এক দশকেরও কম সময় আগেও বাংলাদেশে একটি এয়ারলাইনস টিকিট বুক করা কিংবা ছুটির ভ্রমণের পরিকল্পনা করা মানেই ছিল ট্রাভেল এজেন্সিতে যাওয়া, যানজট পেরিয়ে সেখানে পৌঁছানো, বিভিন্ন ভাড়ার তথ্য জানা এবং বুকিং নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু আজ সে অভিজ্ঞতায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। মাত্র এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ অনেকটাই প্রচলিত ট্রাভেল এজেন্সি নির্ভর ব্যবস্থা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর একটি ট্রাভেল ইকোসিস্টেমে প্রবেশ করেছে, যেখানে একজন যাত্রী স্মার্টফোনের মাধ্যমেই নিজের যাত্রা খুঁজে দেখা, বিভিন্ন বিকল্পের তুলনা করা এবং টিকিট বুক করতে পারছেন।
এ পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো প্রযুক্তিনির্ভর একটি তরুণ প্রজন্ম, যারা ভ্রমণে সুবিধা, দ্রুততা এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এখন অনেক যাত্রীই কোনো এজেন্সিতে না গিয়ে নিজেরাই ফ্লাইট খুঁজছেন, ভাড়া তুলনা করছেন, হোটেল নির্বাচন করছেন, পেমেন্ট করছেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই বুকিংয়ের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের ভ্রমণেই এ পরিবর্তন স্পষ্ট। একই সঙ্গে এটি এয়ারলাইনস, পর্যটন ব্যবসা এবং এ খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
পরিবর্তনের মূল কারণটি আসলে টিকিট কেনার পদ্ধতিতে ঘটে যাওয়া একটি নীরব বিপ্লব। বর্তমানে বাংলাদেশের এয়ারলাইনস বাজারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ লেনদেন অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বা ওটিএর মাধ্যমে হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভ্রমণকারীরা এখন আর অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বা সময়ক্ষেপণ মেনে নিতে চান না। তারা চান কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন বিকল্প তুলনা করে টিকিট বুক ও পেমেন্ট করতে। এ পরিবর্তিত প্রত্যাশাই এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলেও প্রভাব ফেলছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বৈশ্বিক এয়ারলাইনস এমিরেটস বর্তমানে তাদের নিজস্ব পোর্টালের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকিট সরাসরি বিক্রি করে। আর বাংলাদেশে পিক সিজনে প্রতি মাসে প্রায় চার লাখ সেগমেন্ট পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাত হয়—যে পরিমাণ এক দশক আগেও প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
এ সম্ভাবনা এখন শুধু এয়ারলাইনস টিকিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ভ্রমণকারীরা ক্রমেই একটি প্লাটফর্মের মাধ্যমে পুরো যাত্রার আয়োজন করতে চাইছেন—ফ্লাইট, হোটেল, ভিসা থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ হলিডে ইটিনেরারি পর্যন্ত। ফলে নির্ভরযোগ্যতার গুরুত্বও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। একজন গ্রাহক যখন একটি প্লাটফর্মের ওপর তার পুরো ভ্রমণের দায়িত্ব অর্পণ করেন, তখন যাত্রার প্রতিটি ধাপে সে আস্থা ধরে রাখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট প্লাটফর্মের।
বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এ যাত্রায় এভিয়েশন খাত এরই মধ্যে দেশের জিডিপিতে প্রায় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখছে এবং আগামী এক দশকে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ট্রাভেল ইকোসিস্টেম ভ্রমণকে আরো সহজলভ্য, দ্রুত ও সুবিধাজনক করে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের ওটিএ বাজার গড়ে ওঠার পেছনে GoZayaan, ShareTrip এবং FirstTrip-এর মতো প্লাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আকিজ এয়ার এ বাজারে আকিজের শক্তিশালী ব্র্যান্ড, দীর্ঘদিনের করপোরেট ঐতিহ্য এবং আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসছে। এমন একটি সময়ে, যখন কিছু প্লাটফর্ম তাদের কার্যক্রম টেকসইভাবে পরিচালনা করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তখন গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এভিয়েশনের ভবিষ্যৎ শুধু উড়োজাহাজ ও বিমানবন্দর দিয়ে নির্ধারিত হবে না। মানুষ কত সহজে ভ্রমণের সুযোগ খুঁজে পাবে, বুকিং করতে পারবে এবং একটি নির্বিঘ্ন ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা লাভ করবে—তার ওপরও এ ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। প্রযুক্তির সঙ্গে আস্থা ও মানসম্মত সেবার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ওটিএ খাত বাংলাদেশের এভিয়েশন ও পর্যটন শিল্পকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।















