বাংলাদেশের রয়েছে বৃহৎ ও তরুণ কর্মশক্তি, শক্তিশালী উৎপাদন ভিত্তি, প্রতিষ্ঠিত রফতানি খাত এবং ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার। অন্যদিকে নরডিক দেশগুলোর রয়েছে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটালাইজেশন এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক চর্চায় শক্তিশালী সক্ষমতা। এসব সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো গেলে শুধু বাণিজ্য বাড়ানোই নয়, বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নেরও সুযোগ তৈরি হবে।

প্রচলিত বাণিজ্যের ক্ষেত্রগুলোর পাশাপাশি যেসব খাতে নরডিক দেশগুলোর শক্তিশালী দক্ষতা রয়েছে এবং বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব নতুন সুযোগও আমাদের খুঁজে দেখা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি, টেকসই লজিস্টিকস, টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো, ডিজিটাল সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ, সার্কুলার ইকোনমি এবং উচ্চ মূল্যের উৎপাদন।

বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে। উন্নত ডিজিটাল সমাধান ও সংযোগ ব্যবস্থায় নরডিক কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী দক্ষতা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রয়েছে বৃহৎ ও ক্রমবর্ধমান বাজার। এক্ষেত্রে আরো বেশি সহযোগিতা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

একই সময়ে আমরা যদি নরডিক দেশগুলোর আরো বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে চাই, তাহলে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার সহজতা বা ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ উন্নয়নের দিকে গুরুত্বসহকারে নজর দিতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আরো বেশি পূর্বানুমেয়তা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। নীতিনিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, কাস্টমস ও বাণিজ্য সহজীকরণসংক্রান্ত সমস্যা, মান ও সনদায়ন নিয়ে জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি ও ছাড়পত্র পেতে বিলম্ব ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং আরো ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিকে এগোতে হলে সবার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কর ও শুল্ক কাঠামো সহজ করতে হবে, শুল্কনীতিকে আরো স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় করতে হবে, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং ব্যবস্থার অপ্রয়োজনীয় স্তর কমাতে হবে। একটি সহজ ও আরো পূর্বানুমেয় ব্যবস্থা স্থানীয় ও বিদেশী উভয় কোম্পানির জন্যই ব্যবসা পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ সহজ করবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়াবে।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয়টি এ আলোচনাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে আমাদের রফতানিকারকরা যাতে পূর্বানুমেয়ভাবে প্রবেশাধিকার অব্যাহত রাখতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের আলোচনা করা উচিত। এর মধ্যে উপযুক্ত ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থাও থাকতে পারে। একই সঙ্গে আমাদের মান, উৎপাদনশীলতা এবং কমপ্লায়েন্স সক্ষমতাও উন্নত করতে হবে।

আমি মনে করি, ব্যবসায়ী ও সরকারের মধ্যে আরো নিয়মিত ও বাস্তবভিত্তিক সংলাপ প্রয়োজন। একই সমস্যাগুলো বারবার আলোচনা করার পরিবর্তে কোম্পানিগুলো যেসব নির্দিষ্ট বাধার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে এগোতে হবে। এটি কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা বৈঠককেন্দ্রিক আলোচনা না হয়ে একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত।

নরডিক দেশগুলোর আরো বেশি বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের উচিত ক্রমেই নিজেকে শুধু পণ্য সংগ্রহের গন্তব্য হিসেবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ও বিনিয়োগের অংশীদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করা।

আমরা যদি ব্যবসা পরিচালনার সহজতা বাড়াতে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করতে পারি এবং বিনিয়োগকারীদের মুখোমুখি হতে হয় এমন কিছু বাধা দূর করতে পারি, তাহলে নরডিক দেশ ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে এনসিসিআইয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়নে এসব বিষয়ে এনসিসিআই তার অ্যাডভোকেসি অব্যাহত রাখবে।