ব্যবসার প্রয়োজনে স্থাপিত এসব দপ্তর বাংলাদেশী রফতানিকারকদের সঙ্গে ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বর্তমানে বড় ক্রেতাদের প্রায় সবারই বাংলাদেশে নিজস্ব কার্যালয় রয়েছে। ফলে তাদের সঙ্গে দেখা করতে হংকং বা চীনে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না রফতানিকারকদের। এ বাস্তবতায় হংকং ও চীনে দাপ্তরিক কার্যক্রমও গুটিয়ে নিয়েছেন অনেকে। তবে এখনো বাংলাদেশের বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট, বিশেষ করে রফতানিকারকদের স্থাপিত দপ্তর রয়েছে হংকং ও চীনে।
এফবিসিসিআই প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোশাক ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেরই, বিশেষ করে বড় ক্রেতাদের, কার্যালয় এখন ঢাকায় রয়েছে। তাদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য হংকংয়ে ছুটতে হয় না। রফতানিকারকদেরও আগে দেশের বাইরে দপ্তর কার্যক্রম ছিল। পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় এখন তা কমেছে।’
বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের হংকংয়ে উপস্থিতির ভিত্তি অবশ্য আরো পুরনো। বাংলাদেশ সরকারের হংকংস্থ কনস্যুলেট জেনারেলের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালের ২০ ডিসেম্বর হংকংয়ে ট্রেড কমিশন হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৯৬ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ কনস্যুলেট জেনারেলে রূপ নেয়। বাংলাদেশ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স হংকংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা প্রায় তিন দশক আগে হংকংয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা শুরু করেন। পোশাক ও টেক্সটাইলের পাশাপাশি ফাইন্যান্স, ইলেকট্রনিকস, কেমিক্যাল, কমোডিটি, শিপিং ও ট্রেডিংয়ের মতো খাতেও ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে।
এ উপস্থিতি এখন কেবল হংকংকেন্দ্রিক নয়। চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ায় গুয়াংজু, শেনঝেন, ইইউ, সাংহাই ও বেইজিংয়ের মতো উৎপাদন ও বাণিজ্য কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগও বাড়ছে।
এর পেছনে রয়েছে দুই দেশের বাণিজ্যের কাঠামোগত বাস্তবতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি পেমেন্ট হয়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। এসব আমদানির মধ্যে রয়েছে শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টেক্সটাইল উপকরণ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, লোহা ও ইস্পাতসহ বিভিন্ন পণ্য।
ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এখন শুধু প্রস্তুত পণ্য কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নেই। কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদনযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ কেনা, সরবরাহকারী খোঁজা এবং নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেয়ার ক্ষেত্রেও সরাসরি চীনা বাজারে উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের সঙ্গে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থার সম্পর্ক গভীর হওয়ায় চীনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের যোগাযোগের প্রয়োজন বাড়ছে।
এখানে হংকংয়ের পুরনো ব্যবসায়িক উপস্থিতির সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডে নতুন করে তৈরি হওয়া যোগাযোগের যোগসূত্র রয়েছে। হংকং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের কেন্দ্র হিসেবে মেইনল্যান্ড চায়না ও বৈশ্বিক বাজারের মধ্যে ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের একটি অংশের জন্য হংকং দীর্ঘদিনের পরিচিত বাণিজ্যিক ভিত্তি। সেখান থেকে চীনের মূল ভূখণ্ডের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ।
অন্যদিকে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইলেকট্রনিকস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যে চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগের কথা উঠে এসেছে। ক্যান্টন ফেয়ারের মতো বাণিজ্য আয়োজন বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের চীনা ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করছে।
ফলে হংকংয়ে কয়েক দশক আগে শুরু হওয়া বাংলাদেশী ব্যবসায়িক উপস্থিতি শুধু একটি পুরনো অধ্যায় নয়। বড় ক্রেতাদের বাংলাদেশে কার্যালয় স্থাপনের কারণে আগের প্রয়োজন কমলেও চীনের মূল ভূখণ্ডের উৎপাদন, সরবরাহ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরির প্রয়োজন বেড়েছে। এভাবেই হংকং ও চীনে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের দাপ্তরিক উপস্থিতি দুই দেশের ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগের একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।










