মিসরে রয়েছে বিশ্বের প্রাচীন ও খ্যাতনামা আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। কর্মসূত্রেও অনেকে মিসরে বাস করছেন। মিসরে বসবাসরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জীবন নিয়ে কথা বলেছেন আল আজহার ইউনিভার্সিটির এমফিল গবেষক শরিফ উদ্দিন আব্দুল মান্নান। তিনি বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন, কায়রোর সভাপতি। কথা বলেছেন এস এম রশিদ
আল আজহার
বিশ্বের প্রাচীন
ও বিখ্যাত
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি।
এ প্রতিষ্ঠানে
বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের
সংখ্যা কত?
তাদের পড়াশোনার
বিষয় ও
শিক্ষাজীবন সম্পর্কে
জানতে চাই।
আসসালামু আলাইকুম। মিসরের আল আজহার, কায়রো ইউনিভার্সিটিসহ অন্যান্য ইউনিভার্সিটিতে অনেক বাঙালি আছেন। আল আজহারে রয়েছেন ৫০০-৬০০ জন।
দ্বীনি প্রতিষ্ঠান আল আজহার। এখানে আরবিতে সব পরীক্ষা দিতে হয়। বাংলাদেশে যারা কওমি মাদ্রাসায় পড়েন, তারা তো আরবি পড়ে আসেন। আপনারা শুনে অবাক হবেন তারা এখানে খুব ভালো রেজাল্ট করেন। এ বছর ইন্টারমিডিয়েটে পুরো পৃথিবীর বিভিন্ন পরীক্ষার্থী এখানে আছেন। প্রায় ১০৬টা দেশের উপরে। প্রতিযোগিতা করে ইন্টারমিডিয়েটে সেরা দশজনের নয়জনই ছিল আমাদের বাংলাদেশের ও কওমি মাদ্রাসার। এগুলো বাংলাদেশের অনেক পত্রিকায়ও এসেছে। ম্যাট্রিকেও দশজনের মধ্যে ছয়জন ছিল বাংলাদেশী, তারাও কওমি মাদ্রাসার। রেজাল্টের ক্ষেত্রেও তারা খুব ভালো করেছেন। প্রতিটা ফ্যাকাল্টিতে এক নম্বর বা দুই নম্বর বা টপ টেনে, মার্ক নব্বইয়ের উপরে, গোল্ডেন প্লাস আমাদের বাঙালিরাই করে থাকেন বিদেশীদের মধ্যে। মিসরীয়রাও অনেক ভালো আছে। পড়াশোনার দিক দিয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছে এখানে।
আল আজহার
ছাড়া মিসরের
আর কোন
কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা
পড়াশোনা করেন?
আল আজহার ছাড়া কায়রো ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশীরা পড়াশোনা করেন। কায়রো ইউনিভার্সিটিতে তারা মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করেন। আইন বিষয়ে শামস ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। আসওয়ান, ইসকানদারিয়া ও ফাইয়ুমেও ইউনিভার্সিটি আছে। বাঙালিরা এসব প্রতিষ্ঠানেও পড়াশোনা করেন। মিশরের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটিশ ইউনিভার্সিটিতেও কিছু বাঙালি পড়াশোনা করেন।
যারা
মিসরে উচ্চশিক্ষা
গ্রহণ করছেন
তারা কি
মিসরেই চাকরি
করছেন? নাকি
বাংলাদেশে ফিরে
আসেন?
যারা এখানে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন, তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশে চলে যান। তাদের এখানে চাকরি করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে আজহার কোনো বিদেশীদের চাকরি দেয় না। চাকরির সুযোগ নেই তাদের সংবিধানে। বেশির ভাগ ভাইয়েরাই বাংলাদেশে ফিরে যান। তবে ৪০ শতাংশ বাংলাদেশে না গিয়ে বিভিন্ন দেশে তাদের কর্মস্থল খুঁজে নেন।
বাংলাদেশ
স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন,
ইজিপ্ট সম্পর্কে
জানতে চাই।
বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন, ইজিপ্ট একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে বাঙালি যত ছাত্র আছে, বাংলাদেশে সে যে মতাদর্শেই থাকুক না কেন, এখানে ছাত্র হিসেবে যে ইউনিভার্সিটিতেই পড়ুক না কেন, মিসরের সব ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশী ছাত্রদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টুডেন্স অর্গানাইজেশন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। আজ পর্যন্ত সুন্দরভাবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে এখানে বাঙালি ছাত্র ভাইদের ও বাঙালি শ্রমিকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থী
ছাড়া মিসরে
বসবাসকারী বাংলাদেশীদের
সংখ্যা কেমন
হতে পারে?
তারা সাধারণ
কোনো ধরনের
পেশায় নিয়োজিত?
শিক্ষার্থী ছাড়া এখানে ব্যবসায়ী বা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বেশির ভাগই গার্মেন্টসে চাকরি করেন। কিছু ভাই ব্যবসা করেন, গার্মেন্টসের মালিকও আছেন কেউ কেউ। যারা শ্রমিক, তাদের বেতন ২৫০, ৩০০ কিংবা ৩৫০-এর মতো।
বাংলাদেশীরা
সাধারণত কোন
কোন শহরে
বাস করেন?
বাংলাদেশীরা বেশির ভাগ কায়রোয় বসবাস করেন। এরপর আলেকজান্দ্রিয়া, ফাইয়ুমেও বসবার করছেন। অন্যান্য জায়গায় খুব কম।
মিসরে
বসবাসরত বাংলাদেশ
কমিউনিটির জীবনযাত্রা,
পারস্পরিক যোগাযোগ,
সামাজিক কর্মকাণ্ড
বিষয়ে শুনতে
চাই।
এখানে এম্বাসি সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলার চেষ্টা করেন। আমাদের বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন সবাইকে নিয়ে চলার চেষ্টা করে। এম্বাসিসহ আমাদের সংগঠন বাংলাদেশের জাতীয় যত উৎসব আছে, কর্মদিবস আছে, সেগুলো পালন করে। যখন আমাদের কিছু বাঙালি শ্রমিক লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন, অনেক সময়ই তারা বিপদে পড়েন। সে বিপদেও উদ্ধারের কাজে বাঙালি স্টুডেন্টরা এম্বাসেডরের সঙ্গে গিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন। কিছুদিন আগের ঘটনা, কিছুদিন বলতে সাত-আট বছর। মিসরের শহর সাল্লুম লিবিয়ার বর্ডারের পাশে অবস্থিত, যেখানে আমি গতকাল ছিলাম। সেখানে কিছু বাঙালি আটকা পড়েছিল। তাদের উদ্ধারের কাজে এম্বাসি
যেমন সহযোগিতা করেছে, তেমনটা আমাদের বাংলাদেশ স্টুডেন্স অর্গানাইজেশন তেমন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
মিসরে
স্থানীয়দের সঙ্গে
বাংলাদেশীদের সম্পর্ক
কেমন?
মিসরীয় স্থানীয়দের সঙ্গে বাংলাদেশীদের সম্পর্ক ভালো। তারা অনেক ভালো। সর্বোপরি অনেক ভালো মানুষ তারা। তারা কোনো বাঙালিকে হয়রানি করে না। শুধু বাঙালি নয়, কোনো বিদেশীকে তারা হয়রানি করে না। ইন্দোনেশিয়ান, মালয়েশিয়ান, ফিলিপিনো, আমেরিকান, ফরাসিসহ ইউরোপের অনেক দেশের মেয়ে এখানে পড়াশোনার জন্য আসেন। উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, রাশিয়া থেকে মেয়েরা এখানে পড়তে আসেন। তারা ফ্যামিলি নিয়ে আসেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা হয়তো কম আসেন, সুযোগ পান না বলে। এসব মেয়ে নিজেদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে, যারা অবিবাহিত তারাও এখানে সুন্দরভাবে পড়াশোনা করতে পারেন। রাতে-দিনে গাড়িঘোড়ায় একা চলাফেরা করতে পারেন। তারা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। সে হিসেবে মিসরীয়রা অনেক ভালো আমি বলব। তারা ধর্মীয় দিক দিয়েও অনেক ভালো। ধর্মীয় সব নিয়মকানুন মেনে চলেন। সবার প্রতি অনেক সহানুভূতিশীল। অনেক বাঙালি শ্রমিক অনেক মিসরীয় মেয়েদের বিয়েও করছেন। বিয়ে করে পরিবার নিয়ে এখানে আছেন।





