মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রুবানা হক। বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য। এর আগে তিনি প্রথম নারী হিসেবে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ছিলেন। কবি ও বক্তা হিসেবেও রয়েছে তার সুখ্যাতি। আজকের প্রতিবেদনে থাকছে অদম্য এ নারীর গল্প। লিখেছেন ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে তৃতীয় হন। হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে হন প্রথম। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকে ভর্তি হন। ভর্তির পর মাঝপথে স্কলারশিপ নিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে। তবে পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসতে হয়। বিয়ে হয় আনিসুল হকের (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র) সঙ্গে। সংসার শুরুর পর আর দশটা নারীর মতোই শিক্ষাজীবনে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। তবে থেমে যাননি রুবানা হক।

নিজের জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে রুবানা হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌জীবনে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ এলেও কখনো ভাবিনি এখানেই সবকিছু শেষ, এখানেই ফুলস্টপ। সবসময় বিশ্বাস করেছি, চ্যালেঞ্জের মাঝেও সম্ভাবনা রয়েছে এবং চেষ্টা করেছি। এ কারণে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে চলা সম্ভব হয়েছে।’

বিয়ের পর নতুন করে পড়ালেখা শুরু করেন রুবানা হক। ভর্তি হন ইডেন কলেজে। এখান থেকে স্নাতক এবং ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল নিয়ে স্নাতকোত্তর করেন। পরবর্তী সময়ে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরুষোত্তম লালের প্রকাশনা সংস্থা ও রাইটার্স ওয়ার্কশপের ওপর ‘রাইটার্স ওয়ার্কশপ: এজেন্ট অব চেঞ্জ’ বিষয়ে পিএইচডি করেন।

স্বামী, তিন সন্তান, সংসার ও কর্মজীবন সামলে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়াটা বেশ কঠিন। রুবানা হকের কাছেও তা ভিন্ন ছিল না। তিনি বলেন, ‘‌আমার সন্তানরা অনেক সময় আক্ষেপ করে বলে, তারা সকালের নাশতা করার সময় আমাকে পায়নি। তখন আমি তাদের প্রশ্ন করি, কেন পাওনি? উত্তরে তারাই বলে, সারা দিন এতটা কর্মব্যস্ত থাকতাম যে একসঙ্গে সকালের নাশতা করার সুযোগ হতো না।’

সবসময় পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ছিল রুবানা হকের। ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হবেন, লেখালেখি করবেন। কখনো ব্যবসায়ী হওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তাহলে কীভাবে ব্যবসায়ী হলেন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ পদে এলেন? এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে তার জীবনের আরেকটি ছন্দপতন। ২০১৭ সালে স্বামীর অকালপ্রয়াণ। কিন্তু বরাবরের মতোই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। রুবানা হক জানান, আনিসুল হকের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়ায় দুজনে একদিন চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। সে সময় আনিসুল হকের ব্যবসায়ী অংশীদার হিসেবে রুবানা হক ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন না। ওই সময় কাজের চাপ কমাতে ব্যবসায়িক কিছু কাজের দায়িত্ব রুবানা হককে দিতে পরামর্শ দেন চিকিৎসক। ব্যবসায়িক অংশীদারদের আর কারো পরিবারের সদস্য ওই ব্যবসায় তখন যুক্ত ছিল না। এ কারণে শুরুতে আনিসুল হক বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে সার্বিক বিষয় চিন্তা করে তিনি রুবানা হককে ব্যবসায় যুক্ত করেন। ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পর রুবানা হকের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং দক্ষতায় মোহাম্মদী গ্রুপের পরিধি আরো ত্বরিত গতিতে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে তিনি ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ড. রুবানা হকের জন্ম ঢাকায়; ১৯৬৪ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি। ২০০৬ সালে কবিতায় সার্ক সাহিত্য পুরস্কার পান। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিশ্বজুড়ে শীর্ষ ‘‌বিবিসি ১০০ নারী’র তালিকায় তার নাম উঠে আসে। জীবনে সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদানকে আজও মনে রেখেছেন তিনি। রুবানা হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমার মা বলতেন, সবসময় সাহস রেখো। আমি মায়ের এ কথা মনে রেখে চলেছি। বিশ্বাস করেছি, চ্যালেঞ্জের মাঝেও সম্ভাবনা রয়েছে। আত্মবিশ্বাস রেখেছি। এ কারণে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে চলা সম্ভব হয়েছে।’

২০১৯ সালে তিনি পোশাক রফতানিকারদের সংগঠন বিজিএমইএর নির্বাচনে সভাপতি পদে বিজয়ী হন। নারী হিসেবে এ পদে বেশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌একজন নারীর জন্য পুরুষের ছায়ায় থেকে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখা, সফল হওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময় আনিসুল হককে পাশে পেয়েছি, তবে ব্যবসায়িক সংগঠনে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি আমাকে কিছুটা নিরুৎসাহিত করতেন। তখন আমি অবাক হতাম! কেন তার মতো প্রগতিশীল একজন মানুষ এমনটি বলছেন? পরে আমি যখন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলাম, তখন বুঝলাম কেন তিনি বলতেন। আমার ভালোর জন্যই বলতেন। বিজিএমইএর মতো সংগঠনগুলোয় তীব্র সাংগঠনিক রাজনীতি থাকে। এমন একটি সংগঠনে যখন সব পুরুষ সদস্যের মাঝে একজন নারী থাকে এবং অর্ধেকের বেশি মতামত যায় তার বিপক্ষে, তখন ওই নারীর কাজ করাটা এবং ওই জায়গায় পরিবর্তন আনাটা বেশ দুষ্কর।’

২০২২ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ড. রুবানা হক। ব্যবসায়িক জগতের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার এ দায়িত্ব বেশ উপভোগ করছেন উল্লেখ করে বলেন, ‘‌উপাচার্য হিসেবে বেশ আনন্দে সময় কাটছে। কারণ এখানে কোনো রাজনীতি নেই, হিংসে নেই। বিজিএমইএতে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ধরনের রাজনীতির মুখোমুখি হতে হয়েছে সে তুলনায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পরিবেশ স্বর্গতুল্য।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবার একত্র হয়ে কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন রুবানা হক। তিনি বলেন, ‘‌সমাজে এক শ্রেণীর মানুষের মনমানসিকতার কারণে নারীদের বিভিন্ন সময় হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়। নারীকে চুপ করিয়ে রাখা হয়, কেউ যদি নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে যেন তারই দায় বেশি। সব মিলিয়ে নারীকে নিয়ে এমন একটা ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরি করা হয়, যার জন্য নারী ঠিকভাবে কথা বলতে পারে না, প্রতিবাদ করতে পারে না। নারীকে নিরাপদে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। যদি নারীকে প্রতিনিয়ত এক ধরনের তির্যক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় এবং নানা বেড়িতে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয়, তাহলে নারী কখনই মুক্ত হবে না এবং নির্যাতন-নিপীড়নও শেষ হবে না।’

দেশে নারী উদ্যোক্তাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌নারীদের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো মূলধন। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলে, শতকরা ১০ ভাগ ঋণ নারীদের দিতে হবে। কিন্তু কতজন নারী এ ঋণ নিতে পারেন? বিশেষত প্রান্তিক পর্যায়ের কতজন নারী এ সুযোগ পান? এ কারণে আমি মনে করি, যদি একটি ন্যাশনাল ক্রেডিট প্লাটফর্ম করা হয়, যেখানে সারা দেশ থেকে অ্যাকসেস করা যাবে, তাহলে দেখা যাবে, শুধু ঋণ নেয়ার নয়, ঋণ দেয়ার হিড়িক পড়ে যাবে। আর সফল হতে হলে নারীকে এর পেছনে লেগে থাকতে হবে। যেমন আমি দেখি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারী উদ্যোক্তা। কিন্তু উদ্যোক্তা হয়ে এর পরের ধাপটি কী? তাদের মানোন্নয়ন কীভাবে করা হবে? তাদের মানোন্নয়ন করতে হলে আমাদের অনেক আরএনডি (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) সাপোর্ট দরকার। এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যদি অন্তত স্কেল আপ করানো যায় এবং রফতানির সঙ্গে তাদের যুক্ত করা যায়, তাহলে নারী উদ্যোক্তারা দ্রুত এগিয়ে যাবে।’

বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নারীদের সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রুবানা হক বলেন, ‘‌নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নারীরা অনেক সময় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। আবার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈষম্য। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে নারীকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, সাহসের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে, কাজ করতে হবে। সবাই যেন বুঝতে পারে আপনি একজন আত্মবিশ্বাসী, কর্মক্ষম মানুষ। নারী যদি তার আত্মবিশ্বাসের জায়গাটি ঠিক করতে পারে, তাহলে তার সাফল্য অনিবার্য।’