এরপর ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া নিয়মকানুন বা রেগুলেশনের অধীনে রফতানি প্রক্রিয়া আরো কাঠামোগত রূপ নেয়।
২০০০ সালের পর থেকে এ রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল ছিল এ খাতের জন্য অত্যন্ত সুবর্ণ সময়। পরবর্তী সময়ে ২০০৯, ২০১০ ও ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ চিংড়ি রফতানি হয়।
২০০৯-১১ অর্থবছর: বার্ষিক প্রায় ৩২ হাজার ৩৬৬ টন (যার মূল্য ১৭৩ মিলিয়ন ডলার) থেকে ৩৫ হাজার টন চিংড়ি ইউরোপে রফতানি হয়।
২০১২-১৫ সময়কাল: এ সময়ে রফতানির পরিমাণ ৩৫-৩৬ হাজার টনে বজায় ছিল।
২০১৮ সাল: এ বছরে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৩৫৭ মিলিয়ন ডলার মূল্যের চিংড়ি ইউরোপে রফতানি করে, যা ছিল মোট চিংড়ি রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ।
বর্তমান বাজারের চিত্র ও ইউরোপের গুরুত্ব
বাংলাদেশের চিংড়ি রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ যত চিংড়ি রফতানি করে, তার ৬০-৭৯ শতাংশই যায় ইউরোপের বাজারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি অনেক হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপে সামগ্রিক চিংড়ির চাহিদা অত্যন্ত বেশি থাকা সত্ত্বেও যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছর প্রায় ৩ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ টন হিমায়িত চিংড়ি এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৩৩ টন অন্যান্য চিংড়ি আমদানি করেছে, সেখানে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
২০২৪-২৫ সালে যেখানে মোট রফতানি ছিল প্রায় ২৮ হাজার টন, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইউরোপে মাত্র ১৪ হাজার ১০১ টন হিমায়িত চিংড়ি রফতানি করতে পেরেছে।
বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ ও চ্যালেঞ্জগুলো
ইউরোপের বাজারে আমাদের চিংড়ি রফতানি কমে যাওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতা দায়ী।
বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
মন্দা ও মূল্য হ্রাস: ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার কারণে ইউরোপে চিংড়ির বাজারমূল্য কমে গেছে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ইউরোপে তীব্র খরা ও দাবদাহের কারণে স্থানীয় কনজামশন বা চিংড়ি ক্রয়ের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে।
ভেনামি চিংড়ির আধিপত্য: কম দামের কারণে ইউরোপের ক্রেতারা আমাদের দামি ব্ল্যাক টাইগার (বাগদা) ছেড়ে সস্তা ‘ভেনামি’ (Litopenaeus vannamei) চিংড়ির দিকে ঝুঁকছেন।
তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা: আমেরিকা ভারতের ওপর বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ করায় ভারত তাদের বিশাল বাগদা চিংড়ি উৎপাদন ইউরোপের বাজারে রূপান্তর করেছে। এছাড়া ভিয়েতনাম ও ভারতের প্রচুর উৎপাদনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও কাঠামোগত সমস্যা
সনাতন চাষ পদ্ধতি: বাংলাদেশে এখনো ৯৯ শতাংশ চিংড়ি চাষ প্রাচীন বা সনাতন পদ্ধতিতে করা হয়। ঘেরগুলোর গভীরতা মাত্র এক-দেড় ফুট হওয়ায় অতিরিক্ত গরমে সহজেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।
হোয়াইট স্পট ভাইরাসের আক্রমণ: ‘হোয়াইট স্পট সিনড্রোম ভাইরাস’-এর কারণে ঘেরে চিংড়ির ব্যাপক মড়ক দেখা দেয়।
পোনা পরিবহনে ত্রুটি: কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলে বাগদা চিংড়ির পোনা একসময় বিমানে আসত, যা এখন ট্রাকে ১০-১২ ঘণ্টা পরিবহনের কারণে প্রচণ্ড ধকল বা স্ট্রেসের মুখে পড়ে, ফলে ঘেরে ছাড়ার পর এগুলো দ্রুত রোগে আক্রান্ত হয়।
নিম্ন উৎপাদনশীলতা: অপর্যাপ্ত খাবার ও চাষীদের আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি চিংড়ির উৎপাদন মাত্র ৫০০ কেজি। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আধা-নিবিড় (সেমি-ইনটেনসিভ) পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন প্রায় ১২-১৩ হাজার কেজি।
চাষী পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধার অভাব: প্রান্তিক চাষীরা বিদ্যুৎ সুবিধা, ব্যাংক ঋণ, মানসম্মত পোনা, সুলভ মূল্যে খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা পান না।

ছবি: এসিআই
অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি: দেশে চিংড়ি মাছের
স্থানীয় চাহিদা ও ভোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষী পর্যায়ে মাছের দাম বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক রফতানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না।
সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, যা সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগানো সম্ভব।
‘ন্যাচারালি গ্রোন’ বা প্রাকৃতিক চিংড়ির ব্র্যান্ডিং
বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি বড় বড় ঘেরে প্রাকৃতিকভাবে বড় হয়, যেখানে কৃত্রিম খাবার বা ফার্টিলাইজার ব্যবহার করা হয় না। এর ফলে আমাদের চিংড়ির স্বাদ অনন্য এবং এটি প্রায় ‘ওয়াইল্ড টেস্ট’ বা প্রাকৃতিক স্বাদের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিদর্শকরাও এ স্বাদের প্রশংসা করেছেন। আমরা যদি এটিকে ‘ন্যাচারালি গ্রোন’ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং করতে পারি, তবে ইউরোপের বাজার থেকে প্রিমিয়াম প্রাইস আদায় করা সম্ভব।
ইউরোপে ডেডিকেটেড ডেক্স ও ব্রান্ডিং উদ্যোগ
ইউরোপের বাজারে আমাদের চিংড়ি প্রচারের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ডেস্ক বা স্থায়ী উইং নেই। শেনজেন জোনের সুবিধা নিয়ে ইউরোপের একটি কেন্দ্রবিন্দুতে যদি প্রচার ও ব্র্যান্ডিং ক্যাম্পেইন চালানো যায়, তবে রফতানি অনেক বাড়ানো সম্ভব।
পণ্য বহুমুখীকরণ ও সার্টিফিকেশন
ইউরোপের ক্রেতারা বর্তমানে বহুবিধ ও ডাইভার্সিফায়েড ভ্যালু অ্যাডেড প্রডাক্ট চান। একই সঙ্গে চিংড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রটির নির্ভরযোগ্যতা (Traceability) এবং আন্তর্জাতিকভাবে সার্টিফায়েড বা মানসম্মত কোয়ালিটি বজায় রাখা জরুরি।
‘ইম্পোর্ট টু এক্সপোর্ট’ পলিসি
চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলো বর্তমানে কাঁচামালের অভাবে তাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ১০-১৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এ সক্ষমতা বাড়াতে এবং কারখানাগুলোকে লাভজনক করতে কাঁচামাল আমদানি করে, সেটিকে ভ্যালু অ্যাডিশনের মাধ্যমে পুনরায় রফতানি করার নীতি (যেমনটি চীন বা ইন্দোনেশিয়া করে) গ্রহণ করা যেতে পারে।
সরকারি নীতি সহায়তা ও খরচ হ্রাস
শিপমেন্ট ও ট্রান্সপোর্টেশন খরচ অনেক বেশি। সরকার যদি রফতানিকারক ও প্রসেসরদের নীতি সহায়তা দেয় এবং চুক্তিভিত্তিক চাষের মাধ্যমে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে, তবে দেশের চিংড়ি রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারের সরকারি লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের চিংড়ি খাতকে টিকিয়ে রাখতে এবং ইউরোপের বাজারে আমাদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হলে মাঠপর্যায়ের চাষীদের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রদান, ভাইরাসমুক্ত মানসম্মত পোনা সরবরাহ এবং বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক চিংড়ি হিসেবে সঠিক ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন। তবেই যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে এবং কাঙ্ক্ষিত মূল্যে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চিংড়ি রফতানি পুনরায় গতিশীল হবে।
লেখক: বিজনেস ডিরেক্টর, এসিআই অ্যাগ্রোলিংক লিমিটেড










