দেশের অন্যতম বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাল তীর সিড লিমিটেড। ১৯৯৫ সালে দেশে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে কোম্পানিটি। শাকসবজির উন্নত জাত নিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি। এখন ডাল, চাল, তেল ও রেশম জাতীয় বীজ উন্নয়নে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বীজ কোম্পানির সূচকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় লাল তীর সিড সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে। দেশের বীজ খাতের সার্বিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলছেন কোম্পানিটির চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াহইয়া নকিব 

বীজ ব্যবসার শুরু হয়েছিল কীভাবে?

ব্যক্তিগত কাজে আমি দেশের বাইরে অনেকবার গিয়েছি। তখন দেখেছি, অন্যান্য দেশের শাকসবজি দেখতে সুন্দর ও আকার-আয়তনে বড়। কিন্তু বাংলাদেশে ফিরে এসে উল্টো চিত্র দেখি। এ দেশে চাষ হওয়া শাকসবজি দেখতে ছোট ও পোকামাকড় খাওয়া। তখন আমি নেদারল্যান্ডসের এক বীজের কোম্পানির সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বলেছিলেন, যদি ফসলের বীজ আগের মতো থাকে তাহলে উৎপাদিত শাকসবজি ছোট হবে। যদি ভালো মানের বীজ বপন করা যায় তাহলে যে জমিতে এক মণ ফসল উৎপন্ন হতো সে জমিতে পাঁচ মণ ফসল উৎপন্ন হবে। কিন্তু খরচ একই থাকবে। নেদারল্যান্ডসের ওই বীজ কোম্পানির সঙ্গে কথা বলার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার দেশেও একটি বীজ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি গঠন করব। সে হিসেবে ১৯৯৫ সাল থেকে এর শুরু এবং ২০০৩ সালে গিয়ে আমরা প্রথম বাজারে যাই।

দেশের বীজ খাতের মার্কেট সাইজ কেমন?

আমাদের যে হিসাব তা হলো ২২ হাজার কোটি টাকার মার্কেট। আবার অনেকে বলে আমাদের ৩৪ হাজার কোটি টাকার মার্কেট। তবে বীজের মার্কেট আসলে কতটুকু এটা নিয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশের আসলে পরিসংখ্যান ঠিক নেই। আমদানি-রফতানি কিছুর পরিসংখ্যান ঠিক নেই। আমাদের সবকিছুর পরিসংখ্যান ভুল। পরিসংখ্যান যদি ভুলভাল দেয়া হয়, তাহলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়। ভুলভাল পরিসংখ্যানের জন্য দেশকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আমাদের মূল্য সমস্যা পরিসংখ্যানগত। 

লাল তীরের অবস্থান এখন কেমন?

আমরা ২৮-৩০ ধরনের শাকসবজির বীজ উৎপাদন করি। যেই মাত্র আপনি ডালে যাবেন তখন আরো আট ধরনের ডাল পাবেন। আপনি যদি ধানে যান তখন দেখবেন একেক সময় একেক ধরনের ধান করা হয়, আউশে একটা, আমনে আরেকটা, বোরোতে আরেকটা। বিরি তো বেসিক্যালি কাজ করে ইরি। আমাদের তো সে সুবিধা নেই। এখন আমরা ইরিরও মেম্বার। আমরা বিভিন্ন সময়ের আবহাওয়া উপযোগী ধান উৎপাদন করি। এখন পর্যন্ত আমরা প্রত্যেক শাকসবজির একটা থেকে দশটা পর্যন্ত উন্নত জাত করতে পেরেছি নিজস্ব ব্রিডিংয়ে। এরপর আমরা হাত দিয়েছি ডালে। কারণ দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রোটিনের অভাব পূরণ করে ডাল। ডালে প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি। শাকসবজিতে ভিটামিন বেশি, প্রোটিন কম। মানুষের তো উভয়ই প্রয়োজন। এখন আমরা লবণাক্ততা ও তাপ সহনীয় জাত নিয়ে কাজ করছি।

বীজের মার্কেটে দেশীয় উৎপাদনকারীদের অবস্থান কেমন?

ধান পুরোটাই বাইরে থেকে আমদানি করি। এর মধ্যে আছে কিছু হাইব্রিড। আমরা ৬-৭ শতাংশ ধান বীজ নিজেরা উৎপাদন করি। এছাড়া শাকসবজিরও অর্ধেকের বীজ আমরা আমদানি করি। আমরা অনেক সবজির বীজ চাইলেও উৎপাদন করতে পারব না। অনেক সবজির বীজ দেশে এনে রি-প্রোডাকশন করি। মসলাও আমাদের বেশির ভাগ বাইরে থেকে আমদানি করা লাগে। আমাদের দেশে যে হলুদ উৎপাদন হয় তা দিয়ে সাড়ে তিন মাস চলে। পরে আমাদের তা ভারত থেকে আমদানি করা লাগে। আমাদের দেশে বলা হয় আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ—আমাদের এটা বলা বাদ দিতে হবে। এ কথা নিষিদ্ধ করতে হবে। এটা যারা বলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা লাগবে। কীভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ? চাল, ডাল, গম, ভুট্টা, মসলা সবই তো আমদানি করতে হয়।

নতুন কী ধরনের জাত নিয়ে কাজ করছেন?

আমাদের এখন মূল লক্ষ্য ডাল উৎপাদন বাড়ানো। এ বছর থেকে আমরা ডালে পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ধান, ডাল ও কোস্টাল এরিয়া বাড়ানো। আমরা এখন কোস্টাল এরিয়ায় সয়াবিন উৎপাদন শুরু করেছি। যেগুলো উচ্চ ফলনশীল সেগুলোতে বেশি সময় লাগে। যে কারণে আমরা ধানের ক্ষেত্রে যা চাচ্ছি কম সময়ে কীভাবে হার্ভেস্টিং করা যায়। আবার ফুলের দিকেও উৎপাদন বাড়ানো যায়। ফুলের বাজারও এখন বড় হচ্ছে। এটা নিয়েও আমরা কাজ করব। 

আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার কী ধরনের সাহায্য করতে পারে? 

আমাদের যে সরকারি তথ্য আছে তা মিথ্যা, আমাদের যে কৃষি সম্পর্কিত পরিসংখ্যান আছে তা মিথ্যা। এসব মিথ্যা পরিত্যাগ করা হবে সবচেয়ে বড় সহায়তা। এসব বিষয় সেখানে কর্মরত জনবল থেকে কৃষক সবাই জানে। আমার মূল কথা হলো কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমাদের জমিগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে গবেষণা করা উচিত। 

বাংলাদেশে বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের চাষ বাড়ছে, আবার অন্যদিকে আবাদি জমির পরিমাণ কমছে—এটা কি অব্যাহত থাকবে? 

হ্যাঁ, এটা আরো বাড়বে। আম বা ড্রাগন চাষে লাভ বেশি। আমাদের এখানে জমির পরিমাণ কম। আমাদের এখানে একজন কৃষকের জমি থাকে ৫ বিঘা বা ১০ বিঘা। এ জমিতে চাষাবাদের মাধ্যমেই তাকে পরিবার চালাতে হয়। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হয়। তখন সে অবশ্যই লাভের দিকে ঝুঁকবে। এখন কৃষক একটি কাজ করতে পারে, বলতে পারে কোনো জমি খালি রাখা যাবে না। তবে কী চাষ করবে তা কৃষকদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। 

দুধ ও মাংস নিয়ে কী ভাবছেন?

মেইন কনসার্নের জায়গাগুলো হলো দুধ। আমাদের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ দুধ আমদানি করা লাগে। তবে দেশে মোট কত দুধ উৎপাদিত হয় তার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। আমাদের মহিষের দুধ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে হবে। আমাদের বাংলাদেশের যে আবহাওয়া তা মহিষের দুধ উৎপাদনের জন্য ঠিক আছে। তাই আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি মহিষের দিকে। গরু আর মহিষের দুধে যে রাসায়নিক উপাদান তা একই। মেইন পার্থক্য হলো ফ্যাটের দিকে। আমরা দুধ নিয়ে কাজ শুরু করি ২০১৯ সাল থেকে। গ্রামে মানুষদের আয় বাড়ানোর দুটি উপায় থাকতে পারে—একটি হলো উন্নতমানের বীজ, আরেকটি হলো পশুপালন। উন্নত বীজ ছাড়া উৎপাদন বাড়ানোর আর কোনো বিকল্প নেই।