বাংলাদেশে পোলট্রি শিল্পের গোড়াপত্তনটিও হয়েছে গ্রামবাংলায়—অনাদিকালের এক প্রাচীন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। যাদের বাড়ি গ্রামে, কিংবা নিদেনপক্ষে মফস্বল এলাকায় যারা বেড়ে উঠেছেন, তাদের অনেকের কিংবা অধিকাংশের বাড়িতে দু-পাঁচটা হাঁস-মুরগি না থাকার কথা নয়। সকালের নাশতায় একটা ডিমের চার-পাঁচ ভাগের একটা অংশ মাঝেমধ্যেই পাওয়া যেতে পারে ঘরে পালা হাঁস-মুরগির কল্যাণে। বাড়িতে জামাই এলে জামাই আদরটাও সারা হতো এখান থেকেই। সময়ের বিবর্তনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ প্রভৃতি কারণে প্রাচীন সেই সদভ্যাসটা অনেকেই আর ধরে রাখতে পারেনি। তবে সেই চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক খামার।

বাণিজ্যিক পোলট্রি শিল্পের শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। সাধারণ মানুষ পোলট্রি ডিম কিংবা ব্রয়লার মুরগির মাংস খেতেই চাইত না। পোলট্রির মাংস যে কতটা সুস্বাদু, নরম ও স্বাস্থ্যসম্মত তা বোঝাতে শুরুর দিকের উদ্যোক্তাদের অতিথি ডেকে এনে রান্না করা মাংস পরিবেশনও করতে হয়েছে। আশির দশকে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা। আর বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পোলট্রি উদ্যোক্তা ও খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই এ অসাধ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মুরগির ডিম, মাংস, একদিন বয়সী বাচ্চা এবং ফিডের শতভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের তুলনায় কম মূল্যে ডিম ও মুরগির মাংস সরবরাহ করছে। একসময়ের আমদানিনির্ভর খাতটি দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে শিগগিরই রফতানি শুরু করতে যাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পের পর সবচেয়ে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে পোলট্রি শিল্প। গ্রামীণ অর্থনীতিতে, নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে পোলট্রি শিল্প।

মাত্র তিন যুগের ব্যবধানে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর খাতটি এখন অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল। সাধারণ গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জন্য কম দামে প্রাণিজ আমিষের জোগান দিচ্ছে এ শিল্প। শিশুর দৈহিক গঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির জোগান, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, সমুচা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার—যা কিছুকাল আগেও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। জমিতে কৃষিপণ্য আবাদের ওপরই নির্ভরশীল ছিল গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সে অবস্থার এখন পরিবর্তন এসেছে। গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান, আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ফার্মিং (জমি চাষাবাদ) অবদান কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে। কর্মসংস্থান ও আয়ের নানামুখী উত্স থাকলেও গ্রামীণ পরিবারের আয়ের অন্যতম উেস পরিণত হয়েছে পোলট্রি খাত।

একটা বিষয় খেয়াল করলে বোঝা যাবে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে শুরু করে যাবতীয় পণ্যসামগ্রীর কারখানা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে রয়েছে। কিন্তু পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন, ব্রয়লার মুরগি কিংবা ডিম পাড়া লেয়ার মুরগির খামার কী কখনো শহর এলাকায় আপনার চোখে পড়েছে? সম্ভবত না। কারণ এ শিল্পটি মূলত গড়ে উঠেছে গ্রাম এলাকায়। শহরের গণ্ডি পেরিয়ে একটু গ্রামের দিকে পা বাড়ালেই চোখে পড়বে বাণিজ্যিক পোলট্রি খামার, এমনকি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশাল আকারের ফিড মিল থেকে শুরু করে ব্রিডার ফার্ম, অটোমেটেড পোলট্রি হাউজ এবং পোলট্রি প্রসেসিং প্লান্ট! একসময় শহরমুখী মানুষের স্রোত থামাতে যেখানে নীতিনির্ধারকদের নতুন নতুন পরিকল্পনা, বিকেন্দ্রীকরণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে। সরকারের সে প্রচেষ্টা সহজ করে দিয়েছে পোলট্রি শিল্প। 

আমাদের দেশে বিমানের যাত্রীদের জন্য উন্নতমানের খাবার সরবরাহ করার লক্ষ্যে ইউরোপ থেকে উন্নতজাতের মুরগি আমদানি করে তা লালন-পালনের লক্ষ্যে স্বাধীনতার পরপরই ‘বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হয়। বাণিজ্যিকভাবে পোলট্রি খামারের অগ্রযাত্রা নতুন মাত্রা পায় আশির দশকে। নব্বইয়ের দশকে এ খাতে গতি সঞ্চার হয়। আর বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক নির্ধারিত বছরে ন্যূনতম ১০৪টি ডিমের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে আমাদের মাথাপিছু মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ মাত্র কয়েকশ গ্রাম থেকে আজ সাড়ে ছয় কেজিতে উন্নীত হয়েছে। আগে যেখানে বিদেশ থেকে ডিম, মুরগি, একদিন বয়সী বাচ্চা, ফিড আমদানি করতে হতো এখন সেগুলো দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করবেন না যে বিদেশ থেকে ফিড তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করার পরও আমরা পোলট্রি এবং ফিশ ফিড রফতানি শুরু করেছি। তাছাড়া একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার রফতানিও শুরু হতে যাচ্ছে অচিরেই। ২০২৫ সালের মধ্যে মুরগির মাংস রফতানির জন্যও প্রস্তুত হচ্ছে দেশীয় পোলট্রি শিল্প।

আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ অধিকসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুরুষের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা নারীর ক্ষমতায়নের এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মূলত পোলট্রি খাত এগিয়ে আসতে পারে। কাঙ্ক্ষিত এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে পোলট্রি শিল্পকে আরো অধিক গুরুত্ব দিতে হবে এবং এ শিল্পের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুরো দূর করতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পোলট্রি শিল্প কতটা অবদান রাখছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এমনকি সরকারের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। অর্থমন্ত্রীর জাতীয় বাজেট ঘোষণা থেকে শুরু করে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে পোলট্রি শিল্প।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক লাখের বেশি পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে উঠেছে ২০৬টি নিবন্ধিত প্যারেন্টস্টক ফার্ম বা হ্যাচারি, ১৬টি গ্র্যান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম গড়ে উঠেছে এবং ৮৫টি ফিড মিল। প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রয়লার বাচ্চা ও প্রায় ১৪ লাখ লেয়ার বাচ্চা উৎপাদিত হয়। দেশে প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে চার কোটি পিস। পোলট্রি মাংস উৎপাদন হচ্ছে দিনে প্রায় তিন হাজার টন। 

পোলট্রি বা মুরগির ৬০-৭০ শতাংশই খরচ হয় ফিড বা খাদ্য বাবদ। আবার সে খাদ্য তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ৫৫-৬০ শতাংশই ভুট্টার ব্যবহার। ফলে দেশে এখন ব্যাপক হারে বিশেষ করে চরাঞ্চলে ভুট্টার আবাদ বাড়ছে, যে কারণে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে ভুট্টা। একমাত্র পোলট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করেই ভুট্টার উৎপাদন বাড়ছে, যা গ্রামীণ কৃষকদের সচ্ছলতা আনয়নে সহায়তা করছে। কারণ ভুট্টার আবাদ করে তারা ভালো দাম পাচ্ছেন। এক ছটাক ভুট্টাও অবিক্রীত থাকে না। প্রতিনিয়ত মিলগুলো সঠিক ও ন্যায্যমূল্যে ভুট্টা কিনে নেয়। ফলে ভুট্টা আবাদকারী জেলাগুলোর কৃষক সব সময়ই স্বস্তিতে থাকেন অথচ একসময় এ ভুট্টার প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানি করতে হতো।

এছাড়া এ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, ভ্যাকসিন, যন্ত্রপাতির প্যাকেজিং ব্যবসায়ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। বাড়ছে সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণও। পোলট্রি শিল্প সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। যার ৪০ শতাংশই নারী। বর্তমানে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। অনেকের হয়তো বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে যে পোলট্রি শিল্পের উদ্যোক্তাদের মাঝে শুধু উচ্চশিক্ষিতই নয়, বরং পৃথিবীখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটও রয়েছেন। গ্রামেগঞ্জে গেলে দেখা যাবে অসংখ্য শিক্ষিত যুবক আত্মনির্ভরশীল হতে পোলট্রিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ যেন নতুন এক বাংলাদেশ, যার কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালেই বলে গিয়েছিলেন। গুরুত্বের তালিকায় উল্লেখ করেছিলেন পাট, মাছ ও প্রাণিসম্পদ খাতের কথা।

বর্তমানে গ্রামীণ পরিবারের আয়ের অন্যতম উত্স এখন পোলট্রি উৎপাদন। স্বল্প জায়গার মধ্যে থেকেই তারা আয় করছেন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৫ শতাংশ পরিবার পোলট্রি খাতের মাধ্যমে আয়-উপার্জন করত। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা উন্নীত হয় ৪৯ শতাংশে। দুই বছরের ব্যবধানে পরিবারের আয়ের পোলট্রি নির্ভরতা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। পোলট্রি শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন আগামী অন্তত ১০ বছর যদি সরকারের এ পৃষ্ঠপোষকতা বজায় থাকে তবে ডিম-মাংসে আমরা শুধু যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব তাই নয়, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করতে সক্ষম হব। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) এক পূর্বাভাসে যেমনটি বলা হয়েছে যে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অধিক নির্ভরশীলতা আগামীতে আমাদের আশাহত করতে পারে। তাই কৃষিভিত্তিক শিল্পের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। 

সরকারি হিসাবমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ বছরে ডিম খায় মাত্র ১০৪টি, এশিয়ার দেশ জাপানের মানুষ খায় বছরে গড়ে প্রায় ৩২০টি ডিম অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ। উন্নত বিশ্বের মানুষ বছরে মুরগির মাংস খায় প্রায় ৪০-৪৫ কেজি। আর সেখানে বাংলাদেশের মানুষ খাচ্ছে বছরে গড়ে মাত্র ৬.৫ কেজি। অর্থাৎ আরো প্রায় ছয় থেকে সাত গুণ মুরগির মাংস খাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং এফএওর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষকে বছরে অন্তত ৪৩ দশমিক ৮০ কেজি প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করে প্রায় অর্ধেক প্রোটিন। অবশ্য এর পাশাপাশি এ কথাটিও সত্য যে আগের তুলনায় ডিম ও মুরগির মাংসের কনজাম্পশন বর্তমানে অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে-২০১৬ (এইচআইইএস) অনুযায়ী ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে গরুর মাংসের ইনটেক সামান্য বেড়েছে, কমেছে খাসির মাংসের ইনটেক। আর সেখানে মুরগির ডিম ও মাংসের ইনটেক বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এটা নিঃসন্দেহে অনেক বড় একটি অর্জন। এইচআইইএস অনুযায়ী, ২০১০ সালে মাথাপিছু ডিমের দৈনিক কনজাম্পশন ছিল ৭.২০ গ্রাম, ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৩.৫৮ গ্রাম হয়েছে। ২০০৫ সালে এ পরিমাণ ছিল ৫.১৫ গ্রাম এবং ২০০০ সালে ৫.২৭ গ্রাম। অন্যদিকে ২০১০ সালে মুরগির মাংসের মাথাপিছু দৈনিক কনজাম্পশন যেখানে ছিল মাত্র ১১.২২ গ্রাম ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৭.৩৩ গ্রাম। ২০০৫ সালে মাথাপিছু মুরগি ও হাঁসের মাংসের দৈনিক কনজাম্পশন ছিল মাত্র ৬.৮৫ গ্রাম এবং ২০০০ সালে ছিল মাত্র ৪.৫০ গ্রাম।     

আমাদের দেশে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতির, কম ওজনের এবং ক্ষীণকায় শিশুর সংখ্যা কীভাবে কমানো যায়, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ সংখ্যাও কমে আসছে। এক্ষেত্রে বড় অবদান রাখছে পোলট্রি শিল্প। এ কারণেই অনেক সময় বলা হয়ে থাকে ‘পোলট্রি হচ্ছে প্রোটিন ফর পুওর’ অর্থাৎ গরিব মানুষের মোক্ষম আমিষ হচ্ছে পোলট্রি। এটি এজন্য বলা হয় যে গ্রাম থেকে শহরে সর্বত্রই অনায়াসে পাওয়া যায় পোলট্রি মুরগি ও ডিম এবং এটি দামে অত্যন্ত সাশ্রয়ী। একজন স্বল্প আয়ের মানুষ ৮-১০ টাকায় একটি ডিম কিনতে পারে। দরিদ্র পরিবারে দুটি ডিম দিয়ে চারজনের এক বেলার তরকারি হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে এত কম খরচে অন্য কোনো প্রাণিজ আমিষের কথা কল্পনাও করা যায় না।

দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য দূরীকরণে পোলট্রি অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে, দারিদ্র্য দূর করার ক্ষেত্রে পোলট্রি বেশ কার্যকর। মাইক্রোসফটের জনক বিল গেটস বলেছেন,  কম্পিউটার প্রযুক্তি দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। দারিদ্র্য দূর করতে হলে দরকার পোলট্রি। বাংলাদেশ সরকারের পিআরএসপিতেও (পোভার্টি রিডাকশন স্ট্র্যাটেজি পেপার) দারিদ্র্য বিমোচনে পোলট্রি খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ভিশন-২০২১ কিংবা জাতিসংঘের এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য দূর করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, নারীকে আত্মনির্ভরশীল করার ক্ষেত্রে পোলট্রি এবং প্রাণিসম্পদ খাতের গুরুত্বকে স্বীকার করা হয়েছে। Strategic Agricultural Sector and Food Security Diagnostic for Bangladesh শীর্ষক DFID -এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Bangladesh still faces food security challenges despite transformation from a chronic food shortage to food self-sufficiency. প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, A 1% increase in income of agriculture GDP per worker would reduce poverty by 0.39%, which is 0.11% in case of non-agriculture GDP per worker contribution. কাজেই দেখা যাচ্ছে অকৃষি খাতের চেয়ে কৃষিভিত্তিক খাতের মাধ্যমে অধিক হারে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। পোলট্রি বৃহত্তর অর্থে কৃষির একটি অংশ। এ খাতে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, আগামীতে আরো হবে। 

কৃষির গুরুত্ব যে আসলেই কতখানি তা ‘কভিড-১৯’ মহামারী আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীজুড়েই সব ফ্যান্সি প্রডাক্টের চাহিদা রাতারাতি কমে গেছে। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে খাদ্য উপকরণ সংগ্রহের দিকে। খাদ্য ও পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা এ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ভিটামিন সি, শাকসবজি, ডিম, দুধ, মাংস ইত্যাদি পুষ্টিমানসমৃদ্ধ খাদ্যের কথা একবাক্যে ঘোষণা করছেন। মনে রাখা প্রয়োজন জীবাণুর সংক্রমণ এখনো চলছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ড ওয়েভের আশঙ্কায় কাঁপছে বিশ্ব। সামনে নতুন নতুন জীবাণুর সংক্রমণ হয়তো আরো বাড়বে। তখন সবার আগে ভ্যাকসিন নয় বরং পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজনই সবচেয়ে বেশি দরকার হয়ে পড়বে। কভিড-১৯ মহামারীর কারণে প্রচুর মানুষ চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে গেছে। বিদেশে কর্মরত অসংখ্য মানুষ দেশে ফিরে এসেছে। কী করবে তারা? অনেকেই মুরগি, গরু, মাছের খামার করার কথা ভাবছে।

যে খাতটিকে ঘিরে কর্মসংস্থান, যে খাতটি পুষ্টিনিরাপত্তায় রাখছে ভূমিকা, খামারিদের উদ্যোক্তা তৈরিতে রাখছে ভূমিকা, সে খাতটিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দূর করতে না পারলে জাতীয় অর্থনীতি টেকসই রাখাটা দুরূহ হবে। আর ২০৪১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার যে স্বপ্ন রয়েছে, তা অনেকটাই ফিকে হয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে ভুল তথ্য, গুজবনির্ভর সমালোচনার মাধ্যমে ভোক্তাদের মধ্যে একধরনের ভীতি তৈরি করা হচ্ছে। সেটি প্রতিরোধে যেমন পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি এ খাতটি আরো সম্প্রসারণে যে ধরনের বাজেটারি সুবিধা প্রয়োজন সেটি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে যে ধরনের কর ও শুল্ক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে তা যদি অন্তত ১০ বছর অব্যাহত রাখা না যায় তবে পোলট্রি শিল্পের ভিত মজবুত করে রফতানির যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা তা বাস্তবে রূপ দেয়া বেশ কঠিন হয়ে যাবে। তাই একমুখী পদক্ষেপ নয়, বরং সামগ্রিক পদক্ষেপ ছাড়া এ খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সার্বিক কৃষি খাতের একটি অংশ হিসেবে পোলট্রি খাতে যথাসময়ে স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণ, বিপণন সুবিধা প্রদান, কম সুদে ঋণ বিতরণে হয়রানি বন্ধ করা, রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ভ্যাকসিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা ইত্যাদি সুবিধা প্রদান করতে হবে। তাছাড়া দেশের পুষ্টিনিরাপত্তা এবং আগামী দিনের মেধাবী জাতি গঠনে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। আবার বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়লে ডিম ও মাংস আমদানিকে উৎসাহ না দিয়ে বরং দেশে উৎপাদন বাড়ানোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পোলট্রি শিল্পকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকারকে পোলট্রিবান্ধব নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সে নীতিমালায় দেশের বিনিয়োগকারীরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন, আবার বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কী সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগে আসতে পারবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত পোলট্রি শিল্প কর অবকাশ সুবিধা ভোগ করে আসছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে সে সুবিধা তুলে নেয়া হয়। আরো একটি জটিলতা এ দেশের তৃণমূল খামারিদের আরো প্রান্তিক করে তুলছে তা হলো ঋণের অপ্রাপ্যতা এবং সুদের হার। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রান্তিক খামারিদের সাধারণত ঋণ দিতে চায় না। অন্যদিকে বিদেশী কোম্পানিগুলো যেখানে বিদেশী ব্যাংক থেকে মাত্র ২ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে এসে এ দেশে বিনিয়োগ করছে; সেখানে আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের সুদের হার ন্যূনতম ৯ শতাংশ। এমতাবস্থায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি হার সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এ দেশের তৃণমূল খামারি ও উদ্যোক্তাদের জন্য কতটা কঠিন তা বোধকরি বারবার বলার প্রয়োজন পড়ে না।

পোলট্রি শিল্প অন্য যেকোনো শিল্প থেকে একেবারেই আলাদা। এটি একটি লাইভ ইন্ডাস্ট্রি। ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখা যায় কিন্তু একটি দিন মুরগির খাবার বন্ধ রাখা সম্ভব না। আজ রোগ দেখা দিলে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময় থাকে না। রাতারাতি মুরগি মরে খামার শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে মাত্র তিন-চারদিনের ব্যবধানে একজন সচ্ছল খামারিও পথে বসে পড়ে—এ রকম উদাহরণ ভূরি ভূরি। তাই ওষুধ ও ভ্যাকসিনের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকতে হবে। 

বর্তমানে প্রাণিসম্পদের অন্তর্ভুক্ত একটি খাত হচ্ছে পোলট্রি। মাছ, গরু, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতির মাঝখানে পোলট্রি অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে পোলট্রি বিজ্ঞান থেকে লেখাপড়া করা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও নিতান্তই নগণ্য। পোলট্রি বীমা কাগজে-কলমে চালু হলেও কার্যত এর কোনো প্রয়োগ হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। পোলট্রি উন্নয়ন বোর্ড গঠনের দাবিটি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। পিআরটিসি ল্যাবে পরীক্ষিত আমদানীকৃত কাঁচামালের রিপোর্ট অনেকক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বন্দরে দীর্ঘদিন মাল আটকে পড়ে থাকছে। নেই কোনো গ্রেইন টার্মিনাল বা সাইলো। এ সীমাবদ্ধতাগুলোর কারণে পোলট্রি শিল্প বারবার হোঁচট খাচ্ছে, ভিত মজবুত করে দাঁড়াতে পারছে না। মানুষ বাড়ছে, খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা বাড়ছে তাই থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর সে কারণেই সবার আগে পোলট্রির জন্য পৃথক একটি অধিদপ্তর এবং স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ‘পোলট্রি উন্নয়ন বোর্ড’ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই অনেকে পোলট্রি খামার শুরু করছেন, ফলে ব্যবসায় মার খাচ্ছেন অনেকেই। তাই প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। আর চরম প্রতিযোগিতার এ যুগে তো সে সুযোগ আরো সীমিত। সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়েই হয়তো শিল্প খাতের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হয়েছে। সে সঙ্গে কৃষি, পোলট্রি, প্রাণিসম্পদ খাতের অর্থাৎ বৃহত্তর কৃষি খাতের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে অচিরেই গঠিত হতে যাচ্ছে আইএসসি বোর্ড অব ডিরেক্টরস। সরকারের অন্যান্য সহযোগী সংস্থাও বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তৃণমূল প্রান্তিক খামারিদের এ মূল্যায়ন নিশ্চয় বৃথা যাবে না। সরকারের সহযোগিতা পেলে ২০৩০ সাল নাগাদ পোলট্রি খাতে প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। 

মসিউর রহমান: সভাপতি, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্যারাগন এগ্রো গ্রুপ