মসিউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। সে আমার সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। প্রথম একসঙ্গে কাজ করেছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। মসিউর রহমান বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সে দায়িত্ব পালন করেছে। তারপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন ড. ফরাসউদ্দিন। কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘ সময় বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিল মসিউর রহমান। তার আগেই আমি বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়ে কাজ করি। এখন তো প্রধানমন্ত্রীর অফিস। তখন বলা হতো বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়। দুইটা বিভাগ ছিল তার। প্রথমটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দ্বিতীয়টি প্রধানমন্ত্রীর অফিস। একান্ত সচিবরা প্রধানমন্ত্রীর অফিসে কাজ করতেন। উনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে। 

মনোয়ার ইসলাম ও আমি ছিলাম জয়েন্ট সেক্রেটারি। আমি মন্ত্রিপরিষদ নির্বাহী আর মনোয়ার ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। সেখানেই প্রথম মসিউর রহমানকে দেখা। নিষ্ঠাবান, সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য সরকারি আমলা সে। বঙ্গবন্ধু তাকে ঠিকই সে চোখেই দেখতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রিয়পাত্র ছিল একান্ত সচিব থাকাকালে। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ও আস্থা ছিল তার ওপর। আর আসলে আস্থাটা সে সময় খুব প্রয়োজন ছিল। কারণ আমরা তখন মাত্র গড়ে উঠছি। সেখানে একান্ত সচিবের ওপর প্রধানমন্ত্রীর আস্থা থাকাটা জরুরি ছিল। তাছাড়া গোপনীয় নথিপত্র, ফাইল, কাগজ ও চিঠিপত্র রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ছিল একান্ত সচিবের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মসিউর রহমান খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করত। খুব নিষ্ঠা আর বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে দেখেছি তাকে। যখন থেকে মসিউর রহমান আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, তার ওপর আমার একটা স্নেহ, মায়া, শ্রদ্ধা আমলা হিসেবে গড়ে ওঠে। সেটা এখন পর্যন্ত রয়েছে। 

মসিউর রহমান ১৯৭৫ সালে পিএইচডি করার জন্য আমেরিকার একটি নামকরা ইউনিভার্সিটিতে যায়। সেখানে পিএইচডি করে। ফিরে আসার আগেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ইন্তেকাল হয়। আমি ওই সময় পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে উনার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব হিসেবে কাজ করি। মসিউর রহমান ফিরে আসার আগেই আমি রোমে চলে যাই। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের অর্গানাইজেশনে যোগ দিতে। 

মসিউর রহমান ফিরে এসে ইআরডিতে জয়েন করে। ইআরডি থেকে বেশ কয়েকবার রোমে গিয়েছে সে। সেখানে জাতিসংঘের সংস্থা ছিল ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট বা আইফ্যাড নামে। সেখানে মসিউর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করত। মসিউর রহমান ততদিনে ড. মসিউর রহমান হয়ে গেছে। আইফ্যাডেও সুনাম অর্জন করে বাংলাদেশের জন্য। আইফ্যাডের অডিট কমিটির চেয়ারম্যান ছিল সে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইফ্যাড বিশ্বব্যাংকের মতোই জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। তবে অত বড় না। তারা কেবল কৃষি খাতে অর্থায়ন করে। আর সেখানে অডিট কমিটিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বপূর্ণ পদে মসিউর রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে সুনাম অর্জন করে। এমনকি এত সুনাম অর্জন করে যে তাকে আইফ্যাডের চাকরিতে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। তার ইচ্ছা থাকলে ওই অর্গানাইজেশন একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল করবে। 

বাংলাদেশে সাধারণত একটা প্রবণতা আছে। কেউ যদি উপরে উঠতে চায়, তাকে টেনে নামানো হয়। কোনো কোনো আমলা মসিউরের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। তারা চেষ্টা করেছে যাতে সে জাতিসংঘের দেয়া সুযোগটা না পায়। শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছে। সে যেতে পারেনি। বাংলাদেশেই থেকে যায় এবং অবসরে যাওয়ার পর কিছুটা রাজনীতি শুরু করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ দেয়। প্রধানমন্ত্রী মসিউর রহমানকে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। এ পদে সে অনেক দিন ধরেই আছে। আমার জানা মতে সে আওয়ামী লীগের সদস্য এবং বাড়ি খুলনায়। যদি খুলনায় তার আসন থেকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়, তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে। বাংলাদেশের যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে পারবে। সেটা কতদূর হবে বা না হবে কিংবা তার ইচ্ছা আছে কি না, সেটা জানি না। আমি জানি, মসিউর রহমান সৎ, নিষ্ঠাবান, বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষ। কেবল আমলা না, একজন দক্ষ মানুষ, উপদেষ্টা ও নাগরিক। সে যে বাংলাদেশের নাগরিক, তার জন্য আমি গর্ববোধ করি। তার মতো একজন মানুষ দেশের রাজনীতিতে আছে। দেশের অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখতে পারবে। 

আমার সহকর্মীদের বেশির ভাগই কাছের। যারা আমার চেয়ে সিনিয়র তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। তবে অধিকাংশই এখন দুনিয়ায় নেই। কনিষ্ঠ সহকর্মীদের বিবেচনায় নিলে মসিউর রহমান নিশ্চয়ই তাদের একজন, যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি। তার ওপর ভরসা করা এবং মনের কথার বিনিময় করা যায়। আজকাল তো মনের কথা শেয়ার করার মানুষ কমে যাচ্ছে। মসিউরের সঙ্গে যেকোনো ব্যাপারে খোলাখুলি আলাপ করা যায়। যে কেউ তার সঙ্গে আলাপ করলে উপকৃত হবে। আমি তাকে ‘মসি’ বলি। সহকর্মী হিসেবেও ঘনিষ্ঠ সে। আইফ্যাডে পাঁচ-ছয়বার গেছে সে। প্রতিবারই সে আমার বাসায় থাকত। আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে রোমে গিয়েছি। ব্যক্তিগত কারণে ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিই জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামে। মসি প্রতিবার সেখানে গেলে আমার বাসায় থাকত। প্রতিবার অফিসের বাইরে আমার সঙ্গে সময় কাটাত। সময় কাটিয়ে আমি উপকৃত হতাম। দেশের বাইরে থেকে দেশের অবস্থা জানতে পারতাম। সেটা আমার জন্য বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার একটা সূত্র ছিল।

কাজী হাবিবুল হক: সাবেক সিএসপি এবং জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের ডিরেক্টর