যুক্তরাজ্যে প্রথম রফতানি চালানের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বাজারে মুন্নু সিরামিকের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রয় প্রতিনিধি ও বাজার তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।

মুন্নু গ্রুপের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মুন্নু সিরামিক ছিল বাংলাদেশের প্রথম দিকের পোর্সেলিন ও বোন চায়না টেবিলওয়্যার উৎপাদনকারী এবং রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। উৎপাদন শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারকে সামনে রেখেই প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করে। ১৯৮৬ সালে লন্ডনে মুন্নু ইউকে নামে বিক্রয় শাখাও খোলা হয়।

তবে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে এক আলাপচারিতায় মুন্নু সিরামিকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে প্রথম বাজার তৈরির ঘটনাটি ছিল আরো আগের। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠাতা হারুনার রশিদ খান মুন্নুর সঙ্গে তিনি লন্ডনে যান। তখন তার দায়িত্ব ছিল হিসাব ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে; বিপণনের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। হারুনার রশিদ খান মুন্নুর নিজেই পণ্যের নমুনা নিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন।

মইনুল ইসলামের ভাষায়, লন্ডনে গিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে কেভিন নামের এক ক্রেতাকে বাংলাদেশের তৈরি পণ্য দেখানো হয়। প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করতে চাননি যে এসব পণ্য বাংলাদেশে তৈরি। পরে সেখান থেকেই প্রথম অর্ডার পাওয়া যায়।

মইনুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সফর থেকেই মুন্নু সিরামিকের আন্তর্জাতিক বাজারে অগ্রযাত্রা শুরু হয়।

মুন্নু গ্রুপের নিজস্ব তথ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৬ সালে লন্ডনে বিক্রয় শাখা খোলা হয়। তবে মুন্নু সিরামিক শুধু যুক্তরাজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিসসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। ফ্রাংকফুর্টের আন্তর্জাতিক টেবিলওয়্যার প্রদর্শনীতেও প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অংশ নিয়ে আসছে।

মইনুল ইসলামের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারেও ইউরোপের বাজারের গুরুত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘মুন্নু সিরামিকের শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল বিদেশের বাজার।’ সে সময় কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় ক্রেতার চাহিদাই বেশি ছিল বলে জানান তিনি।

‘তখন তো অভিজ্ঞতা অনেক ভালো। ওই সময় এক্সপোর্টে আমাকে কখনো চিন্তা করতে হতো না যে আমি কার কাছে বিক্রি করব? বরং আমাদের ফ্যাক্টরি ক্যাপাসিটি সবসময় কম ছিল’, নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন তিনি।

১৯৮৬ সালে লন্ডনে স্থায়ী বিক্রয় শাখা খোলার ঘটনাটিও ছিল সেই বাজার সম্প্রসারণের অংশ। সেখান থেকে ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বাজারেও মুন্নু সিরামিকের পণ্য ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক উপস্থিতির একটি প্রতীকী দৃষ্টান্তের কথা জানা যায় মইনুল ইসলামের কাছে। তিনি জানিয়েছেন, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামেও মুন্নু সিরামিকের পণ্য প্রদর্শিত হয়েছে।

ইউরোপে বাংলাদেশের সিরামিক রফতানির বড় অংশ

মুন্নু সিরামিকের ইউরোপমুখী যাত্রার কয়েক দশক পরও ইউরোপ বাংলাদেশের সিরামিক রফতানির অন্যতম প্রধান বাজার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ থেকে সিরামিক পণ্যের মোট রফতানি আয় হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বাজারে রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ ২৫ হাজার ডলারের কিছু বেশি। অর্থাৎ মোট সিরামিক রফতানি আয়ের ৬৫ শতাংশের বেশি এসেছে ইউরোপের বাজার থেকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যের উল্লেখযোগ্য গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, পোল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, পর্তুগাল, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। ফলে কয়েক দশক আগে যুক্তরাজ্যের মাধ্যমে যে বাজারে প্রবেশের সূচনা হয়েছিল, বর্তমানে সেটি ইউরোপের বিস্তৃত বাজারে বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের উপস্থিতির একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের সামগ্রিক রফতানির সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে মইনুল ইসলামের বক্তব্যে। তার মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সেই চাহিদার তুলনায় দেশের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কম। ‘ওদের দেশে যে পরিমাণ ডিমান্ড, সে অনুযায়ী আমাদের ক্যাপাসিটি নেই।’

তার মতে, ইউরোপে একসময় বিপুলসংখ্যক সিরামিক কারখানা থাকলেও সেগুলো পরবর্তী সময়ে চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য সেই সক্ষমতার পুরোটা অর্জন প্রয়োজন নেই; বরং দেশের সক্ষমতা অনুযায়ী বাজার ধরার সুযোগ রয়েছে।

এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অবশ্য উদ্যোক্তাদের উদ্যোগী হওয়ার ওপর জোর দেন মইনুল ইসলাম। ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ, বিপণন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশী বাজার সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ইউরোপের বাজারে যাওয়ার বিষয়ে সিরামিক উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে নিজেও কাজ করছেন বলে জানান তিনি। ইতালিতে অনুষ্ঠেয় একটি সিরামিক মেলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কয়েকজন উদ্যোক্তাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, টাইলস ও সিরামিকওয়্যারের আন্তর্জাতিক বাজার বুঝতে হলে ইতালি ও জার্মানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে যেতে হবে।

বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের রফতানি এখনো তুলনামূলক ছোট। তবে মইনুল ইসলামের মতে, বর্তমান সক্ষমতার ভিত্তিতে আরো বড় পরিসরে রফতানির সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সিরামিক রফতানি প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারেরও নিচে; প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া গেলে ভবিষ্যতে ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

মুন্নু সিরামিকের জন্য তাই যুক্তরাজ্যের বাজারে সেই প্রথম প্রবেশ কেবল একটি রফতানি চালানের ঘটনা নয়। ১৯৮৪ সালে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া কয়েকটি নমুনা থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা পরবর্তী সময়ে একটি বাংলাদেশী সিরামিক ব্র্যান্ডের ইউরোপীয় বাজারে দীর্ঘ উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করে। আর দেশের সামগ্রিক রফতানি চিত্র বলছে, চার দশক পরও ইউরোপই বাংলাদেশের সিরামিক পণ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারগুলোর একটি।