ড. মসিউর রহমান আমার এক বছরের সিনিয়র। তিনি ১৯৬৩ সালে এমএ করেন, সেখানে আমি করি ১৯৬৪ সালে। আমরা এসএম হলে থাকতাম, বোধ হয় তিনি আবাসিক ছিলেন না কিংবা অন্য কোনো হলে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার সঙ্গে খুব একটা দেখাশোনা হয়নি। এমএ পরীক্ষা দেয়ার পরে তিনি সিভিল সার্ভিসে চলে গেলেন। আমি চলে গেলাম কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে ওয়েস্ট পাকিস্তানে। এটা ১৯৬৫ বা ১৯৬৬ সালের কথা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি ব্যবসায় ঢুকলাম। তিনি আশির দশকে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউয়ে (এনবিআর) চেয়ারম্যান হয়ে এলেন। ব্যবসায়ী হওয়ার কারণে আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি। ট্যাক্স কিংবা ডিউটিতে কোনো সমস্যা হলে এনবিআরের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমি সে সময় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট। স্বাভাবিকভাবেই তখন কথাবার্তা হতো। উনার সবচেয়ে বড় গুণ উইট। সাংঘাতিক হাসতে ও হাসাতে পারেন। ভীষণ শান্ত প্রকৃতির। কোনো কিছুতেই বিচলিত হন না। খুব জটিল সমস্যা নিয়ে গেলেও তিনি এমনভাবে আলোচনা করেন, তা সহজ হয়ে ওঠে। তাছাড়া খুব ধৈর্য নিয়ে সবার কথা শোনেন। ব্যবসায়ীরা তো নানা রকম সমস্যা নিয়েই এনবিআরে যান। তিনি একটা সমাধান বের করে দেয়ার চেষ্টা করতেন। সেদিক থেকে এনবিআরের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব ভালো।
১৯৯৬ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যোগ দিই তখন প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। সে সময়ও ড. মসিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তিনি তখন আওয়ামী লীগের সিনিয়র পজিশনে ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে। সে সুবাদে কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ করতে হয়েছে আমাদের। তারপর ২০০০ সালের দিকে উনাকে আমি আমার কোম্পানিতে ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানাই। আসলে উনার অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে চাচ্ছিলাম। সেটা প্রচুর পরিমাণে পেয়েছি। তিনি খুবই ক্রিটিক্যাল থাকতেন। প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখতেন। তার স্বভাব হলো খুঁটিনাটি দেখা ও পরীক্ষা করা। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। এ নিয়ে উনার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আমাকে ডাকেন বিভিন্ন জায়গায়। দুজনের কথাবার্তা হয়। তিনি যে দেশপ্রেমিক, এটা কথাবার্তা ও কাজে দেখা যায়। দোয়া করি তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করুন। সদা হাস্যোজ্জ্বল বলে একটা পরিচয় আছে। সেটা যেন স্থায়ী হয়।
মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ হয়েছে। তিনি আমাদের তিন বছর সিনিয়র। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে সাধারণত যারা ফার্স্ট ক্লাস পায়, তারা জুনিয়র লেকচারার হয়। তিনি ১৯৬১ কিংবা ১৯৬২ সালে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হলেন। ফার্স্ট হয়েছিলেন পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়া ফখরুদ্দীন আহমদ। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ছিলেন সেকেন্ড। সে পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে আমি লেকচারার হিসেবে পেয়েছিলাম। ইকোনমিকস ক্লাস নিতেন আমাদের। দেখতে সুন্দর, ঘন কালো চুল, স্মার্টলি ড্রেস পরে আসতেন। উনার সঙ্গে আমার একটা মধুর সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল।
সবাই জানতাম উনি স্কলারশিপ পাবেন। ফুলব্রাইট স্কলারশিপ না হলেও কমনওয়েলথ স্কলারশিপ। সেটাই হলো। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার সুযোগ এল তার জন্য। স্যার কেমব্রিজে যাচ্ছেন, বিষয়টা নিয়ে আমরাও খুশি ছিলাম। একদিন দেখি ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টের সামনের করিডোরে। বললেন তিনি কেমব্রিজে যাচ্ছেন না। বিষয়টা মানতে পারিনি। কেমব্রিজের হেড তখন জন রবিনসন। তার টেক্সট বই আমাদের পাঠ্য। সেখানকার ইকোনমিকসে সুযোগ পেয়েও ছেড়ে দেবেন! তিনি বললেন, ‘আমি সেন্ট্রাল সুপিরিয়র পরীক্ষা দিয়েছি। সিভিল সার্ভিসে যাব।’ বললাম, ‘কী বলেন! কোথায় সিভিল সার্ভিস আর কোথায় কেমব্রিজের পিএইচডি’। তিনি বললেন, ‘এগুলো তুমি বুঝবে না।’
তারপর তিনি সিভিল সার্ভিসেই যোগ দিলেন। আমি করপোরেট ওয়ার্ল্ডে চলে গেলাম। দেশ স্বাধীন হলো। উনার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ করে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় দেখা। স্যার ওখানে কেন জানতে চাইলাম। বললেন তার ছেলে সেখানে ভর্তি হয়েছে। আমার ছেলেও তখন সেখানে পড়ে। নতুন করে যোগাযোগ ও কথাবার্তা হলো। তারপর বিভিন্ন সেমিনারে দেখা হতো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ফখরুদ্দীন আহমদ যখন প্রধান উপদেষ্টা, তখন তিনি অর্থ উপদেষ্টা হলেন। হঠাৎ একদিন আমাকে ফোন করলেন। বললেন, ‘আমি তোমাকে একটা অনুরোধ করব। না করতে পারবে না। তুমি এফবিসিসিআইয়ের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হও।’ আমি কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘ওখানে অনেক গণ্ডগোল চলছে। ঠিক করতে হবে। তুমি পারবে।’
আমি রাজি হতে চাইলাম না প্রথমে। আমার কিছু ধারণা আছে ওখানকার সম্পর্কে। অনেক সময় দিতে হবে। তার পরও জানতে চাইলাম আমার কাজটা কী হবে। তিনি জানালেন, একটা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করে দিতে হবে। আমি শর্ত জুড়ে দিলাম, ষাট দিনের মধ্যে নির্বাচন করে দায়িত্ব দিয়ে চলে যাব। আর সেটার জন্য লিখিত দিতে হবে। না দিলে আমি জানি কোথায় গড়াবে। উনি লিখিত দিতে রাজি হলেন। ষাট দিন আর যায়নি। খুব সুন্দর একটা নির্বাচন হয়েছে। অনেক জটিলতা ছিল। সেগুলো সরিয়ে আনিসুল হক এলেন প্রেসিডেন্ট হয়ে। এখনো দেখা হয় উনার সঙ্গে বিভিন্ন সেমিনারে। খুব সম্মান করি। উনিও স্নেহ করেন। যখনই কিছু প্রয়োজন মনে করেন, স্মরণ করেন। এ সম্পর্ক সত্যিই খুব উপভোগ করি।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং চেয়ারম্যান, এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড





