উৎপাদিত চায়ের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে জাহাজে তুলে পাঠানো হতো ইউরোপের বাজারে। ঐতিহাসিক নথিতে এমনকি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সিলেটের বাণিজ্যিক যোগাযোগের প্রধান পণ্য হিসেবেও চায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চা চাষের ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দীর। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। এরপর ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ চা-করদের উদ্যোগে সিলেটের টিলা অঞ্চলে দ্রুত চা বাগান বিস্তার লাভ করে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে চা পানের আকর্ষণ না থাকলেও ইউরোপীয়রা নিজেদের চায়ের স্বাদ আস্বাদনে এখানকার চা উপযোগী পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে চাষ এবং চাষ-পরবর্তী ইউরোপে সরবরাহ শুরু করে।
উনিশ শতকের শেষদিকে সিলেটের চায়ের উৎপাদন দ্রুত বাড়তে থাকে। ইউরোপীয় ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনায় ১৮৯৩ সালে সিলেটে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ পাউন্ড চা উৎপাদিত হয়েছিল। ১৯০০ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। ওই সময় সিলেট আসাম প্রদেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৯০৪-০৫ সালে সিলেটে ১২৩টি চা বাগানের মধ্যে ১১০টির মালিকানা ছিল ইউরোপীয়দের হাতে। মূলত সিলেটের সঙ্গে চট্টগ্রামের রেলপথের যোগাযোগ তৈরির মূল কারণ ছিল বন্দর দিয়ে ইউরোপে চা রফতানি।
ঔপনিবেশিক আমলে বাংলাদেশের চা বাগানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল জেমস ফিনলে, অক্টাভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোম্পানি, ম্যাকলিওড অ্যান্ড কোম্পানি, শ’ অ্যান্ড ওয়ালেস, বারলো অ্যান্ড কোম্পানি, ডানকান ব্রাদার্স, প্লান্টার্স স্টোরস অ্যান্ড এজেন্সিজ, কিং হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানি, ব্যারি অ্যান্ড কোম্পানি, উইলিয়ামসন অ্যান্ড ম্যাগর, জে. ম্যাকিলিক্যান, ম্যাকনিল, অ্যান্ড্রু ইউল, গ্রিন্ডলে ও কিলবার্ন কোম্পানি। ১৯১০ সালের হিসাবে এসব ইউরোপীয় কোম্পানি ও এজেন্সি হাউজের নিয়ন্ত্রণে সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৬৮ হাজার ৭৩৭ একর চা-জমি ছিল।
১৯০৫-০৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সিলেট থেকে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৩৯ মণ চা রফতানি হয়েছিল। একই সময়ে আসাম থেকে রফতানি হয়েছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৫৪৮ মণ। অর্থাৎ তৎকালীন সিলেট শুধু স্থানীয় নয়, বৃহত্তর আসাম-বঙ্গ অঞ্চলেরও গুরুত্বপূর্ণ চা রফতানি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ওই সময়ে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে জেমস ফিনলে বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে ফিনলে কোম্পানির চায়ের বাজার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বিস্তৃত হয়। অর্থাৎ সিলেটের চা তখন কেবল ব্রিটিশ বাজারেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বাজার তৈরি হয়েছিল।
ঔপনিবেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় লন্ডন ছিল চায়ের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বাজার। ১৯৪৭ সালের আগে চা কেনাবেচা ও নিলামের মূল কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল লন্ডন। ভারত ভাগের পরও ব্রিটিশ চা-কর ও পুঁজিপতিরা লন্ডনের বাজারের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক যোগাযোগ ধরে রাখেন। পরে কলকাতা ও চট্টগ্রামেও চায়ের নিলাম বাজার গড়ে ওঠে। যার কারণে ১৯৪৭ সালের পরও দীর্ঘসময় এখানকার চা আন্তর্জাতিক নিলামের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে সহজেই প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল।
তবে বাংলাদেশের চা শিল্পের সেই রফতানিমুখী চরিত্র সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা দ্রুত বাড়ায় উৎপাদিত চায়ের বড় অংশ দেশের বাজারেই ব্যবহৃত হতে থাকে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ প্রায় চার কোটি কেজি চা উৎপাদন করে ৩ কোটি ১০ লাখ কেজি রফতানি করেছিল। বিপরীতে পরবর্তী সময়ে উৎপাদন বাড়লেও রফতানি ব্যাপকভাবে কমে যায়। বাংলাদেশে ১৭২টি বাগান ছাড়াও বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্রায়তন চা চাষী বছরে ১০ কোটি কেজিরও বেশি চা উৎপাদন করে, যার সিংহভাগই দেশীয় ভোক্তাদের চাহিদা মেটায়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাচীন চট্টগ্রাম চা নিলাম কেন্দ্র ছাড়াও শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে চা নিলাম বাজার অনুষ্ঠিত হয়। ১৬টি বাগান নিয়ে ডানকান ব্রাদার্সই ইউরোপীয় কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশে চায়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের চা শিল্পের চিত্র আরো ভিন্ন। ২০০১ সালেও বাংলাদেশ থেকে সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার কেজি চা রফতানি হয়েছিল। যার একটি বড় অংশই ইউরোপের বাজারে গেছে। কিন্তু গত দুই দশকে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির বিকাশ, মানুষের ক্রয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে চায়ের ভোগ খুবই দ্রুত গতিতে বেড়েছে। যার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সঙ্গে ভোগের সামঞ্জস্য না থাকায় রফতানিও কমেছে।
চা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পরও মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশীয় চা রফতানি বাজার এখনো ধরে রেখেছে বিপণন কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, গ্রিস, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, লন্ডন, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, ইউক্রেন, স্পেন, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে অনিয়মিতভাবে চা রফতানি করে দেশের শীর্ষস্থানীয় উৎপাদক, মোড়কজাত ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো। চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষায়িত চায়ের পরিবর্তে বাংলাদেশের ব্ল্যাক টি সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় ইউরোপে। সীমিত পরিসরে গ্রীন টি, অর্থডক্স টি রফতানি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মসলাসহ বিভিন্ন ফ্লেবারের টি ইউরোপের বাজারে রফতানির সুযোগ পাচ্ছে।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপীয় বাজারের মধ্যে সাইপ্রাসে রফতানি হয়েছে তিন হাজার কেজি। এছাড়া ফ্রান্সে এক হাজার কেজি, ইতালিতে এক হাজার কেজি চা রফতানি হয়েছে। গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কেও চা রফতানি হয়েছে। খোলা চায়ের তুলনায় মোড়কজাত ভ্যালু অ্যাডেড চা-ই ইউরোপের বাজারে বিভিন্ন দেশে রফতানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে রফতানি হলেও ইউরোপীয় দেশগুলোতে অতীতের এখানকার চায়ের সঙ্গে পরিচিতি বাংলাদেশের চায়ের নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
চা বোর্ড, চা উৎপাদন, বিপণন ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশেষায়িত চা ব্যতীত বাংলাদেশী ব্ল্যাক টি সারা বিশ্বের ভালোমানের চা হিসেবে সুপরিচিত। ব্রিটিশদের মধ্যেই এখানকার চায়ের স্বাদ গ্রহণের প্রবণতাও রয়েছে। কিন্তু কয়েক দশক আগেও এখানকার চা ভোগ ছিল তলানিতে। এখন প্রায় তিন গুণ উৎপাদন সত্ত্বেও দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। যার কারণে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশী চায়ের চাহিদা থাকলেও দামের কারণে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রফতানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। তাছাড়া বর্তমানে দেশে উৎপাদিত চায়ের ক্ষেত্রে উৎপাদন পদ্ধতি, কীটনাশক ও রেইন ফরেস্ট প্রতিবেদনসংক্রান্ত জটিলতা রফতানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশীয় চা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ উৎপাদনে চায়ের বৈচিত্র্য এনেছে। বিশেষ করে গ্রীন টি, অর্থডক্স টি, মসলা ও বিভিন্ন ফল ও ফুলের চা উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু হয়েছে। সিলেটের সাতকরা চা, আদা, তুলসী, বিশেষ বিশেষ ধরনের গ্রীন টি তৈরি করে দেশের বাজারের পাশাপাশি ইউরোপসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এসব চায়ের বাজার থাকলেও রফতানিতে বেগ পেতে হচ্ছে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এক্ষেত্রে দেশীয় চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না বাংলাদেশের চা। ফলে ইউরোপের বাজারে চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বসবাসকারীদের চাহিদাকে পুঁজি করে সীমিত আকারে ইউরোপে চা রফতানি বাজার ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
চা বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৩ লাখ ২৩ হাজার কেজি চা রফতানি করেছে, যার মধ্যে ৮ লাখ ৬ হাজার কেজি মোড়কজাত চা। যদিও আগের অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল ১৯ লাখ ৮৪ হাজার কেজি। দেশীয় চায়ের বাজার চাঙা থাকায় দাম বেশি হওয়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে রফতানি কমেছে। মূলত অর্থডক্স, বৈচিত্র্যময় গ্রীন টি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা গেলে ইউরোপের রফতানি বাজার আবারো ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন চা-সংশ্লিষ্টরা।










