প্রবাসে বাংলাদেশ ছড়িয়ে আছে সবখানে। ডারবানে গেলেও পাওয়া যাবে টুকরো বাংলাদেশ। চ্যাটস ওয়ার্থের এ জায়গাটিকে বলা হয় ‘বাংলাদেশ মার্কেট’। চ্যাটসওয়ার্থ মূলত ডারবানের উপশহর অঞ্চল। এখানে সমসময়িক ভারতীয় তথা উপমহাদেশীয় জীবনের চিত্র পাওয়া যায়। মূল মার্কেট তথা বাজারটি ১৯৮০ সালে স্থাপন করা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বয়স্ক ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের সেবা দেয়া ও তারা যেন সাশ্রয়ী খরচে পণ্যদ্রব্য কিনতে পারে তা নিশ্চিত করা। বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের কাছে এ ব্যবস্থাটি খুবই উপযোগী মনে হয়েছিল কেননা তারা সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছতে পারতেন। মূলত ছোট কৃষকরা নিয়ে আসতেন আর ক্রেতা ছিল এখানকার অধিবাসীরা। এরপর বাজারটি চেসি ভিলেজে স্থানান্তর করা হয়।

অবশ্য এই বাজার ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পেছনে একটা ইতিহাস আছে। ডারবানের চ্যাটসওয়ার্থে মূলত ভারতীয়দেরই বসতি ছিল। কিন্তু আশির দশকের শুরুতে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবমাননা করা হয়। তাদেরকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেয়া হলেও তাদের রাজনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হয়। সে সময়েই এ অঞ্চলের অধিবাসী বিশেষত বয়স্ক ও অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। চ্যাটসওয়ার্থ কোঅর্ডিনেটিং কাউন্সিল এক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছিল। তারাই সেবা দেয়ার কাজ শুরু করে। এর আগে চ্যাটসওয়ার্থের অধিবাসীরা চেকার্সের মতো খুচরা দোকান থেকে কেনাকাটা করত। এরা প্রতি বুধবারে অবসরপ্রাপ্তদের জন্য স্বল্প দামে পণ্য কেনার সুযোগ দিত। এ দিনটি পেনশনার’স ডে নামে পরিচিত ছিল।  এটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে চ্যাটসওয়ার্থ কোঅর্ডিনেটিং কাউন্সিল এগিয়ে আসে।

মার্কেটটি শুরু করার ক্ষেত্রে দ্য হেয়ার কৃষ্ণা টেম্পলের অবদান ছিল। তারা প্রথমে চেকার্সের মতো করে সপ্তাহে একদিন পেনশনারদের জন্য কম মূল্যে ফল ও সবজি দিত। দেখা যায় ধীরে ধীরে এখানে ক্রেতার সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে মন্দিরের তরফ থেকে প্রাঙ্গণের একটি অংশ সবজি ও ফলের বাজার বসানোর জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। এ সময় থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই দেখল যে সরাসরি নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের কারণে উভয়েই লাভবান হচ্ছে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী না থাকার কারণে ক্রেতারা কম মূল্যে পণ্য পাচ্ছেন এবং বিক্রেতারা তাদের লাভ রাখতে পারছেন সহজে। সর্বোপরি অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো একটা ব্যপার হলো।

বাংলাদেশ মার্কেটটি কেবল মন্দিরের পাশেই নয় এখানে একটি মসজিদ আছে। ডেইলি ম্যাভেরিকে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ওয়ান্ডা হেনিগ লিখেছেন এখানে ভারতীয় উপমহাদেশের নানা ধরনের খাদ্যপণ্যের সমাহার রয়েছে। আম, লিচু থেকে শুরু করে বাদাম, শসা, কলা এমনকি শিমও পাওয়া যায় এ বাজারে। নিবন্ধের সঙ্গে দেয়া ছবিতে মিষ্টিকুমড়া ও চিচিঙ্গাও দেখা যায়। এ বাজারের একজন বিক্রেতা ফরিদা গফুর। তিনি বাংলাদেশ মার্কেটে ‘আচার আন্টি’ (পিকল আন্টি) নামে পরিচিত। চার ধরনের আচার নিয়ে তিনি তার পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন এবং এখন তার আচারের সংখ্যা ত্রিশ রকম। ফরিদা জানান তিনি শুক্রবারে ১৮ রকম আচার নিয়ে বসেন আর শনিবারে আনেন পুরো ৩০ রকম। প্লাস্টিকের কন্টেইনারে করে তিনি এসব আচার রাখেন আর ক্রেতাদের দেন বোতলে করে। এ কাজের জন্য বাড়িতে তাকে দুজন সাহায্য করে।

এছাড়া আছেন রাণী দুর্গাপ্রসাদ। ত্রিশ বছর ধরে তিনি নানা রকম রান্না করছেন ও তা এই বাজারে নিয়ে আসেন। চপ, শিঙাড়া, বেগুনির মতো খাবারগুলো নিয়ে তার কারবার। রেফ্রিজারেটরের ওপর একটা বুমবক্স রেখে ‘ভাজিয়া’ বিক্রি করেন তিনি। বাংলাদেশ মার্কেটে ওয়ান্ডা দেখা পেয়েছেন সিন্ডি গোভিন্দর ও আনি নাইডুর। তারা মূলত তাজা সবজি বিক্রি করেন। গোবিন্দরের বয়স ৬৩ এবং নাইডুর ৮০ বছর। তারা এই বাজারের শুরু থেকেই যুক্ত।

আচার, পেঁয়াজ, আদা, কলা থেকে শুরু করে খাসির মাংস ও খাসির মাথা পাওয়া যায় বাংলাদেশ মার্কেটে। এ বাজার ব্যবস্থাটি বর্তমানে মিউনিসিপ্যালিটির অধীনে রয়েছে তবে এর কাজ ও দেখভালের দায়িক্ব স্থানীয়দেরই। মার্কেটটি প্রতি শুক্র ও শনিবার বসে শ’ খানেক পসরা নিয়ে।

 

আলী আমজাদ: লেখক