ঢাকা থেকে ৯৬ কিলোমিটার দূরে ৩১৪৬ দশমিক ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে কুমিল্লা জেলার অবস্থান। প্রাচীন জনপদ সমতটের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ অঞ্চল। পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৯০ সালে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত ত্রিপুরা জেলা দেশভাগের পর কুমিল্লা নাম পরিগ্রহ করে ১৯৬০ সালে। বাংলাদেশে সাধারণভাবে কুমিল্লা একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কুমিল্লা যেমন তার ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত, তেমনি সুবিদিত পল্লী উন্নয়নের প্রশংসিত ‘কুমিল্লা মডেল’-এর জন্য। কুমিল্লার অকৃষি খাতের বিকাশ ও সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে এই লেখা।
একনজরে কুমিল্লার আর্থসামাজিক অবস্থা
২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী কুমিল্লা জেলার জনসংখ্যা ৫৩.৮৭ লাখ। তার মধ্যে ৪৭.৮% পুরুষ ও ৫২.২% নারী। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১,৭১২ জন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৫৮%। কুমিল্লার ৮৪.৭% লোক গ্রামে বসবাস করে। এখানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৩০.২৩ লাখ। জেলায় মোট খানার সংখ্যা ১০.৫৩ লাখ। কুমিল্লায় দারিদ্র্য হার ৩৭.৯% এবং দারিদ্র্য হারের তুলনা করলে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে কুমিল্লার অবস্থান ৪৪তম। অধিকন্তু কুমিল্লায় হতদারিদ্র্য হার ২১.১% এবং দেশের জেলাগুলোর মধ্যে তার অবস্থান ৪৩তম। দেশের জনসংখ্যার সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশে আছে কুমিল্লার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ৫০.৩%। জেলার মোট শ্রমশক্তির ৪৭.৪% কৃষি কাজে, ১০.৫% শিল্প-কারখানায় ও ৪২.৮% সেবা খাতে নিয়োজিত। জেলাটিতে স্বাক্ষরতার হার ৫৩.৩%। জনসংখ্যার ৩৬.১% প্রাথমিক শিক্ষা, ১৩.৯% মাধ্যমিক শিক্ষা ও ২.৭% বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সমাপ্ত করেছেন। ৩৭.৩% শিশুর ওজন ও ৪০.৩% শিশুর উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ৫.৭% খানায় কলের পানি ও ৮৯.৩% খানায় নলকূপের পানি ব্যবহূত হয়। ৭৪.৯% খানায় বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। ৯৭% খানায় শৌচাগার আছে। (সূত্র: বাংলাদেশ ইন্টার্যাক্টিভ পভার্টি ম্যাপ, বিশ্বব্যাংক, ২০১৬)।
একনজরে কুমিল্লার অকৃষি খাত
কুমিল্লায় কুটির শিল্প আছে ১,৭৬,০৬০টি, মাইক্রো ২,৯২৮টি, ক্ষুদ্র ২৩,০৮৭টি, মাঝারি ১৯২টি ও বড় শিল্প ৮০টি—সব মিলিয়ে মোট ২,০২,৩৪৭টি। অকৃষি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জেলায় ৫,৪৮,৯১১ জন সম্পৃক্ত আছেন। এর মধ্যে ৮৭.৮৬% পুরুষ ও ১২.১৪% নারী। এ শ্রমিকদের মধ্যে কর্মরত ১,৮৪,৪৩৪ জন (৩৩.৬০%), অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক ৭,১৩৯ জন (১.৩০%) ও পূর্ণকালীন/খণ্ডকালীন/ঠিকা মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত আছেন ৩,৫৭,৩৩৮ জন (৬৫.১০%)। স্থাপনার ধরন বিবেচনায় ৭৭.০৫% স্থায়ী, ১৩.৮৯% অস্থায়ী ও ৯.০৬% অর্থনৈতিক খানা শ্রেণীর স্থাপনায় যুক্ত আছেন। ২০০৩ থেকে ২০১৩—এই ১০ বছরে অকৃষি খাতে মোট সম্পৃক্ত লোকের সংখ্যায় শহরের অবদান ১৯.৭৯% থেকে বেড়ে ৩২.২৭% ও গ্রামের অবদান ৮০.২১% থেকে কমে ৬৭.৭৩% হয়েছে। কর্মসংস্থান বিবেচনায় কুমিল্লার সবচেয়ে বড় পাঁচটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে: ১। মোটরযান ও মোটরসাইকেলের পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য ও মেরামত (২,০০,০৩৭ জন) ২। কারখানা (১,০৩,২৩০ জন) ৩। হোটেল ও রেস্তোরাঁ (৪৯,৫০১ জন) ৪। শিক্ষা (৪৯,০৮২ জন) ৫। পরিবহন ও সংরক্ষণাগার (২৩,৮০৮ জন)। জেলার ১৬টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্থাপনা যথাক্রমে আদর্শ সদর, মুরাদনগর, নাঙ্গলকোট, সদর দক্ষিণ ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলায়। অন্যদিকে সবচেয়ে কম যথাক্রমে মেঘনা, তিতাস ও হোমনা উপজেলায়। এসব অর্থনৈতিক স্থাপনার ৮১.৫৯% সৃষ্টি হয়েছে ২০০০-১৩ সময়ে। জেলায় চারটি জুট মিল, নয়টি টেক্সটাইল মিল, ৮০৬টি স মিল, ২১০টি রাইস মিল, ৫৩টি তেলকল, ৩৪৭টি বেকারি, ১৭৭টি আটার মিল ও আটটি প্লাস্টিক কারখানা আছে। ৩৭৭টি হাট ও ৩৯৩টি বাজারে এ অঞ্চলের লোকজনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটা বড় অংশ সম্পন্ন হয়। (সূত্র: অর্থনৈতিক শুমারি, ২০১৩)।
কুমিল্লার অকৃষি খাত
ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক চমত্কার মিশেল কুমিল্লার অকৃষি খাত। এখানকার খাদি, মৃৎশিল্প, রসমালাইয়ের সুখ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিদেশেও। আবার শিল্পনগরী, অর্থনৈতিক অঞ্চল, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ইত্যাদিতে স্থাপিত আধুনিক কল-কারখানার পণ্যদ্রব্য দেশী ও বৈদেশিক বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে।
১. খাদি: কুমিল্লার অকৃষি খাতের কথা বলতে গেলে শুরুতেই ঐতিহ্যবাহী খাদির নাম আসে। দ্রুত তাঁত চালানোর জন্য প্যাডেলের নিচে খাদ বা গর্ত করা হতো বলে উৎপন্ন কাপড় খাদি নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে অনেকের মতে গুজরাটি শব্দ ‘খদ্দর’ থেকে খাদি শব্দের উৎপত্তি। স্বদেশী আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে যখন বিলেতি কাপড় বর্জন করে দেশী কাপড় কেনার হিড়িক পড়ে যায়, খাদি কাপড় তত্কালীন ভারতবর্ষের জাতীয় মানসপটে জায়গা করে নেয়। গান্ধীজি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করলে কুমিল্লার খাদির পসার বাড়তে থাকে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজনৈতিক কারণে এ শিল্প একটি বড় ধাক্কা খায়। বাংলাদেশে স্বাধীনতার অব্যবহিত সময়টা ছিল খাদির স্বর্ণযুগ।
খাদি শিল্পে কর্মরতদের বেশির ভাগ ছিলেন নিম্নবর্ণের সনাতন ধর্মাবলম্বী, বিশেষত যুগী বা দেবনাথ সম্প্রদায়ের। কুমিল্লার ময়নামতি, চান্দিনা, গৌরীপুর, নবীনগর, কালিকাছা, ধামতী, বরকামতা ইত্যাদি এলাকায় ছিল তাদের বাস। অঞ্চলভেদে তারা শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ধুতি ও বিছানার চাদরের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন।
১৮৯০ সালে ত্রিপুরা গেজেটিয়ার অনুযায়ী এ এলাকায় তাঁত শিল্পে মোট ১৫ হাজার মানুষ জড়িত ছিলেন। তার মধ্যে ১৩ হাজার পুরুষ ও দুই হাজার নারী। বর্তমানে খাদি শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ২০ হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক। এর বাইরে আছেন প্রায় এক হাজার সূচিজীবী। কুমিল্লা অঞ্চলে ২০০-এরও বেশি পাইকারি ও খুচরা খাদি বিপণি ও প্রদর্শনাগার রয়েছে। অনেকেই অন্য কাজের পাশাপাশি মৌসুমি বা আংশিক বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে এ খাতে কাজ করেন। সব মিলিয়ে এ শিল্প প্রায় ২৫ হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায়। ১৮৯০ থেকে ২০২০—এই ১৩০ বছরের তথ্যের তুলনা করলে দেখা যায়, খাদি শিল্পের প্রসার সে রকমভাবে ঘটেনি।
গত তিন দশকে সারা দেশে হস্তচালিত তাঁত কমেছে ৪৫ ভাগ। কুমিল্লায় একসময় ছয় শতাধিক তাঁতকল থাকলেও ২০১৮ সালের তাঁতশুমারি অনুযায়ী বর্তমানে খানাভিত্তিক ৬৯টি তাঁত ইউনিট আছে। এতে কাজ করছেন ২৮৩ জন তাঁতি, যার মধ্যে ১৬২ জন পুরুষ ও ১২১ জন নারী। ওই শুমারিতে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১৯টি পর্যন্ত তাঁত থাকলে তাকে খানাভিত্তিক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কুমিল্লায় কারখানাভিত্তিক কোনো তাঁত ইউনিট নেই। এমনকি তাঁত সংখ্যায় দেশের প্রথম ৪০টি জেলার মধ্যেও কুমিল্লা নেই।
করোনার কারণে চলতি বছর নববর্ষ, ইদ ও দুর্গা পূজায় আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে খাদি শিল্প। গত পাঁচ মাসে কুমিল্লার দোকানগুলোতে খাদি বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৮০ কোটি টাকা কম হয়েছে এবং ছাঁটাই হয়েছে প্রায় এক হাজার কর্মচারী (দৈনিক সমকাল, ৩ অক্টোবর, ২০২০ )। এ কাপড় উৎপাদনে তাঁতি ছাড়াও জড়িত সুতা কাটুনি, ব্লক কাটার ও রঙের কারিগর। এদের অনেকেই বেকার হয়েছেন বা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে বিক্রির ১০ শতাংশ অনলাইনে হচ্ছে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে এদিকে অনেক বেশি জোর দিতে হবে।
বংশপরম্পরায় কাজ করে আসা দক্ষ তাঁতির সংখ্যা ক্রমেই কমছে। অধিকাংশ তাঁতির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। তাঁতিরা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করে যান তাদের শিল্পের কলাকৌশল, তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। খাদি শিল্প বর্তমানে প্রধান যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো হলো: মূলধনের অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না পাওয়া, সুতার মূল্যবৃদ্ধি, মানসম্মত সুতার অভাব, বিপণন সমস্যা, দক্ষ কারিগর বা শ্রমিক সংকট, নকশার অভাব, উন্নত প্রযুক্তির অভাব, রঙ ও রাসায়নিকের মূল্যবৃদ্ধি, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের স্বল্প মজুরি, তৈরি পণ্যের চাহিদার মন্থর বৃদ্ধি ইত্যাদি। তাঁতিদের কার্যকর কোনো সংঘ নেই, নেই কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৫২ সালে ড. আখতার হামিদ খানের প্রচেষ্টায় ‘দ্য খাদি অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হলেও তার কোনো কার্যক্রম এখন চোখে পড়ে না। গবেষণা ও উন্নয়নে খাদি শিল্পে চোখে পড়ার মতো কোনো বিনিয়োগ নেই। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প শ্রেণীর বিধায় কার্যকর সংঘের অনুপস্থিতিতে সরকারি সহায়তা ব্যতীত গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের সম্ভাবনা কম। কারিগরদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা না হলে এবং খাদি শিল্পকে রফতানিমুখী করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হবে না। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নকে প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা না করে এতে নতুন যেসব সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। খাদি তৈরির প্রক্রিয়াটি প্রচলিত অন্য যেকোনো কাপড়ের তুলনায় পরিবেশবান্ধব। খাদির বিপণনে ব্যাপারটি আরো সামনে আনতে হবে।
২. মৃৎশিল্প: ১৯৬১ সালে ড. আখতার হামিদ খান মৃতপ্রায় মৃৎশিল্প রক্ষায় বিজয়পুর রুদ্রপাল সমবায় সমিতি গঠন করেন। ১৫ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা করা এ সমিতির বর্তমান সদস্য ২০৯ জন—১৪৮ জন পুরুষ ও ৬১ জন নারী। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার দক্ষিণ বিজয়পুর, উত্তর বিজয়পুর, গাংকুল, টেগুরিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, বাড়পাড়া ও দুর্গাপুর—এই সাত গ্রামের প্রায় ৭০০ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সাথে জড়িত। উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত পাঁচ-ছয় হাজার মানুষ সম্পৃক্ত, যার প্রায় অর্ধেক নারী। এদের অধিকাংশই কুমার ও পাল সম্প্রদায়ভুক্ত, যারা বংশানুক্রমিকভাবে মৃৎশিল্পী।
মাটি দিয়ে প্রায় তিন হাজার রকমের জিনিসপত্র তৈরি করেন বিজয়পুরের মৃৎশিল্পীরা। দেশের ৩৪টি জেলায় বিজয়পুরের মাটির তৈরি জিনিসপত্র সরবরাহ করা হয়। প্রায় ১৮টি দেশে রফতানিও করা হয়। মৃৎশিল্পের চাহিদার বড় অংশটি পহেলা বৈশাখ ও রমজানকে কেন্দ্র করে হয়। করোনার কারণে এবার এই সময়গুলোতে মৃৎশিল্পীদের বিক্রি হয়েছে সামান্যই। এ বছর এপ্রিলের পর বিদেশ থেকে কোনো অর্ডার আসেনি। বর্তমানে সমিতিতে কর্মরত ৫০ জন কর্মী পালাক্রমে ২৫ জন করে কাজ করছেন। তাদের বেতন কমে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
১৯৯৪ সালে গ্যাস সংযোগ আসার পর সমিতি পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কাজের মান ও পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু ২০১৭ থেকে অদ্যাবধি তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং খরচও বেড়ে গেছে। প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধিও এ শিল্পের প্রসারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যদিও মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক কম এবং এটা পরিবেশবান্ধব। এছাড়া ২০০৯-১০ অর্থবছরে গড়ে ওঠা মৃৎশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে আছে।
৩. রসমালাই: প্রচলিত আছে যে তত্কালীন ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়ের হাত ধরে উনিশ শতকে রসগোল্লা রসমালাইয়ে পরিণত হয়। ১৯৩০-এর দশকে কুমিল্লা শহরের মনোহরপুরে মাতৃভাণ্ডার নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, যেখান থেকে এ অঞ্চলে রসমালাইয়ের যাত্রা। গত কয়েক দশকে কুমিল্লার রসমালাইয়ের যশ ও চাহিদা দুই-ই বেড়েছে। আরো গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের রসমালাই সুস্বাদু হলেও মাতৃভাণ্ডার স্বাদে, মানে ও খ্যাতিতে এখনো তার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। মাতৃভাণ্ডারে প্রতিদিন এক-দেড় লাখ টাকার রসমালাই বিক্রি হয়। অন্য প্রসিদ্ধ দোকানগুলোতেও দৈনিক বিক্রি ৭০-৮০ হাজার টাকার মতো। রসমালাই অবৈধভাবে ভারতেও পাচার হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন উত্সবে এ পাচারের পরিমাণ বেড়ে যায়। বৈধভাবে রসমালাই ভারতে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলে সরকারে রাজস্ব আয় বাড়ত।
কুমিল্লা শহরসংলগ্ন এলাকায়, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের দুই পাশে ৬০-৭০টির মতো মিষ্টান্নভাণ্ডার গড়ে উঠেছে। তারা সবাই নিজেদের নামে ‘মাতৃভাণ্ডার’ শব্দটি বসিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। নকল মাতৃভাণ্ডারের রসমালাইয়ে বাজার ছেয়ে যাওয়ার পেছনে প্রকৃত মাতৃভাণ্ডারের মালিকের নিষ্ক্রিয়তা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী এসব দোকানের লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা।
মুনাফা বা কিছু ক্ষেত্রে মানের দিকে নজর দিলেও ক্রেতার সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর দেয়া হয় না। বেশির ভাগ দোকানে পর্যাপ্ত জায়গা নেই, ভোক্তার বসার জায়গা নেই। দোকানের ভেতরে ক্রেতারা গাদাগাদি হয়ে অবস্থান করে। যদি মাতৃভাণ্ডারের কথাই ধরা হয়, এখানে একজন ভোক্তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি রসমালাই বিক্রি করা হয় না, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর রসমালাই পাওয়া যায় না এবং ক্রেতাকে দীর্ঘ সময় লাইন ধরে অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে দুজন প্রধান কারিগরের তত্ত্বাবধানে মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অথচ মাতৃভাণ্ডারের গত ৯০ বছরে একটি বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার কথা, ব্যাপক মাত্রায় উৎপাদনে যাওয়ার কথা, সারা দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কথা এবং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রফতানি করার কথা।
ঐতিহ্যবাহী এসব পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের বলে নিবন্ধিত ও স্বীকৃত হওয়া জরুরি। এরই মধ্যে ফজলি আম, হিমসাগর আম, নকশিকাঁথা ইত্যাদি ভারতে পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদিত পণ্য হিসেবে জিওগ্রাফিক ইন্ডিকেশন (জিআই) রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট পেয়েছে। আশার কথা যে খাদি ও রসমালাই বাংলাদেশের কুমিল্লার পণ্য হিসেবে জিআই নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
৪. বিসিক শিল্পনগরী: ১৯৬১ সালে কুমিল্লার অশোকতলায় ৫৪.৩৫ একর ভূমিতে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ছয় দশকেও পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেনি এ শিল্পনগরী। ১৪২টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে চালু আছে ১৩৫টি, একটি বাস্তবায়নাধীন এবং ছয়টি বন্ধ হওয়ার পথে। চালু ও রুগ্ণ শিল্প ইউনিটগুলোর মধ্যে ২৫টিতে অশিল্প স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে উদ্যোক্তারা সপরিবারে থাকছেন বা ভাড়া দিচ্ছেন। এমনকি দোকান বা রিকশার গ্যারেজেরও দেখা মেলে। এখানে কিছু রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা রয়েছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরো বেশি শিল্প-কারখানা পূর্ণোদ্যমে চালু করলে অনেক নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো।
দেবীদ্বার উপজেলায় ২০ একর জমিতে গড়ে উঠছে কুমিল্লা শিল্পনগরী-২। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এ প্রজেক্টে ১৬২টি প্লট তৈরি করে ১০০টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ইউনিট স্থাপনের উদ্দেশ্যে বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিসিক আশা করছে, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আগের শিল্পনগরীর অভিজ্ঞতায় দ্বিতীয় এ শিল্পনগরীর ক্ষেত্রে বিসিক কতটা সফল হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
৫. রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল: কুমিল্লার পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় ২০০০ সালে ২৬৭.৪৬ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কুমিল্লা ইপিজেড)। আয়তনে এটি দেশের চতুর্থ বৃহত্তম ইপিজেড। শিল্প প্লট সংখ্যা ও রফতানি বিবেচনায় এর অবস্থান দেশের আটটি ইপিজেডের মধ্যে পঞ্চম। এ ইপিজেড-এ ৪৫টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে দেশী ১৪টি ও বিদেশী ৩১টি (একটি জাপান-বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগসহ)। জুন, ২০২০ পর্যন্ত মোট বিনিয়োগ এসেছে ৩৮৫.০২ মিলিয়ন ডলার এবং মোট রফতানি ৩৩৮২.৪১ মিলিয়ন ডলার। ২০০১-০২ অর্থবছরে ৪৪২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে ইপিজেড যাত্রা করে। বর্তমানে এখানে মোট কর্মসংস্থানের সংখ্যা ৩১,৬৪৯। সম্প্রতি তুরস্কের স্টার কার্পেট প্রাইভেট লিমিটেড এখানে একটি কারখানা স্থাপনের ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি ২.০৩৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং সেখানে ৬৮৯ জন বাংলাদেশী নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কুমিল্লা ইপিজেডে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে নতুন কোনো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বরং কর্মসংস্থান কমেছে ২,৫৩৪টি। এ ইপিজেডে বর্তমানে প্রায় ২০০ জন বিদেশী কর্মরত। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, চাহিদার তুলনায় শিল্প প্লটের অপ্রতুলতা, দুর্বল অবকাঠামো, অদক্ষ ও জটিল আমলাতন্ত্র ইত্যাদি সমস্যায় ভুগছে এ ইপিজেড। বিনিয়োগকারী ও কর্মরত বিদেশীদের জন্য উপযুক্ত আবাসন ও অন্যান্য সুবিধাও যৎসামান্য। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৩ সালে ইপিজেডের সীমানা বাড়িয়ে প্লট সংখ্যা ২৩৮ থেকে ৫৩১-এ উন্নীত করার প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। সংলগ্ন বিমানবন্দরটি সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে ইপিজেডে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাঞ্ছনীয়।
৬. অর্থনৈতিক অঞ্চল: বর্তমানে দেশে মোট ৯৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯টি সরকারি ও ২৯টি বেসরকারি। সরকারি কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল কুমিল্লায় নেই। তবে জেলার মেঘনা উপজেলায় কুমিল্লা ইকোনমিক জোন ও দাউদকান্দি উপজেলায় অ্যালায়েন্স ইকোনমিক জোন নামে দুটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কুমিল্লা ইকোনমিক জোন স্থাপিত হচ্ছে ১০২.৫৩৮ একর জমির ওপর। প্রাথমিকভাবে এখানে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা মূলধন বিনিয়োগ করা হবে। উদ্যোক্তা আশা করছেন, পাঁচ বছরে ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কুমিল্লা ইকোনমিক জোনে।
৭. তথ্যপ্রযুক্তি: বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক হাইটেক/আইটি/আইটিইএস শিল্পের বিকাশ ও বিস্তার, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় মানবসম্পদের উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং সদর দক্ষিণ উপজেলায় আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্পে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ও বিবিধ বিশেষ প্রণোদনার সুযোগ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৮. পর্যটন খাত: কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান ও অর্ধশতাধিক পুরাকীর্তি আছে। শালবন বৌদ্ধ বিহার, ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, শাহ সুজা মসজিদ, বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও মিলনায়তন, রূপবান মুড়া, ইটখোলা মুড়া, ভোজরাজার বাড়ি, আনন্দ বিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, রানী ময়নামতি প্রাসাদ ও মন্দির এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক দর্শনার্থী এ স্থানগুলোতে ভিড় করে। তবে যথাযথ প্রচারণা ও উপযুক্ত অবকাঠামোর (আবাসন, যাতায়াত ইত্যাদি) অভাবে এ খাতের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কুমিল্লার অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভূমিকা
কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়া ৯৫ লাখ অভিবাসীর মধ্যে ২৪% কুমিল্লার অধিবাসী (বিবিএস, ২০১৬)। বিদেশে যাওয়ার সংখ্যার দিক থেকে জেলা হিসেবে ফেনীর পরই কুমিল্লার অবস্থান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্য যেকোনো জেলার তুলনায় কুমিল্লা থেকে বেশি লোক কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গিয়েছেন। কুমিল্লায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের ৪,৭৪২ জন বিনিয়োগ করেছেন। তার মধ্যে ৫ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বিনিয়োগ করেছেন ৩,০৪৫ জন (৬৪.২১%), ৭০০ জন (১৪.৭৬%) বিনিয়োগ করেছেন ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে। বাকিদের বিনিয়োগ ১ লাখ টাকার কম। জেলার অভিবাসীদের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ (প্রায় ০.২%) বিনিয়োগে এসেছেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগকে পর্যাপ্ত প্রণোদনা দিলে তা জেলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
কুমিল্লা বলতেই যে সমৃদ্ধ জেলার ছবি আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে, বাস্তবের কুমিল্লা আদতে সে রকম নয়। দারিদ্র্য ও হতদারিদ্র্যের হার বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার চেয়ে এখানে বেশি। বর্তমানে এর ঐতিহ্য হুমকির সম্মুখীন, শিল্পায়নও সবল নয়। কুমিল্লার সার্বিক উন্নয়নের জন্য এর ঐতিহ্যকে সংরক্ষণপূর্বক যুগোপযোগী করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নকে শক্ত ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, সব খাতে তথ্য ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।
এমকে তৌফিক: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





