্রতি ঝুঁকে থাকে, এমন কোনো বন্ধুকে হারিয়ে ফেলাটা নিরানন্দ নিঃসঙ্গতা তৈরি করে। যেখানে হৃদয় অধৈর্য হয়ে বাইরে তাকায় অথচ কিছুই পায় না কেবল শূন্যতা আর আতঙ্ক ছাড়া।’
জনসন বুঝিয়ে দেন কীভাবে বন্ধুরা আমাদের সফলতাকে উপভোগ্য ও অর্থবহ করে তোলে। তার ভাষায়, ‘কেবল আত্মচিন্তায় নিমগ্ন থেকে সুখ পাওয়া যায় না। সুখ তখনই পাওয়া যায়, যখন এটি আরেকজনের মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয়।’ অন্য কথায়, যখন কারো সফলতা বন্ধুদের কাছে প্রশংসিত হয়, তখন সেই সফলতা ও প্রাপ্তিকে সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি ও উপভোগ করা যায়।
মসিউর এবং আমি প্রথম পরস্পরকে জানার সুযোগ পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুবাদে। মসিউরের উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ প্রতিভাকে উপলব্ধি করতে আমাদের দেরি হয়নি। তার মতো প্রতিভাধর মানুষ খুব কমই দেখেছি। তার সঙ্গে চার বছর ধরে উপভোগ করেছি এসএম হলের আনন্দময় জীবন। আমরা দুজনেই হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। বন্ধুদের মধ্যে মসিউরের জনপ্রিয় হয়ে ওঠার একটা কারণ ছিল তার রসবোধ। তার সঙ্গে যেকোনো আলোচনা হতো জীবন্ত, আনন্দময় ও শিক্ষণীয়। এমন বন্ধু জীবনকে সমৃদ্ধ করে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তই আমার জন্য ছিল আনন্দের।
১৯৬৪ সালে মাস্টার্স শেষ করার পর আমরা দুজনই ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিই। প্রায় বছর খানেক একসঙ্গে কাজ করেছি। তারপর মসিউর পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় দারুণ ফল করে। আলাদা হয়ে যায় আমাদের পথচলা। ১৯৬৭ সালে আমি পাকিস্তানের ফরেন সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। যেহেতু জীবনের বড় অংশ বাইরের দেশগুলোতে ব্যয় করেছি, ফলে পেশাগত জীবনে থাকার সময়ে তার সঙ্গে দেখা হতো খুবই কম। মসিউর পরবর্তী সময়ে আমেরিকা চলে যায়। পিএইচডি লাভ করে অর্থনৈতিক বিষয়ে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়ে শীর্ষ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ে পিএইচডি করে সে আরো একবার মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দেয়।
বঙ্গবন্ধু তাকে ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিযুক্ত করেন। আর এ উচ্চ পদে আসীন হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ছিল সিভিল সার্ভিসে তার খ্যাতি। বঙ্গবন্ধু সবসময় এমন মেধাবী সিভিল সার্ভেন্টদের বাছাই করতেন, যাদের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা করা যায় এবং পরামর্শ নেয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ সে দায়িত্ব মসিউর সুনামের সঙ্গে সামাল দিয়েছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে আমরা পড়াশোনা শেষ করেছি। সে সময়ে সিভিল কিংবা পররাষ্ট্র বিভাগে যোগ দেয়াটা ছিল সম্মানের। তার পরও যদি তার মতো গুণগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি বিদেশের শিক্ষাজীবনকে বেছে নিতেন, তাহলে আরো অনেক দূর যেতে পারতেন বলে আমি মনে করি। বন্ধু হিসেবেও মসিউর ছিল খুবই সহযোগিতাপূর্ণ। তার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে পাওয়া নানা সহযোগিতা আমাকে ঋণী করেছে।
বাংলাদেশের জন্য তার অবদান অপরিমেয়। এ ধারাবাহিকতা আগামীতেও অব্যাহত থাকুক, সেই দোয়া করি। বন্ধু হিসেবে প্রত্যাশা থাকবে, সে তার বাকি জীবন গরিব, বঞ্চিত ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জন্য উৎসর্গ করবে। এর মধ্য দিয়ে অনুপ্রেরণাপূর্ণ উদাহরণ স্থাপন করবে অনুজ সিভিল সার্ভেন্টদের সামনে।
জিয়াউস সামস চৌধুরী: সাবেক রাষ্ট্রদূত





