কাজের সন্ধানে যাওয়া শ্রমিকদের জিম্মি করে নির্যাতন ও পণ আদায় যেন  লিবিয়ার নিত্যদিনের ঘটনা। দাবি অনুযায়ী পণ না পেয়ে শ্রমিক হত্যার ঘটনাও অহরহ। ইতিহাস বলে ১৯৫০ সালে সর্বপ্রথম খনিজ তেলের সন্ধান মেলে আরব বিশ্বের বৃহৎ এ দেশটিতে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যতম প্রভাবশালী প্রভাবকও হয়ে ওঠে দেশটি। তবে এখন এসব কিছুই লিবিয়াবাসীর কাছে স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশটির বড় সংকট তৈরি করেছে কর্মসংস্থানের ঘাটতি। বেকারত্ব ঘুচাতে লিবিয়ার কিশোর ও তরুণরা যাচ্ছে মিলিশিয়া গোষ্ঠীতে, হাতে তুলে নিচ্ছে খাতা-কলমের পরিবর্তে সমরাস্ত্র। মানসিক বিকাশ হচ্ছে নৃশংস পরিবেশে। সব মিলে খনিজ তেলের ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠা লিবিয়া যেন এখন অপহরণ আর সর্বনাশের রাষ্ট্র।

ভালো উপার্জনের আশায় ২০২০ সালে লিবিয়া যান কিশোরগঞ্জের ভৌরব উপজেলার ইসারউদ্দিন। সেখানে যাওয়ার মাসখানেক পর তার স্ত্রী সুমির ইমুতে ২৫ সেকেন্ডের একটি ভয়েজ রেকর্ড আসে। সেখানে প্রচণ্ড মারধর আর চিত্কারের শব্দ। এর ৪৮ ঘণ্টা পর একই প্রক্রিয়ায় আসে আরেকটি ভয়েজ রেকর্ড। দ্বিতীয় রেকর্ডটিতে সুমি তার স্বামীর গলা নিশ্চিত হন। ওই রেকর্ডটিজুড়ে আর্তনাদ। শোনা যায়, ‘আমার হাত ও পা ভেঙে ফেলেছে আমি মরে যাচ্ছি তুমি টাকা দিলা না। তোমারে না কইছি দুলাভাইকে বলো, তাড়াতাড়ি ১০ লাখ টাকা দিতে। এরা মানুষ মেরে ফেলছে।’ গত মে মাসের ১৩-১৬ তারিখের মধ্যে বাঁচার আকুতি জানিয়ে মোট ১১টি ভয়েজ রেকর্ড পাঠানো হয় স্ত্রী সুমির ফোনে। এ ঘটনায় রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন সুমির দুলাভাই মোহাম্মদ আলী। এ ঘটনায় একই গ্রামের সুজন নামের এক যুবককে গ্রেফতারও করে পুলিশ।

গ্রেফতার সুজন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জানান, চার ভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার বড়। তার ছোট ভাই সজীব লিবিয়ায় থাকে। তার মাধ্যমে ভৈরবের জগন্নাথপুরের সজল, লক্ষ্মীপুর গ্রামের বিজয় এবং নুর আলীপুরের ইছার উদ্দিন লিবিয়ায় গিয়েছেন। এদের মধ্যে বিজয় ও ইছার উদ্দিন নিখোঁজ আছেন। সজল ওই হামলায় আহত হয়েছেন। পাচারকারী চক্রের সদস্য জাফরের মাধ্যমে সজীব এ তিনজনকে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। এর আগেও জাফরের মাধ্যমে অনেক লোক পাঠানো হয়েছে। লিবিয়া শ্রমিকদের জিম্মি করে পণ আদায়ের জন্য ১০-১৫ জন সদস্যের ছোট ছোট গ্রুপ রয়েছে। মানব পাচার সিন্ডিকেটের সদস্যরা দুবাই, আম্মান এবং লিবিয়া হয়ে ইতালিতে অবৈধভাবে লোক পাঠায়। বিদেশে লোক নেয়ার পর তাদের জিম্মি করে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের পর তাদের কাছ থেকে ৫-১০ লাখ করে টাকা আদায় করা হয়। এসব টাকার ভাগ দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানরত মুক্তিপণ আদায়কারীদের কাছে পৌঁছে যায়। দাবি অনুযায়ী পণ না মেলে হত্যা করা হয় ওইসব শ্রমিককে।

তদন্তে গিয়ে পুলিশ জানায়, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা দুবাইয়ে যাওয়ার পর অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা তাদের রিসিভ করেন। এ সময় তাদের (অভিবাসনপ্রত্যাশী) নীল গেঞ্জি (টি-শার্ট) পরিয়ে দেয়া হয়। নীল টি-শার্ট পরা থাকলেই চক্রের সদস্যরা বুঝতে পারে এরা তার লোক। সেখান থেকে তাদের জর্ডানের রাজধানী আম্মানে পাঠানো হয়। এরপর টিয়া কালারের গেঞ্জি পরিয়ে জর্ডানের নাগরিকের হাতে তুলে দেয়া হয়। সেখান থেকে তাদের নেয়া হয় লিবিয়া। সেখানে যাওয়ার পর পরানো হয় সাদা-কালো গেঞ্জি। লিবায়ার এয়ারপোর্টে আগে থেকেই চক্রের সদস্যরা সেখানে অবস্থান করে। সাদা-কালো গেঞ্জি দেখলেই তারা বুঝতে পারে এ ব্যক্তিরা তাদের মক্কেল। পরে তাদের লিবিয়া থেকে নৌকা বা স্পিড বোর্ডে মাল্টা হয়ে অবৈধভাবে ইতালি পাঠানো হয়। কিন্তু এর আগেই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে আদায় করা হয় পণ।

শুধু ইসারউদ্দিনই নন, প্রতিনিয়তই লিবিয়ায় জিম্মি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কাজের সন্ধানে যাওয়া শ্রমিকরা। ২০২০ সালের ২৮ মে লিবিয়ায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশীকে হত্যা করে স্থানীয় মানবপাচারকারীরা। এ সময় জখম হন আরো ১১ বাংলাদেশী। অবৈধভাবে ২০১৮-১৯ সালের মধ্যে এসব বাংলাদেশীকে বাড়তি আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়া পাঠানো হয়। পরে তাদের ইউরোপে নেয়ার কথা থাকলেও তার আগেই জিম্মি করে চালানো হয় নির্যাতন। সেসব দৃশ্য কখনো রেকর্ড করে, কখনো ভিডিও ধারণ করে পাঠানো হয়েছে স্বজনের কাছে। আদায় করা হয়েছে মুক্তিপণের অর্থ। 

লিবিয়া শ্রমিকদের জিম্মি করে পণ আদায় এবং হত্যার ঘটনায় পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদের কঠোর নির্দেশে তাত্ক্ষণিক র্যাব, ডিএমপি, সিআইডি, পিবিআইসহ বাংলাদেশ পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সব ইউনিট একযোগে দেশজুড়ে অভিযান শুরু করে। জরুরি ভিডিও কনফারেন্সে আইজিপি বলেন, যেভাবে আমাদের দেশের মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমাদের দেশের মানুষকে এভাবে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে, সে অবস্থানে এখন বাংলাদেশ নেই। যারা আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নিয়েছে, যাদের কারণে এ হত্যাকাণ্ড, তাদের একজনকেও ছাড় দেয়া হবে না। তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করে এ চক্রের প্রত্যেক সদস্যকে আইনি প্রক্রিয়ায় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে যেনো ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশীকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে, তার জীবন নিয়ে খেলার দুঃসাহস কোনো মানুষ দেখাতে না পারে। লিবিয়ায় অবৈধভাবে মানব পাচারের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় অন্তত অর্ধশত মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মামলাগুলোর তদন্তে গিয়ে পুলিশ জানায়, অল্প টাকায় ইউরোপে পাঠানোর জন্য লিবিয়ার রুটটি ব্যবহার করে দালালচক্র। আর বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পৌঁছতে ব্যবহার করা হয় নিত্যনতুন রুট। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে কলকাতা, মুম্বাই, দুবাই, মিসর, বেনগাজী হয়ে ত্রিপলিতে অবৈধভাবে লোক পাঠানো হয়। সেখান থেকে সমুদ্রপথে শুরু হতো ইউরোপ যাত্রা। এ চক্রের দেশীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষকে অল্প খরচে উন্নত দেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। এ বিদেশ গমনেচ্ছুদের বিদেশে গমনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা সংগ্রহ, টিকিট ক্রয় ইত্যাদি কাজ এ সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে তাদের এককালীন বা ধাপে ধাপে কিস্তি নির্ধারণ করে ইউরোপের পথে পাড়ি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রার্থীদের সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপ নির্বাচন করে থাকে। ইউরোপ যাওয়ার ক্ষেত্রে তারা ৭-৮ লাখ টাকা নিয়ে থাকে। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি ৩ লাখ টাকা লিবিয়ায় গিয়ে পরিশোধ করতে হয়।

বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে চক্রের সদস্যরা বেশ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে থাকে। রুটগুলো তারা সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী মাঝেমধ্যে পরিবর্তন অথবা নতুন রুট নির্ধারণ করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ-কলকাতা-মুম্বাই-দুবাই-মিসর-বেনগাজী-ত্রিপলি রুটটি ব্যবহার হয়ে আসছিল। দুবাইয়ে পৌঁছে তাদের বিদেশী এজেন্টের তত্ত্বাবধানে সপ্তাহখানেক অবস্থান করানো হয়। এ সময়ের মধ্যে ‘মারাকাপা’ নামের একটি ডকুমেন্ট বেনগাজী থেতে দুবাইতে পাঠানো হয়, যা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিদেশী এজেন্টের মাধ্যমে ভিকটিমদের হস্তান্তর করা হয়। পরে ওই ডকুমেন্টসহ বিদেশী এজেন্ট তাদের মিসর ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজী লিবিয়ায় পাঠায়। বেনগাজীতে বাংলাদেশী এজেন্ট তাদের বেনগাজী থেকে ত্রিপলি স্থানান্তর করে।

লিবিয়া থেকে স্বপ্নের ইউরোপ: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে আসে লিবিয়া থেকে স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রার নানা তথ্য। তাদের মতে, ভুক্তভোগীরা ত্রিপলিতে পৌঁছানোর পর সেখানে কয়েকজন এজেন্ট তাদের গ্রহণ করে থাকে। তাদের ত্রিপলিতে বেশ ক’দিন রাখা হয়। এ সময় এজেন্টের দেশীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে ভিকটিমের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকে। পরে ভিকটিমদের ত্রিপলি বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের কাছে অর্থের বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করা হয়। ওই সিন্ডিকেট তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে সমুদ্রপথে অতিক্রম করার জন্য নৌ-যান চালনা এবং দিক নির্ণয়যন্ত্র পরিচালনাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ের ওপর নানা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট দিনে ভোর রাতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌ-যান লিবিয়া হয়ে তিউনেশিয়া উপকূলীয় চ্যানেলের হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটে।

লিবিয়ায় মানবপাচারের ঘটনায় সম্পৃক্ত বেশ কয়েকটি ট্রাভেল অ্যাজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড ভাইস স্কোয়াডের অনুসন্ধান বলছে, ট্রাভেল অ্যাজেন্সিগুলোর মালিকসহ অন্য আসামিরা লিবিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণামূলকভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করে বিভিন্ন অংকের টাকার বিনিময়ে ভুক্তভোগীদের পাচার করেছে। কিন্তু সেখানে পাঠিয়ে তাদের কম টাকায় কঠিন শ্রমে নিয়োজিত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের হত্যা ও গুরুত্বর জখম করে মানব পাচার ও প্রতিরোধ দমন আইনে অপরাধ করেছেন।

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী শ্রমিকদের হত্যার ঘটনা তদন্তে গিয়ে সিআইডি জানায়, লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদায় তারা স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহযোগিতায় ভুক্তভোগীদের আটকে রাখে। পরে আসামিরা লিবিয়ান সহযোগীদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের নির্যাতন চালাতে থাকে এবং সেসব ছবি তাদের স্বজনের কাছে পাঠিয়ে দেশে মুক্তিপণ দাবি করতে থাকে। মুক্তিপণের টাকা নিয়ে দরকষাকষি চলার মধ্যেই লিবিয়ায় ভুক্তভোগীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে কোনো এক সুদানি ভুক্তভোগী আত্মরক্ষার্থে একজন স্থানীয় মানব পাচারকারীকে হত্যা করে। পরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়। জখম হন আরো ১১ জন।

 

নিহাল হাসনাইন: সাংবাদিক