[বাংলাদেশ থেকে দেশান্তরিত হয়ে যারা দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছেন দেশত্যাগের অভিজ্ঞতা নিয়ে, তাদের প্রশ্ন করা হলে অধিকাংশই অদ্ভুত উত্তর দিয়েছেন। এদের সবাই ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে যেতে না পেরে দালালের খপ্পরে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছেন। লন্ডন বা নিউইয়র্কের চাকচিক্যের তুলনায় দক্ষিণ আফ্রিকা এদের সেভাবে টানেনি। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকার গবেষক অমৃতা পান্ডে দেশটিতে বাঙালিদের অভিযাত্রার বিষয়ে একটি গবেষণা করেন। বাংলাদেশের অনেক অভিযাত্রীর সঙ্গে এ গবেষকের কথোপকথনে এমন অভিযাত্রার পেছনের অনেক নির্মম ঘটনা উঠে এসেছে। বাঙালি অভিযাত্রীদের নির্মম অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি Mobile
Masculinities: Migrant Bangladeshi Men in South Africa নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এ প্রবন্ধ অবলম্বনে এ লেখাটি পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো]
কেস স্টাডি হিসেবে আবির, আশিক আর মিথুনের গল্পের প্রসঙ্গ অমৃতা পান্ডের গবেষণায় এসেছে। ২৩ বছর বয়সী আবির তার তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজোজন। তার বড় ভাই কলেজছুট এবং আমড়া কাঠের ঢেঁকি। সরকারি চাকরিজীবী পিতা তার বড় ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করতে একটা দোকান কিনে দিল এবং বিয়ে-থা করিয়ে দিল। অবশ্য এতেও আবিরের বড় ভাইয়ের কোনো গতি হলো না। অর্থের সংকটে আবিরকেই মাদ্রাসা ছাড়তে হলো। বড় ভাইয়ের ব্যর্থতার অনেক দায়দায়িত্ব তার ওপর এসে বর্তায়। ছেলেমানুষ হিসেবে সংসারের ভার বড় ভাই তার নিজের কাঁধে নিতে না পারায় তার খেসারত দিতে হয় আবিরকে। আবিরের সঙ্গে কথোপকথনে আরো আশ্চর্য কিছু বিষয় উঠে আসে। তার মা-বাবার ধারণা, ছেলেমানুষ হলে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে তাকে বিদেশ যেতেই হবে। যেহেতু বিদেশ গিয়ে উপার্জন করে নিজের পরিবারে সচ্ছলতা আনার মতো মুরোদ আবিরের বড় ভাইয়ের ছিল না সেহেতু আবিরকেই দক্ষিণ আফ্রিকা পাড়ি জমাতে হলো।
৩২ বছর বয়সী আশিকের গল্পটাও এমনই। সে সেনাবাহিনীর এক হাওলাদারের একমাত্র ছেলে। তার পরিবারের বড়রাই ছোটদের বিদেশ যেতে বাধ্য করে। তার জবানিতে উঠে আসে, সারা জীবন বিদেশে পড়ে থেকে কষ্টে জীবন কাটাতে আমি চাই না। কিন্ত বাবা চায়, বিদেশ গিয়ে আমার সত্মার জন্য যেন স্বর্ণ কিনি। আমি তা করতে চাইতাম না। আমি বলতাম, বাড়ি ফিরেও আমি স্বর্ণ কিনতে পারব। কিন্তু আমার বাবা তার স্ত্রীর জন্য বাইরের আসল স্বর্ণ চাইতেন। আমি চিন্তা করতাম, বাবার তো আমি ছাড়া আর কোনো ছেলে নাই যে তাকে বিদেশ পাঠাবে। মালেশিয়ায় যত টাকা জমিয়েছিলাম স্বর্ণ কিনে তার প্রায় সব শেষ করে ফেলেছি। পরে আমি চিন্তা করলাম, কেন আমি শুধু মালেশিয়ায় পড়ে থাকব। এ কথা ভেবে ইউরোপে ভিসার জন্য আবেদন শুরু করি আমি। যখন ইতালি আর জার্মানির জন্য করা আমার ভিসার আবেদন বাতিল হয় তখন দালালকে বললাম, অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেন আমাকে।
আবির আর আশিকের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিথুনের গল্প। মিথুনের বয়স ৪২ এবং তার বড় দুই ভাইয়ের মতো সেও বিদেশ যাওয়ার চেষ্টায় বিফল হয়েছে। সে তার বর্ণনায় বলে, আমার বয়স যখন ১৩ তখন আমার বাবা কুয়েত যান। তিনি তার পরিবারের বড় ছেলে। তার অনুপস্থিতিতে আমাকে আমাদের মিষ্টির দোকানটি চালাতে হয়েছে। আমার বয়স যখন ২০ হলো, তখন আমার আব্বু বিদেশ থেকে চলে আসেন। আমাদের ব্যবসা তখন মন্দা যাচ্ছিল আর আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিরাম। আমি সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকতাম। কীভাবে আমি বাবাকে সব হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে দেব। কেবলই চিন্তা, চিন্তা আর চিন্তা। তখন আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের পরিবারের বাকি দুই ভাই এখনো বাইরে যায়নি। ওরা বাইরে না গেলে আমাদের উন্নতি হবে না। কারণ সিলেটে দেখা যায়, প্রতি ঘরের অন্তত একজন বিদেশে থাকে। গ্রামের অন্য সবার সঙ্গে কথা বললেও মনে হতো, হয়তো এ কারণেই আমরা ভালো করতে পারছি না। যেমন চিন্তা তেমন কর্ম। কোনো রকমে ব্যবস্থা করে আমি আমার ছোট জনকে সিঙ্গাপুর পাঠালাম। ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে সে ওখানে পুলিশের হাতে পড়ল। ফলস্বরূপ, কোনো টাকা উপার্জন না করেই খালি হাতে তাকে বাড়ি ফিরে আসতে হলো। আমাদের টাকার সমস্যা তো সমাধান হলোই না, তার ওপর লোকলজ্জার ভয়ে আমরা অনেকটা বাধ্য হয়ে আমার মেজোজনকে দুবাই পাঠালাম। কিন্তু দুই বছর কাজ করেও তিনি টাকা-পয়সা কিছু জমাতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে আমি ভিসার জন্য দালাল ধরলাম।
মিথুন, আবির, আশিক এদের সবার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সবার পরিবারে উপার্জনের জন্য বিদেশ গমন ছেলেদের জন্য অত্যাবশ্যক হিসেবে বিবেচিত হয়। এদের পরিবারের ধারণা, ছেলে সন্তানদের এ দায়িত্ব পালন করতেই হয়। বিদেশযাত্রা পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের জন্য নির্ধারিত থাকেই। পুরুষরা বিয়ে করা আর বিয়ের পর তাদের সন্তান হওয়া মানেই হলো সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গিয়েছে এবং বিদেশ গিয়ে অর্থ উপার্জন করে তারা পরিবারের দেখাশোনা করবে। এ বিষয়টি ছেলেদের মুরোদ হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ বিষয়টি ছেলেদের পুরুষোচিত আচরণের অন্তর্গত। উন্নত জীবনের জন্য জীবনের এ ঝুঁকি নিতে ছেলেরা বাধ্য। এমনকি বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে পাড়াপড়শিদের মাঝে নিজের পরিবারের সম্মান বাঁচাতেও বিদেশে যাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। অন্যে কী বলবে? কিংবা লোকের মাঝখানে কীভাবে মুখ দেখাব? এসব চিন্তা দ্বারা তাড়িত হয়েই গ্রামের লোকে বিদেশ যেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এভাবেই ইউরোপে বা মধ্যপ্রাচ্যে যেতে ব্যর্থ হয়ে তারা অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমায়।
বাঙালিদের আফ্রিকায় যাত্রা কিন্তু অত সোজাও নয়। যাদেরই এ অভিজ্ঞতা হয়েছে তারা সবাই এমন যাত্রাকে ভয়ংকর ও অনিশ্চিত যাত্রা হিসেবে অভিহিত করেছেন। অনেকে এ যাত্রাকে পুরুষত্বের পরীক্ষাও বলেছেন। মানব পাচারকারী, পুলিশ, বর্ডার সিকিউরিটি সবার সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল কষ্টের।
আবদুল নামে ২৯ বছর বয়সের এক ছেলে এমন ঘটনার শিকার হয়ে মানসিকভাবে মারাত্মক আহত হয়েছেন। যদিও শুরুতে তিনি তার অভিজ্ঞতা বলতে চাচ্ছিলেন না, অভয় দিলে পরে তিনি তার অভিযাত্রার গল্প না বলে পারলেন না। আবদুলের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এ যাত্রাপথে অনেক ট্রানজিট পয়েন্ট সম্পর্কে জানতে পারি। অবশ্য তিনি তার বর্ণনায় এ যাত্রাকে মিথ্যার দিকে অভিযাত্রা নাম দিয়েছেন। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারত হয়ে কেনিয়ার নাইরোবি, মোজাম্বিকের মাপুটো দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জনমানবহীন প্রান্তরে তিনি যাত্রা করেছেন।
দালালদের নানা অত্যাচার, তাদের একের পর এক মিথ্যা কথার ভেতর দিয়ে এ অনিশ্চিত যাত্রার নানা স্তর উন্মোচিত হয়েছে। তার জবানিতে কিছু কড়া সত্যও উদ্ঘাটিত হয়েছে—বাংলাদেশী এক দালালকে আমি ৮ দশমিক ৫ লাখ টাকার মতো দিয়ে বলেছিলাম, আমাকে আফ্রিকা যাওয়ার সরাসরি ফ্লাইট দেবেন। তখন তো বুঝিনি আসলে। তখন তো মিথ্যা যাত্রার সবে শুরু হয়েছে। ভারতের এক স্থানে আমার যাত্রাবিরতি হয়। জায়গাটার নাম কী কেউ বলল না। ওখানে আমার ১৩ ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। যেমন ক্ষুধার্ত ছিলাম, তেমন দিকভ্রান্তও ছিলাম। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি কিছু ঝামেলায় জড়িয়ে যাই। যা হোক, আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলাম, কেনিয়ায় আমি আমার চাচার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। নাইরোবি আমি কোনো রকমে পার হয়ে যাই। সেখান থেকে মাপুটো গেলে আমাকে এক পাকিস্তানি রিসিভ করে। তাকে আমার ১০০০ ডলার দিতে হয়। এখান থেকে আফ্রিকার এক কাইলা (কৃষ্ণাঙ্গ) আমাদের সঙ্গে দেখা করে আমাদের প্রায় ২১ জনকে তার নিজের বাসায় নিয়ে যায়। এদের মধ্যে ১৬ জন বাঙালি আর পাঁচ জন পাকিস্তানি ছিল। কোনো খাবার বা পানীয় ছিল না কালিয়ার বাড়িতে। আমরা যদি পানি চাইতাম সে বলত, মেয়েদের মতো কাঁদবি না। শালা সমকামী। কাইলার কাছে আমাদের কোনো দাম ছিল না। আমাদের ২১ জনকে গাদাগাদি করে সে একটা মোটরগাড়ির পেছনের সিটে ঢোকাল। আমাদের প্রত্যেকের শরীরকে সে একটার ওপর আরেকটা গাদা করল। পেছনের সিটে যেখানে তিনজনের বসার কথা, সেখানে ২১ জনকে কাইলাটা গাদাগাদি করে ঢুকিয়েছে। ২ ঘণ্টা এভাবে চলার পর আমাদের মধ্যে দুই পাকিস্তানির শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। সামনে বসা কাইলাকে অনুরোধ করলাম, একটু হলেও যেন সে আমাদের ওপর রহম করে। সে আমাদের মাথায় থাপ্পড় মেরে আমাদের মানজি মানজি বলতে লাগল।
আবদুলের এ অভিজ্ঞতা নাকি দক্ষিণ আফ্রিকায় যারা যায় তাদের সবার। এ ভ্রমণে পাওয়া দুঃসহনীয় মানসিক যন্ত্রণার পাশাপাশি দালালদের নির্বিকার আচরণ ও নিষ্ঠুরতার কথাও তিনি বলেছেন। দালালদের অত্যাচারের মাত্রা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, একে তিনি যৌন হয়রানির সমতুল্য বলে উল্লেখ করে বলেন—নতুন উড়ে এসে জুড়ে বসা এই কালিয়ারা মাথাপিছু ২০ ডলার দিতে বলল। কিন্তু আমাদের কাছে তখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সব হাতাতে শুরু করল তারা। পুলিশরাও আমাদের সঙ্গে এমন করত না। আমাদের পুরোপুরি উলঙ্গ করে সঙ্গে থাকা ঘড়ি, মোবাইল, জ্যাকেট, জুতা সব তারা খুলে ফেলল। আমরা পুরোপুরি বস্ত্রহীন এই আনন্দে তারা হাসতে শুরু করল। বর্ডার পার করিয়ে দেয়ার অজুহাতে তারা একটা অপরিচিত শহরে নিয়ে আমাদের ছেড়ে দিল। এখানে এসে আমরা আরেক দল বর্ডার-ক্রসারের পাল্লায় পড়লাম। পরনের একটা সুতা পর্যন্ত তারা আমাদের কাছ থেকে খুলে রাখল। এভাবে আমরা যেন একরে পর এক ধর্ষণের শিকার হতে লাগলাম।
এ যাত্রায় যেভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে আবদুলের মনমানসিকতায় তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে। সে তার বর্ণনায় কৃষ্ণাঙ্গদের জবরদস্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। কালিয়াদের শারীরিক গঠন এমন যে তারা বাংলাদেশী লোকেদের মেয়েলি স্বভাবের বলে কথায় কথায় খোঁচা দিত। বন্দিকারীর অতিপুরুষত্বের সামনে বন্দিকে নপুংশক হিসেবে উপস্থাপন করা আমাদের চমকে দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলতে হয়, অভিযাত্রার সময়ে কালিয়ারা বন্দিদের উদ্দেশ করে বিভিন্ন বর্ণবাদী গালি ব্যবহার করে। তারা অভিযাত্রীদের মানজি, মেসংগে, শোগা প্রভৃতি গালি দিত। এগুলো মূলত সোয়াহেলি ভাষায় সমকামী বা নপুংশক লোকেদের জন্য ব্যবহূত শব্দ। বন্দিকারী কর্তৃক বন্দিদের উদ্দেশ করে এমন শব্দ ব্যবহার প্রবাসীদের অপমান করার শামিল। এ ধরনের শব্দ তারা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার লোকদের জন্যই ব্যবহার করত। আবদুলের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিবাসে গমনরত দলটির মধ্যে ভারতীয়, বাংলাদেশী, পাকিস্তানি প্রভৃতি বিভিন্ন জাতির লোক ছিল। অল্প কিছু আফ্রিকার লোকও ছিল। আফ্রিকার এসব কৃষ্ণাঙ্গ দালালের পুরুষত্ব প্রদর্শন আবদুলের জন্য ছিল অভাবিত। তার কথায়, একের পর এক কালিয়া আমাদের বর্ডার পার করিয়ে দিচ্ছিল। এমন মানুষ আমি এর আগে কখনো দেখিনি। যেকোনো মানুষের তুলনায় এরা বড়ই শক্তিশালী। সবাইকে তাদের কথা শুনতে হতো। তাদের গায়ের গন্ধও ছিল দুঃসহ।
আবদুলের স্মৃতিতে যতখানি মনে আছে সে মতে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ দালালরা শারীরিক অপদস্থতার সঙ্গে বিভিন্ন হোমোফোবিক বিদ্রূপবাক্য ব্যবহার করত। এভাবে তারা বন্দিদের সামনে নিজেদের শারীরিক বল দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করত। আবিরের স্মৃতিতে এক কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকি ট্র্যাফিকারের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা উঠে আসে যার নির্মম ব্যবহারের কথা সে আর কখনোই ভুলতে পারেনি। তার বর্ণনা মোতাবেক, কালুয়া মানেই তো ভিন্ন কিছু। মুভিতে যেমন দেখা যায় তারা আসলে তেমনই। বাকি লোকরা মানে দক্ষিণ এশিয়ার লোকরা আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে কারণ তারা এমনিতেই দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু কালুয়ারা এমনই। তারা তৈরি হয়েছেও এজন্য। আমার যতখানি মনে আছে লোকটা ছিল অতিকায়। রাস্তায় হাঁটার সময় তাকে গাছ মনে হয়। মাঝরাতে আমরা পাহাড়ে-পর্বতে ছিলাম। সামনে দেখেছি বর্ডার পুলিশ বন্দুক নিয়ে জিম্বাবুয়ের সীমানা পাহারা দিচ্ছে। দেখলেই গুলি করে সঙ্গে সঙ্গে তারা আমাদের মেরে ফেলত। কালুয়া আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পথ দেখিযে দিচ্ছে। সে যেন দালাল নয়। যেন সত্যিকার বর্ডার ক্রসার। দেখলেই বোঝা যায়, জঙ্গলের জন্যই তৈরি সে। পাহাড়ের চড়াই-উত্রাই দেখিয়ে সে আমাদের সামনে এগিয়ে নিচ্ছিল। একটু পরপর সামনে কিছু কাটা গাছ পড়ছিল যেগুলো আমাদের জ্যাকেট ও জুতায় গর্ত করছিল। সিংহ, হরিণ, মহিষের খুলি দেখেছি কিছু কিছু জায়গায়। আশপাশে সিংহ আছে জেনে আমরা তো ভয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাঁধে একটা বন্দুক নিয়ে কালুয়া আমাদের পথ দেখিয়েছে। সে আমাদের সতর্ক করে বলেছে, শব্দ করলে সে আমাদের গুলি করবে। কিন্তু একটা জানোয়ারের দেখা পেলেই সে তত্ক্ষণাৎ গুলি করতে পারত। নাম-না-জানা একটা নদীর কূলে পৌঁছলাম আমরা। যার পানি ছিল হাঁটু পর্যন্ত। আমাদের বিদ্রূপ করতে করতে কালো লোকটি বলল, তোদের দেশের অনেককেই এ নদীর কুমিরে খেয়ে ফেলেছে। যখন সে এটা বলছিল তখন সে হাসছিল। তার ইয়া বড় মাথা, সঙ্গে হাসি। ভাবলে এখনো আমার দুঃস্বপ্ন মনে হয়।
মিথুন, আবির, আশিক, আবদুলের বর্ণনায় বর্ডার-ক্রসার বা ট্রাফিকাররা যেন একেকটা ভিলেন। তারা এদের অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রত্যেকের বর্ণনায় পুরুষত্বের আপেক্ষিক একটা ধারণা তৈরি হয় যার থেকে বন্দিকারী-বন্দি সম্পর্কের ভিন্ন রকমের এক নিদর্শন চোখে পড়ে। একদিকে, বাঙালিদের চোখে আফ্রিকি ট্রাফিকাররা কালিয়া, আদিম, বর্বর বলে উল্লেখিত হয়েছে। অন্যদিকে পুরো অভিযাত্রার সময়ে কালিয়ারা বিরামহীন কমান্ডার হিসেবে আবির্ভূত হয়। তখন তাদের কৃষ্ণ পুরুষত্ব হয়ে ওঠে পুরুষত্বের মাপকাঠি।
সাইফুল ইসলাম: লেখক





