বাংলাদেশের মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস লিমিটেড, যারা বিদেশী ব্র্যান্ডের রাজত্বেও দেশের নাম উজ্জ্বল করে চলেছে এক দশকের বেশি সময় ধরে। বিভিন্ন সক্ষমতার ও মডেলের মোটরসাইকেল সারা দেশে ও বিদেশেও সরবরাহ করছে রানার। দেশে নির্মিত কোম্পানিটির বিভিন্ন মডেলের জনপ্রিয় একটি কাইট প্লাস, যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো গ্রাহকের পছন্দের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
রানারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খানের হাত ধরে। দেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে বাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি করে অ্যাসেম্বল করার (জোড়া লাগানো) সুবিধা স্থাপনের মাধ্যমে কোম্পানিটি মোটরসাইকেলের ব্যবসায় প্রবেশ করে। তখন রানার চীন থেকে দায়াং ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ এনে অ্যাসেম্বল ও বিক্রি করত।
ছাত্রজীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন হাফিজুর রহমান খান। নিজের ব্যবসায়িক জ্ঞান ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারেন ব্র্যান্ডকে জনপ্রিয় করে বাজার সম্প্রসারণের জন্য মোটরসাইকেলের দাম কমাতে হবে এবং দেশে উৎপাদনই একমাত্র উপায়। রানার তখন শুধু ইঞ্জিন আমদানি করে মোটরসাইকেলের বাকি যন্ত্রাংশ তৈরি শুরু করে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশীয় বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করে।
নিজের ব্যবসা শুরুর আগে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য হাফিজুর রহমান খান একটি পাট রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। অল্প সময়ের মাঝেই বুঝতে পেরেছিলেন কৃত্রিম কাপড় ও পলিথিনের প্রতিযোগিতায় অদূরভবিষ্যতে পাট ব্যবসা টিকবে না। পরে তিনি আশির দশকে কৃষি পাম্পের ব্যবসা শুরু করেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপানি অটোমোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন্ডার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন, যা পরবর্তী সময়ে তার নিজের অটোমোবাইল ব্যবসা শুরু করতে সহযোগিতা করে।
২০০৭ সালে ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তরে ময়মনসিংহের ভালুকায় কোম্পানির নিজস্ব জমিতে একটি কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করে রানার। প্রায় ৫০০০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ৪,৪০,৩১০ বর্গফুটের বিশাল এ কারখানা প্রিফ্যাব্রিকেটেড ইস্পাত কাঠামোতে নির্মিত। পাঞ্চিং, ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং, অ্যাসেম্বলি ও রিসার্চের জন্য যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর বুয়েটের কোয়ালিটি টেস্টিং পাস করার মাধ্যমে কারখানাটি ২০১১ সালে বাইক প্রস্তুতকারক হিসেবে সরকারি অনুমোদন পায়। ২১ জানুয়ারি ২০১২ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে রানারের পথচলা শুরু হয়। শুরুর দিকে রানারের দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫০০টি বাইক। নিয়মিত সম্প্রসারণের মাধ্যমে এখন তারা দৈনিক ১০০০টি বাইক তৈরি করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। রানার গ্রুপের বর্তমান কর্মী সংখ্যা ৭০০-এর অধিক, যার মাঝে শুধু কারখানায়ই প্রায় ৫০০ জন কর্মরত আছেন।
দেশেই উৎপাদন করার ফলে রানারের তৈরি করা বাইকের মূল্য লাখ টাকার ঘর থেকে কমিয়ে ৬৫,০০০ টাকার আশপাশে রাখা সম্ভব হয়েছে। রানারের প্রতিষ্ঠাতা জানিয়েছেন, গ্রাহকদের জন্য টু-হুইলারকে আরো সাশ্রয়ী করতে তাদের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৪০ হাজার টাকায় মোটরসাইকেল সরবরাহ করা। বর্তমানে রানার ৫৫ সিসি থেকে ১৫০ সিসি ক্ষমতাবিশিষ্ট ইঞ্জিনসম্পন্ন মোটরসাইকেল তৈরি করে দেশে ও দেশের বাইরে বাজারজাত করছে। দেশীয় বাজারে কোম্পানিটির ৫০ সিসি থেকে ৮০ সিসি রেঞ্জের বাইক বেশি জনপ্রিয়। এছাড়া ২০১৭ সালে নেপাল ও ভুটানে মোটরসাইকেল রফতানি শুরু করার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে রানার। ২০১৮ সালেই তারা ৭০০ ইউনিটেরও বেশি বাইক রফতানি করেছে, যার পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে। মোটরসাইকেল বা টু-হুইলার ছাড়াও রানার বর্তমানে সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার উৎপাদন করছে।
বাজারে মজবুত অবস্থান তৈরির লক্ষ্যে রানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনেক উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করছে এবং কীভাবে খুচরা যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক যেমন সিট, কন্ট্রোল কেবল, তারের জোড়া, টায়ার, টিউব এবং ব্যাটারি প্লাস্টিকের উপাদান তৈরি করা যায় সেই প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। বিক্রেতা ও ছোট উদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য কাজের মূল লক্ষ্য আমদানির পরিবর্তে স্থানীয়ভাবেই টু-হুইলার ও থ্রি-হুইলার যানের তৈরীকৃত যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা। রানারের সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি হলো তাদের নিজস্ব কারখানা স্থাপন করে উৎপাদনে প্রবেশ করার ফলে হোন্ডার মতো বিখ্যাত জাপানিজ টু-হুইলার ব্র্যান্ডকেও বাংলাদেশেই নিজেদের কারখানা স্থাপন করতে বাধ্য করেছে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রানার অটোমোবাইলস নিজেদের ব্যবসা আরো সম্প্রসারিত করছে বিভিন্ন খাতে, যেমন লুব্রিক্যান্ট, রিয়েল এস্টেট, ইট এবং চার চাকার বাণিজ্যিক যানবাহন বিপণন ও বিতরণ। সম্প্রতি ২০২৩ সালের মাঝামাঝি ইতালীয় বিখ্যাত অটোমোবাইল কোম্পানি ফেরারি বাংলাদেশে চার চাকার অটোমোবাইল তৈরিতে রানারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা বাস্তবায়িত হলে রানারের হাত ধরে বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাতের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাসের সূচনা করবে।
বাংলাদেশে অটোমোবাইল কারখানা স্থাপনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী রানার কর্তৃপক্ষ কেননা নির্মাণ, জমি ও বিদ্যুতের খরচ দেশে এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চেয়ে কম। ফলে দেশে যে দামে গ্রাহকদের জন্য অটোমোবাইল প্রদান করা সম্ভব তা বিদেশী মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডগুলো দিতে পারবে না। নিজেদের ক্রমবর্ধমান ও পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী কয়েক দশকের মাঝে প্রযুক্তিগত ও উৎপাদিত পণ্যের ধরনে সম্পূর্ণ নতুনত্ব নিয়ে আসতে বর্তমানে কাজ করছে রানার।





