বাবাকে দেখা আমার দীর্ঘ ২২ বছর। উনি এককথায় একজন পরিপূর্ণ মানুষ। মানবিক গুণাবলির বিচারে না হয় না-ই গেলাম। সেটা ঔদ্ধত্য হয়ে যাবে। উনি একজন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। একজন সফল বাবা। সফল শ্বশুর, যেহেতু উনি আমার শ্বশুর। দাদা-নানা প্রতিটি ভূমিকাতেই উনি পরিপূর্ণভাবে সফল। আমার খুব কাছ থেকে ওনাকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে ওনার কাছে অনেক কিছু শেখার আছে। হয়তো আমাদের সেই সময়টুকু নেই বা আমাদের সেই অবকাশটা হয় না। যদিও ব্যস্ত উনি বেশি। কিন্তু আমরা যতটা নেয়ার ওনার কাছ থেকে ততটা নিতে পারছি না। এটা আমাদের ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা। সবসময় আমরা এ ধরনের মানুষকে পাব না। যুগে যুগে এসব মানুষ আসে না। সম্প্রতি আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি, আমি আরো বেশি অনুভব করতে পারি যে একজন বাবা শুধু মাথার ওপরে ছাতা না আরো বেশি কিছু। আমার শ্বশুরের মতো মানুষ বা আমার বাবা, উনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনার মতো মানুষ, এ মানুষগুলোকে হারালে, এদের কোনো বিকল্প আছে কিনা আমার জানা নেই।

আমি গর্বিত ওনার পুত্রবধূ হিসেবে। আমি চেষ্টা করব ভবিষ্যতে ওনার নামটি ধারণ করতে। উনি এতটাই বড় পরিসরের একজন মানুষ, আমার ক্ষুদ্র সময়ে আমি ওনাকে বিশ্লেষণ করতে চাই না বা সেই সুযোগ আমার নেই। অতটা জানাও নেই আমার। উনি অনেক বড় মাপের মানুষ।

উনি আমার লেখাপড়ার ব্যাপারে সবসময় খুব সহযোগিতা করেছেন। উনি নিজেও খুব বিদ্বান মানুষ। আর উনি চাইতেন যে আমিও একটা কিছু করি। কিন্তু লেখাপড়ায় আমার বরাবরই একটু অমনোযোগিতা ছিল। মেধাবী ছিলাম কিন্তু বিয়ের পর পড়া খুব একটা উপভোগ করতাম না। আমাকে উনি একবার কোথাও একটা পরীক্ষা দিতে নিয়ে গেলেন। যতদূর আমার মনে আছে এমবিএ অ্যাডমিশন ছিল। ওই প্রথম ওনার সঙ্গে আমার রিকশা শেয়ার করা। কারণ হরতাল ছিল বা অবরোধ কিছু একটা ছিল। তখন ওনার সঙ্গে রিকশায় চললাম। কিছুদূর গিয়ে পুলিশ আটকাল। তিনি বললেন, দেখো আমাদের ছেড়ে দেবে। আমি অবাক হলাম। কাউকে ছাড়ছে না, আপনাকে কেন ছাড়বে। উনি তখন বললেন, তুমি দেখো। সেই পুলিশ ভাইরা সত্যিই ছেড়ে দিলেন। পরে বাবা আমাকে বললেন যে ছেড়ে দেয়ার একমাত্র কারণ আমার চুলটা পাকা। এটা ওনার সঙ্গে আমার মজার স্মৃতি।

বাবা ফল খেতে ভালোবাসেন। কোনো ফল উনি খান না এ রকম আমি দেখিনি। সেটা হতে পারে খুব টিপিক্যাল ফল, লটকান থেকে শুরু করে আপেল, কমলা, দেশী ফল যেকোনো ফলেই উনি অভ্যস্ত এবং খুব ভালোভাবে অভ্যস্ত। ফলে আপত্তি আমি কখনই দেখিনি। স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে মাছটা পছন্দ করেন। মাছটাও ফলের মতো। মাছেও ওনার কোনো না নেই। যেকোনো মাছ, সেটা তাজা মাছ হলে ভালো হয়।

উনি যতটুকু সময় অবসর পান আমাদের কোনো না কোনো মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করেন। সেটা অবশ্যই আমাদের জন্য ভবিষ্যতের পাথেয়। সেটা হতে পারে ওনার নাতি-নাতনির জন্য, সেটা হতে পারে আমার কী করণীয়। সেটা হতে পারে আমার হাজব্যান্ড বা আমার ননদের জন্য। এ মুহূর্তে আমরা কাছের চারটা-পাঁচটা মানুষ আছি। ইমিডিয়েট ফ্যামিলি যেটাকে বলে। সেক্ষেত্রে সবার ব্যাপারেই ওনার কোনো না কোনো মেসেজ থাকে—আমরা কী করব, কী করা উচিত। প্ল্যানিংটা কী করে করব। ভুল যেন না করি। উনি অলওয়েজ পজিটিভ একটা মানুষ। নেগেটিভিটি উনি খুব একটা অ্যালাউ করেন না। সেটা পরিবারে হোক বা আমাদের কিছু। উনি চেষ্টা করেন নেগেটিভটাকেও পজিটিভলি মেসেজ দিতে।

আরেকটা বড় ব্যাপার হচ্ছে ওনার পেশেনস। উনি ভীষণ ধৈর্যশীল। আমার ধৈর্যটা আমার নিজের বাবা আর শ্বশুরের কাছ থেকে পাওয়া। যেকোনো সারকামস্ট্যান্সে উনি অসীম ধৈর্য ধারণ করেন। এটা আসলেই প্রশংসনীয়।

শ্বশুরের কাছে তার ছেলের বউ সন্তানতুল্য। কিন্তু এ অনুভব আমার কখনই হয়নি। আমার সবসময় মনে হতো যে কিছু ক্ষেত্রে উনি আমাকে ওনার সন্তানদের থেকেও এগিয়ে রাখেন বা সন্তানসম। যথেষ্ট প্রশ্রয় উনি আমাকে দেন। এদিক থেকে আমি ভীষণভাবে ভাগ্যবতী। আমার শ্রদ্ধেয় শাশুড়ি মারা গেছেন, ওনার কাছ থেকেও আমি একশ ভাগ সাপোর্ট পেয়েছি। আর আমার শ্বশুরের থেকে একশ না হলেও ৯০ ভাগ তো পেয়েই থাকি। ওনার প্রশ্রয়টা আমাকে খুব সাহস জোগায়। আমি যেকোনো কাজে, ডেফিনিটলি সেটা ভালো কাজ, আমি পূর্ণ সমর্থন পেয়ে থাকি। এটা আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি বলে মনে হয়।

বাবাকে বোঝা একরকমের অসম্ভব। উনি ভীষণ শান্ত মেজাজের মানুষ। আর অসম্ভব ধৈর্যশীল। এজন্য ওনার কোনো চেঞ্জ সেটা মানসিক বা কোনো অস্থিরতা সেটা আমি কখনো দেখিনি। খুব বিচলিত হতে দেখিনি কখনো। হয়তো ভেতরে ভেতরে হয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা সন্তানসম তাদের কখনো বুঝতে দেননি। আর মানুষটা একটু নিভৃতচারী। নিজেকে নিয়ে বলতে খুব একটা ভালোবাসেন না। নিজেকে অতটা প্রকাশও করেন না। আমরা বুঝে নিতে অনেক চেষ্টা করি। কিন্তু সেভাবে উনি নিজেকে এক্সপ্রেস করেন না। তবে ওনার নেয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। ওনার ধারণক্ষমতাও অনেক বেশি। যেকোনো পরিস্থিতি উনি খুব শান্ত মেজাজে সামাল দিতে পারেন। সেটাও আমার কাছে মনে হয় মানুষ হিসেবে এদিকটা আসলেই খুব বিরল। এটা সবার মধ্যে থাকে না।

ফারজানা রহমান: ড. মসিউর রহমানের পুত্রবধূ