২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর পর দুই বছরের মধ্যে দেশের সড়কে প্রতিষ্ঠানটির দেড় হাজারের বেশি গাড়ি চলছে বলে জানিয়েছে বিওয়াইডি। গাড়ি বিক্রির পাশাপাশি বিক্রয়োত্তর সেবা, চার্জিং অবকাঠামো ও ডিলার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পর এবার দেশে গাড়ি অ্যাসেম্বলির প্রস্তুতিও এগিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় অংশীদার রানার অটোমোবাইলস।

চীনে ১৯৯৫ সালে ব্যবসা শুরু করা বিওয়াইডি বর্তমানে বৈশ্বিক অটোমোবাইল শিল্পের অন্যতম পরিচিত নিউ এনার্জি ভেহিকল নির্মাতা। অটোমোবাইল খাতে প্রবেশের আগে ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল। বাংলাদেশের বাজারেও একসময় বিওয়াইডির ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড—দুই ধরনের গাড়ি বাজারজাত করছে বিওয়াইডি। সম্প্রতি বাজারে যুক্ত হওয়া চারটি নতুন মডেলসহ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান গাড়ির পোর্টফোলিও, ব্যাটারি প্রযুক্তি, চার্জিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেন বিওয়াইডির প্রডাক্ট স্পেশালিস্ট রেজওয়ান রহমান।

তিনি জানান, সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটর ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িতে বৈদ্যুতিক মোটরের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনও ব্যবহার করা যায়। ফলে চার্জিং অবকাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগে বাংলাদেশের বাজারে প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তি তুলনামূলক বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে।

বিওয়াইডির গাড়িতে ব্যবহৃত ‘ব্লেড ব্যাটারি’ প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি। নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও চার্জিং সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। প্লাগ-ইন হাইব্রিড মডেলগুলোতে ডিএম-আই বা ‘ডুয়াল মোড ইন্টেলিজেন্ট’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈদ্যুতিক মোটর ও ইঞ্জিনের সমন্বিত ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী গাড়ি বিদ্যুৎ, জ্বালানি কিংবা উভয়ের সমন্বয়ে চলতে পারে।

বিভিন্ন সেন্সর, ড্রাইভিং অ্যাসিস্ট্যান্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়িগুলোকে আরো নিরাপদ ও ব্যবহারবান্ধব করার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান রেজওয়ান রহমান। গাড়িতে সামনের ও পেছনের অংশের তাপমাত্রা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণের সুবিধা এবং ওয়্যারলেস চার্জিংও রয়েছে।

বিওয়াইডির দাবি, প্রচলিত পেট্রলচালিত গাড়ির তুলনায় তাদের বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, সাধারণ জ্বালানিচালিত গাড়িতে প্রতি কিলোমিটার

চলতে ১৪ টাকা বা তার বেশি খরচ হতে পারে। সেখানে বিওয়াইডির কিছু ইভি মডেলে একই দূরত্বে ব্যয় প্রায় ২ টাকা ৫০ পয়সা। প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িতেও ইঞ্জিন ও বৈদ্যুতিক মোটরের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

রেজওয়ান রহমানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মডেলভেদে একবার পূর্ণ চার্জে গাড়ি প্রায় ৩৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। গাড়ির সঙ্গে হোম চার্জার ও পোর্টেবল চার্জারের সুবিধা রয়েছে। সাধারণ চার্জিংয়ে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগলেও দ্রুত চার্জিং স্টেশনে কম সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চার্জ নেয়া যায়।

বিওয়াইডির তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিতে সর্বোচ্চ আট বছর বা ১ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার এবং মোটরে আট বছর বা ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ওয়ারেন্টি দেয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট মডেল ও শর্ত অনুযায়ী তিন বছর পর্যন্ত বিনা খরচে সার্ভিসিং সুবিধাও রয়েছে। বছরে দুইবার বা ৫ হাজার কিলোমিটার পরপর নিয়মিত সার্ভিসিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণে অবশ্য বড় চ্যালেঞ্জ চার্জিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো পর্যাপ্ত পাবলিক চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। বাসা বা অফিসে চার্জিংয়ের সুযোগ থাকলে ইভি ব্যবহার তুলনামূলক সহজ হলেও সব গ্রাহকের সেই সুবিধা নেই। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় চার্জিং স্টেশনের সহজলভ্যতা ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এ কারণে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বিওয়াইডি। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন স্থানে চার্জিং সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

বিক্রয় ও সেবা নেটওয়ার্কও সম্প্রসারণ করছে বিওয়াইডি। বর্তমানে মাদানী এভিনিউ, পল্টন, উত্তরা ও তেজগাঁও লিংক রোডে প্রতিষ্ঠানটির ডিলার পয়েন্ট রয়েছে। তেজগাঁওয়ে রয়েছে ফ্ল্যাগশিপ শোরুম। চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাজারে বিওয়াইডির সিলায়ন ৬ মডেলটি উল্লেখযোগ্য বিক্রয় সাফল্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে বাংলাদেশে বিওয়াইডির কার্যক্রম শুধু গাড়ি আমদানি ও বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না স্থানীয় অংশীদার রানার অটোমোবাইলস। বিওয়াইডির সঙ্গে মাস্টার সাপ্লাই অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং এগ্রিমেন্টের আওতায় দেশে গাড়ি অ্যাসেম্বলির প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি রানার অটোমোবাইলসের পরিচালনা পর্ষদ বিওয়াইডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল লাইসেন্স এগ্রিমেন্টের কার্যক্রমও অনুমোদন করেছে।

স্থানীয় প্রকল্পের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিওয়াইডির গাড়ি সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানি ও বিতরণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশে অ্যাসেম্বলি শুরু হলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কবে থেকে উৎপাদন শুরু হবে বা প্রথম ধাপে কোন মডেল অ্যাসেম্বলি করা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার দীর্ঘদিন ধরে জাপানি রিকন্ডিশন্ড ও প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়িনির্ভর। নতুন গাড়ির বাজারেও পেট্রোল, অকটেন ও হাইব্রিড গাড়ির আধিপত্য রয়েছে। তবে জ্বালানি ব্যয়, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং নতুন প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ায় ধীরে ধীরে নিউ এনার্জি ভেহিকলের বাজার তৈরি হচ্ছে।

এ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরির জন্য গাড়ি বিক্রির পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিওয়াইডি। বিক্রয় নেটওয়ার্ক, সার্ভিস সুবিধা, আসল খুচরা যন্ত্রাংশ, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও চার্জিং অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, পরিবর্তনের সম্ভাব্য ব্যয় এবং গাড়ির পুনর্বিক্রয়মূল্য নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিওয়াইডি বাংলাদেশের চিফ মার্কেটিং অফিসার ইমতিয়াজ নওশের বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের রাস্তায় বিওয়াইডির ১ হাজার ৫০০টির বেশি গাড়ি চলছে। আমাদের কাছে এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি ১ হাজার ৫০০টির বেশি ক্রেতার আস্থার প্রতিফলন।’

তিনি বলেন, ‘গাড়ি বিক্রির পাশাপাশি বিক্রয় ও সেবার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা, আসল খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করা, চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিওয়াইডি।’