বাইসাইকেল উদ্ভাবনের পর থেকেই এ বাহনকে আরো স্বয়ংক্রিয় ও দ্রুতগতির করার ভাবনা পেয়ে বসে মানুষকে। এক-দেড় শতক ধরে উদ্ভাবকরা এ নিয়ে নানা কসরত করেন। বিভিন্নজন বিভিন্ন ধরনের মোটরসাইকেল উদ্ভাবন করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে এটির বাণিজ্যিকীকরণের পাশাপাশি গুণে-মানেও অনেক উন্নত হয়েছে
বাইসাইকেল উদ্ভাবনের পর থেকেই এ বাহনকে আরো স্বয়ংক্রিয় ও দ্রুতগতির করার ভাবনা পেয়ে বসে মানুষকে। এক থেকে দেড় শতক ধরে উদ্ভাবকরা এ নিয়ে নানা কসরত করেন। বিভিন্ন জন বিভিন্ন ধরনের মোটরসাইকেল উদ্ভাবন করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে এটির বাণিজ্যিকীকরণের পাশাপাশি গুণে, মানেও অনেক উন্নত হয়েছে। এসব উদ্ভাবন ও বিবর্তন নিয়ে থাকছে কিছু কথা—
১৮৬৭ সালে উদ্ভাবিত হয় বাষ্পইঞ্জিনচালিত মোটরসাইকেল। ফ্রান্সে বাইসাইকেলের বিখ্যাত উদ্ভাবক পিয়েরে মিকহাক্সের কারখানায় এটি তৈরি হয়। মিকহাক্সের ছেলে আর্নেস্ট বাইসাইকেলের প্যাডেল উদ্ভাবন করেন এবং নিজস্ব ডিজাইনের বাইসাইকেলে জুড়ে দেন ছোট্ট একটি বাষ্পইঞ্জিন।
১৮৬৮ সালে আমেরিকান উদ্ভাবক সিলভেস্টর এইচ রোপার উদ্ভাবন করেন একটু ভিন্ন ধরনের মোটরসাইকেল। তিন চাকার ওই মোটরসাইকেলে যুক্ত করেন দুই সিলিন্ডারের বাষ্পইঞ্জিন। কয়লা যুক্ত করার ব্যবস্থাও করেন তিনি। ১৮৬৮ সালে নিজের উদ্ভাবিত বাষ্পচালিত একটি মোটরসাইকেলের প্রদর্শনীতে নিজেই সেটি চালিয়ে দেখানোর সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এ উদ্ভাবক।
তবে রোপারের চেয়ে কোনো অংশে কম যাননি ফ্রান্সের প্রকৌশলী লুই গুইললাম প্যারেক্স। তিনি এক সিলিন্ডারবিশিষ্ট বাষ্পচালিত মোটরসাইকেল তৈরি করেন। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন অ্যালকোহল।
আমেরিকান উদ্ভাবক লুসিয়াস কেপল্যান্ড ১৮৮১ সালে পেছনের চাকায় ছোট্ট বাষ্পইঞ্জিন যুক্ত করে তৈরি করেন নতুন এক মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেলটির নাম দেন ‘ফার্থিং-পেনি’ বাইসাইকেল। এ মোটরসাইকেল ঘণ্টায় ১২ মাইল গতিতে ছুটতে পারত।
তবে আধুনিক মোটরসাইকেল বলে আমরা যেটা চিনি, সেটি উদ্ভাবন করেন জার্মানির গটলিয়েব ডিলমলার ও উইলহেলম মেব্যাক। ১৯৮৫ সালে তারা প্রথম ডিজেল ইঞ্জিনের মোটরসাইকেল তৈরি করেন। কাঠ দিয়ে তারা বাইসাইকেলের কাঠামো নির্মাণ করে জুড়ে দেন ২৬৪ সিসির একটি ডিজেল ইঞ্জিন। এটির নাম দেয়া হয় ‘ডিমলার রিটওয়াগন’।
এটিকেই বিশ্বের প্রথম মোটরসাইকেল ধরা হয়। এ মডেল পরবর্তীতে নানাভাবে সংস্কার করা হয় এবং অনেক ধরনের ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়। বলতে গেলে আধুনিক মোটরসাইকেলের প্রটোটাইপ হিসেবে ধরা হয় ডিমলার রিটওয়াগনকে।
১৮৯৪ সালে ‘হিল্ডব্রান্ড অ্যান্ড ওলফমুলার’ মোটরসাইকেল ব্যাপক হারে সারা বিশ্বে উৎপাদন করা হয়। তবে দুঃখের বিষয়, মূল প্রতিষ্ঠান মাত্র কয়েকশ ইউনিট উৎপাদন করার সুযোগ পেয়েছিল। কারণ অসংখ্য মোটরসাইকেল নির্মাতা তাদের ডিজাইন নকল করে বাজারজাত শুরু করে। ফলে মূল কোম্পানিই বাজারে মার খেয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মোটরসাইকেল প্রবেশ করে ১৮৯৫ সালে, ফ্রান্সের একটি সার্কাস দলের মাধ্যমে। তবে ওই বছরই মার্কিন উদ্ভাবক ইজে পেনিংটন তার উদ্ভাবিত মোটরসাইকেল প্রদর্শন করেন এবং সেটাই তৎকালীন বিশ্বে সর্বোচ্চ গতির মোটরসাইকেল। যেটি ঘণ্টায় ৫৮ মাইল গতিতে ছুটতে পারত। তবে মোটরসাইকেলের পেটেন্ট নেয়ার কাজ করেন ওয়ার্নার ভ্রাতৃদ্বয়। তারা ১৯০০ সালে মোটরসাইকেলের প্রথম পেটেন্ট নেন।
১৯০১ থেকে ১৯০৩ সালের দিকে বড় বড় কারখানায় ব্যাপক হারে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইংলিশ রয়েল এনফিল্ড, ট্রায়াম্ফ, আমেরিকান হার্লি ডেভিডসন ও ইন্ডিয়ান মোটরসাইকেল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। এই সময়ই মোটরসাইকেল রেসিং আয়োজন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এ প্রতিযোগিতা আয়োজনের কারণে আরো দ্রুতগতির শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের মোটরসাইকেলের চাহিদা তৈরি হয়।
১৯২৮ সালে মোটরসাইকেল নির্মাণের বাজারে আমেরিকান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, ইন্ডিয়ান ও হার্লি ডেভিডসনের মতো প্রতিষ্ঠানকে ছাড়িয়ে শীর্ষে ওঠে যায় জার্মানির ডিকেডব্লিউ। অন্যদিকে ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত ৩০টি মডেলের মোটরসাইকেল ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালে আমেরিকার যুদ্ধফেরত সৈন্যরা নিজেদেরকে একত্র করতে মোটরসাইকেল ক্লাব গড়ে তোলেন। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া মার্লোন ব্রান্ডোর দ্য ওয়াইল্ড ওয়ান চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাদের চিত্রায়ণ করা হয়েছে।
১৯৫৯ সালে জার্মানির এনএসইউকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে জাপানের হোন্ডা। ষাটের দশকে সুজুকি, কাওয়াসাকি ও ইয়ামাহার মতো জাপানি মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুতই ব্রিটিশ মোটরসাইকেলের কর্তৃত্ব ম্লান করে দেয়। পরে আমেরিকান ও ইতালির বেশকিছু মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাজার সম্প্রসারণ শুরু করলে ১৯৯০ সালের দিকে জাপান এ খাতে শ্রেষ্ঠত্ব হারায়। বর্তমানে জাপানের পাশাপাশি বিশ্বে আরো বেশকিছু মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিশাল অংশ দখল করে আছে। এর মধ্যে বিএমডব্লিউ, ডুকাটি, ভিক্টরি ও হার্লি-ডেভিডসন উল্লেখযোগ্য।
সূত্র: বাইসাইকেল হিস্ট্রি ডটনেট






