বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বাংলাদেশের রফতানিকারকদের ইউরোপে একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইউরোপের বাজারে বর্তমানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ শতাধিক পণ্য রফতানি করছে। বছরে ৯০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য যাচ্ছে এ মহাদেশের বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে প্রাণের খাদ্যপণ্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন এবং আরএফএলের নন-ফুড পণ্য প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারের।

প্রায় দুই দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাণের খাদ্যপণ্যে একটি সুসংহত বাজার তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সাইপ্রাস ও গ্রিস এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশী ও দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের মধ্যে পরিচিত পণ্যের চাহিদা থেকে যে বাজারের সূচনা হয়েছিল, সেটি এখন ধীরে ধীরে অন্যান্য কমিউনিটির ভোক্তাদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের মধ্যে নুডলস, সেমাই ও আচারের মতো কুলিনারি আইটেমের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। এর পাশাপাশি ফ্রোজেন ফুডের মধ্যে পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা, স্প্রিং রোল, আলুপুরি, ডালপুরি, ভেজিটেবল এবং বাঙালি পিঠার বাজারও দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপে ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে সহজে রেডি টু কুক খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যা বাংলাদেশের ফ্রোজেন খাদ্যপণ্যের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করছে।

এছাড়া জুস ও ড্রিংকস, বেকারি পণ্য, ললিপপ, ক্যান্ডি, রোল ওয়েফার, নাট বার, ফ্রুট বার ও ম্যাঙ্গো বারের মতো স্ন্যাকসও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশী স্বাদের মিক্সড মসলারও একটি বড় বাজার গড়ে উঠছে। চিকেন রোস্ট মসলা, তেহারি মসলা, বিরিয়ানি মসলা, বিফ মসলা কিংবা ভেজিটেবল মসলার মতো পণ্য কেবল প্রবাসী বাঙালিদের কাছেই নয়, দক্ষিণ এশীয় খাবারে আগ্রহী অন্যান্য ভোক্তার কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি নন-ফুড পণ্যের বাজারও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ইউরোপে বিভিন্ন ধরনের নন-ফুড পণ্য রফতানি সম্প্রসারিত করেছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের বাজারে কনটেইনার ও স্টোরেজ ক্যাটাগরির বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য, আসবাবপত্র, টেবিলওয়্যার, জগ, মগ, কিচেনওয়্যার এবং ক্লিনিং সামগ্রী রফতানি হচ্ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও মোটরচালিত খেলনা এবং পোষা প্রাণীর বিভিন্ন সামগ্রী যেমন ওয়েস্ট ব্যাগ, ম্যাট, ক্লথ ও বার্ডস হোম রফতানি হচ্ছে।

ইউরোপে আরএফএলের মাউন্টেন বাইসাইকেল ও সিটি সাইকেলের একটি বড় বাজার গড়ে উঠেছে। পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রতি ইউরোপীয় ভোক্তাদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় বাইসাইকেলের ব্যবহারও বাড়ছে। একই সঙ্গে ই-বাইসাইকেলের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ খাতে প্রযুক্তি, ডিজাইন ও আন্তর্জাতিক মানে আরো বিনিয়োগ করা গেলে বাংলাদেশের জন্য ইউরোপে বড় বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।

নন-লেদার ফুটওয়্যারের প্রতি ইউরোপের বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন ধরনের নন-লেদার লাগেজ ও ব্যাগের বাজারও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এছাড়া মেলামাইনের বিভিন্ন পণ্যও নিয়মিতভাবে রফতানি হচ্ছে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বড় চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বর্তমান শুল্ক সুবিধা পরিবর্তিত হলে ইউরোপে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে এখন থেকেই উৎপাদন ব্যয় কমানো, দক্ষতা বাড়ানো এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি করা জরুরি। কাঁচামালের ক্ষেত্রে যত বেশি দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা যাবে, ততই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব হবে।

খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মান ও বিধিবিধানও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে দুধ ও ডিমজাত উপাদানসম্পর্কিত বিধিনিষেধ কিছু খাদ্যপণ্য রফতানির সুযোগ সীমিত করছে। এসব ক্ষেত্রে বিধিমালা শিথিল করা হলে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের রফতানি আরো বাড়তে পারে।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে নৌপথে পণ্য পরিবহনে প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে, এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, লিড টাইম দীর্ঘ হচ্ছে।

এখন আমাদের অন্যতম বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত ইউরোপের মূলধারার সুপারমার্কেট ও রিটেইল চেইনে বাংলাদেশী পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানো। পাশাপাশি শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলে উৎপাদন ব্যয় ও কাঁচামাল নির্ভরতা কমাতে হবে। পণ্যের গুণগত মান, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, ডিজাইন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং স্থানীয় ভোক্তার রুচি বোঝার ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি। ইউরোপের সব দেশেই এখনো বাংলাদেশী পণ্যের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও সার্বিয়ার মতো দেশে সুযোগ থাকলেও আমাদের পণ্যের বাজার তুলনামূলকভাবে সীমিত। এসব দেশে প্রবেশের জন্য বাজারভিত্তিক গবেষণা, ব্যবসায়িক সংযোগ এবং স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক তৈরি প্রয়োজন। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোও এ ক্ষেত্রে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। সম্ভাব্য আমদানিকারক ও রিটেইলারদের সঙ্গে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের সংযোগ তৈরি, ট্রেড ফেয়ার এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহে দূতাবাসের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার একটি বড় ক্ষেত্র রয়েছে। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং বাংলাদেশী ব্র্যান্ডকে ইউরোপের মূলধারার বাজারে প্রতিষ্ঠিত করা।

সঠিক নীতি-সহায়তা, শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ, কার্যকর ব্র্যান্ডিং, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে ইউরোপ শুধু বাংলাদেশের বড় রফতানি গন্তব্যই হবে না, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের জন্য হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের অন্যতম শক্তিশালী বৈশ্বিক মঞ্চ।

লেখক: পরিচালক, বিপণন, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ