বিশ্বব্যাপী মাংস উৎপাদনে পোলট্রি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুতবর্ধনশীল খাত। বিশ্বব্যাপী প্রাণিজ প্রোটিন সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে পোলট্রি খাত থেকে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও পুষ্টি বিবেচনায় পোলট্রি মাংস ও ডিমের চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে উৎপাদনও। প্রাণিজ প্রোটিন সরবরাহে বিশ্বব্যাপী পোলট্রির মাংস ও ডিমের অবদান ৩০ শতাংশের বেশি এবং এর শতাংশ দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশেও পোলট্রি খাত অপুষ্টিজনিত সমস্যা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে মোট মাংস উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে পোলট্রি খাত থেকে। অতীতে এ দেশের মানুষের প্রধান প্রোটিনের উত্স ছিল মাছ, কিন্তু উচ্চজনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শস্য তথা খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার, নদীর স্তর বৃদ্ধি, খোলা পানির মাছের সংখ্যা হ্রাস ইত্যাদি কারণে মাছের পাশাপাশি প্রোটিন উত্স হিসেবে পোলট্রি এগিয়ে এসেছে। ২০-২৭ শতাংশ প্রাণিজ প্রোট্রিন আসে পোলট্রি থেকে। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে এ খাতের উদ্যোক্তারা এখন বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত। বাড়ছে পোলট্রি ফার্মিং, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের পরিমাণ। ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান আয় বৃদ্ধি, আধুনিক উপায়ে পোলট্রি ফার্মিং, পুষ্টি সচেতনতা, পোলট্রি খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়, উৎপাদন কৌশল ও বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন বাংলাদেশে পোলট্রি খাত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ পোলট্রি খাত জিডিপিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। জিডিপিতে পোলট্রি উপখাতের অবদান ২.৬৭ শতাংশ। বেকারত্ব নিরসন ও নারীদের স্বাবলম্বী করার অন্যতম এক হাতিয়ার এখন পোলট্রি পালন। পোলট্রি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন ‘ইমার্জিং টাইগার’ এবং দেশ গঠনে নীরব বিপ্লবের অংশীদার।
বাংলাদেশের আবহাওয়া পোলট্রি পালনের জন্য অনুকূল। বহু বছর আগে থেকে এখানকার মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় জাতের পাখি পালন করে আসছে, যা দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে হাঁস-মুরগির খামারগুলো ছিল সনাতন পদ্ধতির এবং খামার প্রতিপালন হতো পারিবারিক পর্যায়ে। কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে পালন করার কারণে উৎপাদনশীলতা কম হওয়ায় খামার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকার তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটে পোলট্রি খামার তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, সীতাকুণ্ড, বরিশাল, যশোর, খুলনা ও রাজশাহীতে পোলট্রি (হাঁস-মুরগির) খামার তৈরি করে। ১৯৭০ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সরকারি খামারগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্রিড স্টক হারিয়ে যায়। ১৯৮০ সালের দিকে প্রাণিসম্পদ পরিষেবা অধিদপ্তর (ডিএলএস) ও বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্স বাণিজ্যিক খামার প্রতিষ্ঠা এবং জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ১৯৯০ সালের দিকে কৃষকের প্রধান দ্রুত আয়ের উত্স বা আয়ের সহায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে পোলট্রি উপখাত।
বাণিজ্যিকভাবে পোলট্রি খামার চালু হয় আশির দশক থেকে। খামারে আসে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়া। ব্যক্তি পর্যায়ে বিনিয়োগ হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। গড়ে ওঠে অনেক বড় আকারের খামার। অনেক বেকার যুবক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নেমে পড়ে ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের খামার ব্যবসায়। তাতে দ্রত সম্প্রসারণ ঘটে পোলট্রি খাতের।
বাংলাদেশে বর্তমানে গ্রান্ড প্যারেন্ট ফার্ম আছে ১৬টি, যা আটটি কোম্পানি পরিচালনা করছে, তালিকাভুক্ত ব্রিডার ফার্ম আছে ২০৬টি, সাপ্তাহিক একদিনের বাচ্চা (ডিওসি) উৎপাদন হয় প্রায় ১ কোটি ৭০ হাজারটি, রেজিস্টার্ড ফিড মিলের সংখ্যা প্রায় ১৯৮, বাণিজ্যিক পোলট্রি খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৫.৩-৫.৪ মিলিয়ন টন, বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা ৬৫-৭০ হাজার, প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হয় প্রায় ৩.৩০ কোটি, পোলট্রি মাংস ভোগ হয় জনপ্রতি বছরে প্রায় ৬.৩ কেজি (ওয়াপসা, বাংলাদেশ শাখা)। বাংলাদেশে ১৯৮৩-৮৪ সালে মোট পোলট্রি বার্ডের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৩৭ লাখ ১৩ হাজার ১৬৮, যা বেড়ে ২০১৮-২০১৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩৫ হাজারে (বিবিএস, ২০১৯)। সুদূর অতীতে না গেলেও ১৯৮০-৮১ সালে পোলট্রি মাংস উৎপাদন ছিল ৪০ হাজার ১৯৭ টন, যা ২০১৮-১৯ সালে বেড়ে হয় ৭৫.১৪ লাখ টন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ডিম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫৬৫ কোটি ৩২ লাখ পিস। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৪৬৯ কোটি ৬১ লাখ পিসে। তার পর ধারাবাহিকভাবে ডিমের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬১ কোটি ৭৪ লাখ পিসে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০১৬ কোটি ৮০ লাখ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০৯৯ কোটি ৫০ লাখ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১১৯১ কোটি ২৪ লাখ পিসে। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড় দাঁড়ায় ১৪৯৩ কোটি ৩১ লাখ পিসে, তার বিপরীতে একই অর্থবছরে চাহিদা ছিল ১৬৯৪ কোটি ১৬ লাখ পিস। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন এসে দাঁড়ায় ১৭১০.৯ কোটিতে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী মানবদেহের শক্তির ৬০ শতাংশ আসা উচিত শস্যজাতীয় পণ্য যেমন—চাল, গম, ডাল, ভুট্টা ইত্যাদি থেকে এবং ১০-১৫ শতাংশ আসা উচিত আমিষ থেকে। আবার এ আমিষের কমপক্ষে ২০ শতাংশ আসতে হবে প্রাণিজ আমিষ থেকে। তবে তা নির্ভর করে আয়, পুষ্টি সচেতনতা, খাদ্যাভাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর। বাংলাদেশ পোলট্রি খাত সমন্বয় কমিটির ২০১৫ সালের তথ্যমতে বাংলাদেশের মানুষ মাথাপিছু বার্ষিক গড়ে ৪৫-৫০টি ডিম ও ৩.৬৩ কেজি পোলট্রি মাংস গ্রহণ করে। বিপিআইসিসির দেয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের মানুষ গড়ে প্রতি বছর ৫ কেজি পোলট্রি (অন্যান্যসহ মোট ৬.৩ কেজি) ও ৭৬টি ডিম খায়।
দামের স্বল্পতা, উত্তরোত্তর উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে প্রাণিজ প্রোটিনের কমপক্ষে ৪০ শতাংশ দখল করার সুযোগ রয়েছে পোলট্রিজাত পণ্য থেকে। পোলট্রি উৎপাদন বাড়লেও আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ যারা দরিদ্র তাদের প্রয়োজনীয় আমিষ গ্রহণের পরিমাণ অনেক কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী একজন মানুষকে বছরে অন্তত ৪৩.৮০ কেজি মাংস ভোগ করতে হবে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে বার্ষিক জনপ্রতি ডিম খেতে হবে ১০৪টি, যেখানে বাংলাদেশের মানুষের জনপ্রতি গড় ভোগের পরিমাণ মাত্র ৭২টি। এশিয়া মহাদেশে ডিম ভোগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি জাপানে, যেখানে বার্ষিক গড় ভোগের পরিমাণ ৬০০টি। বিপিআইসিসির মতে তারা দেশের মানুষকে ২০২১ সালের মধ্যে বার্ষিক জনপ্রতি ১০৪টি ডিম খাওয়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
দ্য পোলট্রি সাইট ডটকম ২০১৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার মাংস গ্রহণের পরিমাণ জনপ্রতি ৪১.৩ কেজি, যা ২০৩০ সালে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫.৩ কেজিতে। মোট জনপ্রতি মাংস গ্রহণের মধ্যে পোলট্রি মাংসের পরিমাণ ১৩.৮ কেজি, যা ২০৩০ সালে বেড়ে দাঁড়াবে ১৭.২ কেজিতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক মাংস উৎপাদনের ৩৮ শতাংশ থাকবে পোলট্রির দখলে, বর্তমানে যার পরিমাণ ৩৩ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তার পরিমাণ জনপ্রতি বর্তমান ১০.৫ থেকে বেড়ে ১৪ কেজিতে দাঁড়াবে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘকাল থেকে পোলট্রি একটি খাত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। তাছাড়া এ খাতের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ কার্যাবলি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে অসামান্য অবদান। আয়, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে পোলট্রি খাতের অবদান অনেক থাকা সত্ত্বেও এ খাতকে যেসব সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে সেগুলো হলো:
পোলট্রি খাত কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত হলেও সম্প্রতি এর প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়ছে। কভিড-১৯, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, উচ্চখাদ্যমূল্য ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতে বিপর্যয়ের মুখোমুখি পোলট্রি খাত।
৮০ ও ৯০ দশকে হাঁস-মুরগির সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক গড়ে ৪ শতাংশের ওপরে। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দশকে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এর প্রধান কারণ দুটো। প্রথমত, দেশব্যাপী এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ। দ্বিতীয়ত, পোলট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ সয়াবিন ও ভুট্টার মূল্যবৃদ্ধি। দেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ শুরু হয় ২০০৭ সালে। ওই বছর সাভারের বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্সে রোগটি প্রথম শনাক্ত করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। তার পর থেকে প্রতি বছরই রোগটির প্রকোপ কমবেশি লক্ষ করা গেছে। কিন্তু যে হারে রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, সে তুলনায় সরকারি সহায়তা ছিল অপ্রতুল। রোগাক্রান্ত খামারে মুরগি ধ্বংসের পর সময়মতো ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া যায়নি। তদুপরি ঋণ পাওয়ার অনিশ্চয়তা ও ঋণের চড়া সুদ ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন ও নতুন খামার স্থাপন অনীহা তৈরি করেছে।
২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে পোলট্রি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। নিয়োজিত আছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ। প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষের ৪০ শতাংশ আসে পশু-পাখি থেকে। বাকি ৬০ শতাংশ আসে মত্স্যসম্পদ থেকে। পশু-পাখি থেকে আসা মোট প্রাণিজ আমিষের এক-তৃতীয়াংশ আসে পোলট্রি থেকে। দেশে বর্তমানে পোলট্রির সংখ্যা প্রায় ৩১ কোটি। তার ৪০ শতাংশ গ্রামীণ পরিবেশে খোলা জায়গায় চরে খাওয়া পাখি। বাকি ৬০ শতাংশই নিবিড় ও আধা নিবিড় পদ্ধতিতে পালিত। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে পোলট্রি খামারগুলোকে রক্ষা করতে হবে, বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। তার লক্ষ্যমাত্রা হতে হবে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। পোলট্রি শিল্পের বর্তমান সংকট নিরসন করা সম্ভব না হলে বিনিয়োগ বাড়ানো অনেক কঠিন হয়ে যাবে, বাধাগ্রস্ত হবে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জন।
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে বিদেশী পুঁজি আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে নিয়োজিত আছে সাতটি বিদেশী কোম্পানি। তার মধ্যে ৫টি ভারতের, ১টি থাইল্যান্ডের ও ১টি চীনের। এগুলো দেশের পোলট্রি শিল্পের প্রায় ৩০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের সাথে এক অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে দেশী খামারগুলোকে। বিদেশী অর্থপুষ্ট খামারগুলো বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে আসছে ৩-৪ শতাংশ সুদে। অথচ আমাদের খামারগুলোকে ঋণ নিতে হচ্ছে ৯-১০ শতাংশ সুদে। বিদেশী খামারগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় বড় খামারগুলোকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের পোলট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে স্বল্প হারে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা চাল রাখতে হবে।
আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সয়াবিন ও ভুট্টার উৎপাদন কমে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে এসব পণ্যের সরবরাহ, বেড়েছে দাম। এসব পণ্য পোলট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ এবং এগুলো আমদানিনির্ভর হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। তাতে বেড়েছে খামারের উৎপাদন খরচ। ফলে অনেক খামার আর উৎপাদনে ফিরে আসতে পারেনি। বিলুপ্ত হয়েছে অনেক ছোট ও মাঝারি খামার।
পোলট্রি উৎপাদনে যে খরচ হয় তার ৬৮ শতাংশ খাদ্য খরচ, ১৮.৫ শতাংশ এক দিনের বাচ্চা কেনার খরচ, ৫ শতাংশ ওষুধের খরচ, ৪ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি এবং বাকি অন্যান্য খরচ। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে খাবারের দাম। সারা বিশ্বে পোলট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ ভুট্টার উৎপাদন কমায় দাম বেড়েছে পোলট্রি খাদ্যের। সব মিলিয়ে পোলট্রি খাদ্যের দাম বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ। সরকার কৃষির অন্যান্য উপখাত, বিশেষ করে ফসল কৃষি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। ভর্তুকি সহায়তা দেয়া হচ্ছে শস্য উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ রাসায়নিক সারের ওপর। তেমনিভাবে পোলট্রি খাতে ব্যবহূত উপকরণ খাবারের ওপর ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে। তাতে পোলট্রি খাদ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। তাছাড়া ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও খামারিদের ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে।
পোলট্রি উৎপাদনে একদিনের বাচ্চা কেনার খরচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রয়লারের একদিনের বাচ্চার দাম ৬০-৭০ টাকা। আর লেয়ারের বাচ্চার দাম ১২০-১৩০ টাকা। এক হিসাব থেকে দেখা যায়, ব্রয়লারের একদিনের বাচ্চার উৎপাদন খরচ ৩০-৩৫ টাকা। লেয়ারের বাচ্চা উৎপাদন খরচও ৩৫ টাকার কাছাকাছি। অথচ তা বাজারে বিক্রিয় হচ্ছে দুই-তিন গুণ দামে। এজন্য সমীক্ষা করে উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে মুরগির বাচ্চার দাম বেঁধে দেয়া উচিত। সেই সাথে নির্ধারিত মূল্যে যাতে একদিনের বাচ্চা বিক্রি হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পোলট্রি খাতের আয় করমুক্ত ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ শিল্পের কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। পোলট্রি শিল্পে যারা ভালো আয় করছে তারা সরকারকে কর দেবে এটা অযৌক্তিক কিছু নয়। খামার পর্যায়ের বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, খামারের আকারভেদে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করছে পোলট্রি খামারগুলো। মাঝে মাঝে রোগ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অনেক খামারি লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফলে ছোট ও মাঝারি খামারগুলো উৎপাদনে টিকে থাকতে পারছে না।
পোলট্রি শিল্প রক্ষায় অনেক সময়ই রাস্তায় নেমেছে খামারিরা। বাচ্চা ও খাবারের দাম কমানো, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খামারগুলোর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি এবং বিদেশী পুঁজির আগ্রাসন থেকে দেশের পোলট্রি খাতকে রক্ষা করতে আন্দোলনে নামে কিশোরগঞ্জের খামারিরা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভৈরবের রাস্তার ওপর হাজার হাজার ডিম ফেলে প্রতিবাদ জানায় তারা। তাছাড়া চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খামারিদের প্রতিবাদের খবর ছাপানো হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও খাদ্য হিসেবে পোলট্রির পছন্দ বাড়ছে দিন দিন। গরু ও ছাগল থেকে আসা লাল মাংসে ক্যালরি ও চর্বির মাত্রা বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে ক্যালরির পরিমাণ ২৭৫ ও ভেড়ার মাংসে ৩৯৮। চর্বির পরিমাণ যথাক্রমে ২০ ও ৩০ গ্রাম। মুরগিতে ক্যালরির পরিমাণ গড়ে মাত্র ১৪০ ও চর্বির পরিমাণ ১২ গ্রাম। এ কারণেই মানুষ অপেক্ষাকৃত কম দামে সাদা মাংস হিসেবে বেছে নিচ্ছে পোলট্রি। আমাদের জনজীবনে আমিষের উত্স হিসেবে হাঁস-মুরগির মাংস ও ডিমের জুড়ি নেই। মানুষের আয়বৃদ্ধি ও জীবনমানের উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে পোলট্রির চাহিদা অনেক বাড়ছে। সেই চাহিদা মেটানোর জন্য পোলট্রি উৎপাদনে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জন করা দরকার। এজন্য দরকার পোলট্রি শিল্পের সমস্যাগুলোর আশু সমাধানের পাশাপাশি পোলট্রি খামার দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা। তাতে উৎপাদন খরচ কমবে, বাজার সম্প্রসারিত হবে, বাড়বে মুনাফা।
করোনাকালের শুরুতেই আমরা দেখেছি পোলট্রি খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দাম দ্রুতগতিতে কমে গেছে। ফলে অনেক কৃষকই আবার নতুন করে উৎপাদনে আসতে পারেনি, খামার বন্ধ হয়ে গেছে। আশ্চর্য হলেও সত্য পোলট্রি খাদ্য ও একদিনের বাচ্চার দামের ক্ষেত্রে সিন্ডেকেটের মাধ্যমে দাম কেবল বেড়েই চলে, কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। ফলে খামারিরা বাধ্য হয় বেশি দামে উপকরণ কিনতে। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ৮৫ শতাংশই ক্ষুদ্র খামারি, যারা প্রতি ব্যাচে এক হাজারেরও কম মুরগি পালন করে। তারা বিক্রির সময় কোনো সিন্ডিকেট করতে পারে না। উৎপাদন খরচও কোনো কোনো ক্ষেত্রে উঠিয়ে আনতে পারে না। বাধ্য হয় কম দামে বিক্রি করতে।
পোলট্রি শিল্পে যে খাদ্য সরবরাহ করা হয় তাতে ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম থাকে। মত্স্য ও পোলট্রি খাদ্যে আমিষের উত্স হিসেবে ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহারের কথা অনেক সময়ই সংবাদমাধ্যমে শোনা যায়। গবেষণায় প্রতি কেজি মুরগির মাংসে ২৪৯ থেকে ৪৫৬১ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম মাংস ও ডিমের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করলে ক্যান্সারসহ মানবদেহে বিভিন্ন রোগ তৈরি করতে পারে। সে কারণে পোলট্রি খাদ্য আইনে ট্যানারি বর্জ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সবার সচেতনতা প্রয়োজন।
ড. ইসমত আরা বেগম: অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ





