বাংলার ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যেগুলো সময়কে অতিক্রম করে আজও আমাদের হৃদয়ে বাজে। মুন্সিগঞ্জ বা প্রাচীন বিক্রমপুর এমনই একটি নাম। সংগীত, নাটক, নৃত্য কিংবা সাহিত্য—সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় এ জেলার অবদান অনন্য। মনে হয়, মুন্সিগঞ্জের মাটি যেন নিজেই কথা বলে, গেয়ে ওঠে হাজার বছরের গল্প।
চন্দ্ররাজাদের তাম্রশাসনের ঝলকানি, পাল-সেনদের বাণিজ্য, মোগল ও বারোভূঁইয়াদের সংগ্রাম—সবকিছুর সাক্ষী এ বিক্রমপুর। শতাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে জেলায়, যেন প্রতিটি ইট-পাথর ইতিহাসের সাক্ষী। ইদ্রাকপুর কেল্লার প্রাচীর, শহিদ বাবা আদমের মসজিদ, পাথরঘাটা শাহি জামে মসজিদ, অতীশ দীপঙ্করের পণ্ডিত ভিটা কিংবা রঘুরামপুরের বৌদ্ধবিহার, সোনারং জোড়া মঠ, নাটেশ্বর বৌদ্ধবিহার, পুলঘাটার পুল, রাজা যদুনাথ রায়ের বাড়ি—সবকিছুই একেকটি গল্প, একেকটি জীবন্ত দলিল।
মুন্সিগঞ্জের গৌরব কেবল স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এ মাটিতে জন্ম নিয়েছেন জ্ঞানতাপস ও মনীষীরা। অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধ জগৎকে আলোকিত করেছেন, জগদীশ চন্দ্র বসু বিজ্ঞানের আকাশে তুলে ধরেছেন নতুন সূর্য। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস রাজনীতিকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা, আর সত্যেন সেন সংস্কৃতির মাঠে বপন করেছেন গণমানুষের বীজ। কালজয়ী সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, বুদ্ধদেব বসু কিংবা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়—সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন এ জেলার আরো অনেক সন্তান। বিপ্লবী নেতা জিতেন ঘোষ, জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নারী নেত্রী সরোজিনী নাইডুর স্মৃতিচিহ্নও মুন্সিগঞ্জ জেলায় থেকে গেছে।
পদ্মার ঢেউ আর আড়িয়ল বিলের শান্ত জলরাশি—এ দুটি নামেই যেন মুন্সিগঞ্জের প্রকৃতি ধরা দেয়। পদ্মা সেতুর গৌরবময় স্থাপত্য এ সৌন্দর্যকে আরো আধুনিক ছন্দে বেঁধেছে। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, অথচ রাজধানীর এত কাছে—তাই ভ্রমণপিপাসুদের কাছে মুন্সিগঞ্জ এক স্বপ্নের ঠিকানা।
মুন্সিগঞ্জ শুধু অতীতে আটকে নেই, এগিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকেও। ছয় লেনের সড়ক, মেডিকেল কলেজ, খাল পুনঃখনন, পৌরসভা ভবন সংস্কার, শিল্পকলা একাডেমি আধুনিকীকরণ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সংরক্ষণ ও পর্যটন হাব নির্মাণ—সব মিলিয়ে জেলাটির রূপ পাল্টে যাচ্ছে। প্রশাসন প্রকাশ করেছে ভ্রমণ গাইড ‘প্রত্নকথা’। ভ্রমণপিপাসু মানুষকে এ বইটি হাজার বছরের পুরনো আমাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করাবে খুব সহজেই। এ জেলার ইতিহাস যেন নদীরই মতো বহমান, যার স্রোতে ভেসে আসে প্রাচীন রাজাদের শাসন, মনীষীদের কীর্তি আর প্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্য।
মুন্সিগঞ্জ একদিকে যেমন অতীতের গৌরবময় ইতিহাস বহন করে, অন্যদিকে তেমনি বর্তমানের উন্নয়ন আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়েও এগিয়ে চলেছে। বর্তমান প্রশাসন জেলার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। মুক্তারপুর থেকে ছনবাড়ি ছয় লেনের রাস্তা নির্মাণ; মেডিকেল কলেজ স্থাপন; কাটাখালী খাল পুনঃখনন ও উন্নয়ন; মুন্সিগঞ্জ পৌরসভা ভবন সংস্কার; শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামের সংস্কার ও আধুনিকীকরণ; প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন; মাওয়া শিমুলিয়া পর্যটন হাব নির্মাণ প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে পুরো জেলাকে নতুনভাবে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেবে।










