প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। এ সীমান্তের দুই পাশে প্রতিদিনই চলছে পণ্য পরিবহন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও মানুষের যাতায়াত। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে একটি পণ্য যাওয়ার পর তার মূল্য পরিশোধ, ঋণপত্র খোলা, রফতানি বিল নিষ্পত্তি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সম্পন্ন হয় আরেকটি অবকাঠামোর মাধ্যমে—ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের এ আর্থিক অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই)।
বাংলাদেশে কার্যক্রমের আকারের দিক থেকে এটি স্থানীয় বড় ব্যাংকগুলোর মতো বিস্তৃত নয়। কিন্তু ভারতীয় বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির অবস্থান আলাদা। ট্রেড ফাইন্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, করপোরেট ব্যাংকিং, রেমিট্যান্স ও অফশোর ব্যাংকিং—বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক লেনদেনের আর্থিক নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখছে এসবিআই।
দেড় শতাব্দীর বেশি পুরনো সংযোগ
বাংলাদেশে এসবিআইয়ের উপস্থিতির ইতিহাস নতুন নয়। ব্যাংকটির তথ্যানুযায়ী, এ অঞ্চলে এর কার্যক্রমের সূত্রপাত ১৮৬২ সালে ব্যাংক অব বেঙ্গলের ঢাকায় কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে শাখা চালুর মাধ্যমে এসবিআই বাংলাদেশে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকটির শাখা সংখ্যা সীমিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় তিনটি শাখা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট পরিচালনা করছে ব্যাংকটি। রয়েছে ঢাকায় কান্ট্রি অফিসও। শাখা নেটওয়ার্কের দিক থেকে এ উপস্থিতি ছোট হলেও কার্যক্রমের ধরন মূলত করপোরেট ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংকেন্দ্রিক হওয়ায় এর প্রভাব শুধু শাখার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম শাখার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বিপুল আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হয় এ অঞ্চলে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্য ও ট্রেড ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে এ শাখার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
বাণিজ্যের অর্থায়নে মূল ভূমিকা
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের সঙ্গে এসবিআইয়ের সবচেয়ে সরাসরি সম্পর্ক ট্রেড ফাইন্যান্সে। আমদানিকারকদের জন্য ডকুমেন্টারি ক্রেডিট, এলসি-ভিত্তিক আমদানি, ট্রাস্ট রিসিপ্টের বিপরীতে অর্থায়ন এবং বিদেশী সরবরাহকারীর ক্রেডিট রিপোর্টের মতো সেবা দেয় ব্যাংকটি। রফতানিকারকদের জন্য রয়েছে এলসি অ্যাডভাইজিং, প্রি-শিপমেন্ট এক্সপোর্ট প্যাকিং ক্রেডিট ও রফতানি বিল নেগোসিয়েশনের সুবিধা।
সহজভাবে বললে, ভারত থেকে কোনো পণ্য বাংলাদেশে আনতে একজন আমদানিকারকের শুধু সরবরাহকারী খুঁজে পেলেই হয় না। প্রয়োজন হয় এলসি, বৈদেশিক মুদ্রা, আমদানি অর্থায়ন এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য পরিশোধের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। একইভাবে বাংলাদেশী কোনো রফতানিকারক ভারতের ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠালেও রফতানি বিল, এলসি ও বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তির প্রয়োজন হয়। এসব জায়গায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।
ভারতীয় একটি বৃহৎ ব্যাংক হিসেবে এসবিআইয়ের বিশেষ সুবিধা হলো বাংলাদেশের কার্যক্রমের সঙ্গে ভারতের বিস্তৃত ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সংযোগ। ফলে সীমান্তপারের বাণিজ্যিক লেনদেনে ভারতীয় আমদানিকারক ও রফতানিকারকদের জন্য ব্যাংকটি একটি স্বাভাবিক আর্থিক সংযোগ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাণিজ্যের আকারও বড়
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারত দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারতের সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ভারতের রফতানি হয়েছে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতের আমদানি ছিল ১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার।
এ বাণিজ্যের বড় অংশের অর্থনৈতিক নিষ্পত্তি হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের আকার যত বড় হবে, ট্রেড ফাইন্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও সীমান্তপারের অর্থ পরিশোধে ব্যাংকিং ব্যবস্থার গুরুত্বও তত বাড়বে।
এখানে এসবিআইয়ের বাড়তি গুরুত্ব হলোএটি একই সঙ্গে ভারতের বৃহৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থার অংশ এবং বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরাসরি উপস্থিত একটি বিদেশী ব্যাংক।

ভারতীয় ব্যবসার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ
বাংলাদেশে ব্যবসা করা ভারতীয় কোম্পানি ও উদ্যোক্তাদের জন্যও এসবিআইয়ের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগ, স্থানীয় ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন কিংবা ভারতীয় অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি পরিচিত ব্যাংকিং প্লাটফর্ম থাকা ব্যবসা পরিচালনায় সুবিধা তৈরি করে।
করপোরেট ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ও ট্রেজারি সেবাও এসবিআইয়ের বাংলাদেশ কার্যক্রমের অংশ। ফলে ভারতীয় ব্যবসার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ব্যাংকটির সেবা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগের পরিমাণ এবং দুই দেশের সরবরাহ চেইন যত বিস্তৃত হবে, ততই এ ধরনের ব্যাংকিং সেবার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত থেকে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশী পণ্যের ভারতে রফতানি বাড়লে ট্রেড ফাইন্যান্সের বাজারও সম্প্রসারণ হতে পারে।
অফশোর ব্যাংকিংয়ে আলাদা সক্ষমতা
বাংলাদেশে এসবিআইয়ের দুটি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এ ইউনিটগুলোর ভূমিকা রয়েছে। ফলে ব্যাংকটির বাংলাদেশ কার্যক্রম শুধু স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনেও এর সক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও আমদানি অর্থায়ন নিয়ে যখন ব্যাংকগুলোকে নানা ধরনের চাপ সামলাতে হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক থাকা বিদেশী ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসবিআই এ জায়গায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করছে।
রেমিট্যান্স ও মানুষের চলাচল
বাংলাদেশে এসবিআইয়ের কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রেমিট্যান্স। দুই দেশের মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনেও ব্যাংকটির সেবা রয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের যাতায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় কার্যক্রমের সঙ্গেও ব্যাংকটির নাম যুক্ত—ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভিএসি) পরিচালনা।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে এসবিআই ১৫টি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র পরিচালনা করছিল এবং এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি ভিসা আবেদন ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছিল।
ফলে বাংলাদেশে এসবিআইয়ের উপস্থিতি শুধু ব্যাংক শাখায় সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যিক লেনদেন থেকে শুরু করে মানুষের সীমান্তপারের যাতায়াত—দুই দেশের সম্পর্কের একাধিক স্তরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত।
সামনে কোথায় সম্ভাবনা
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি। ভারত থেকে আমদানির তুলনায় বাংলাদেশী পণ্যের রফতানি এখনো অনেক কম। ফলে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতির বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানো এবং দুই দেশের বাণিজ্যকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করা।
এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতেরও ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশী রফতানিকারকদের জন্য সহজতর ট্রেড ফাইন্যান্স, সরবরাহ চেইন অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং ভারতীয় ক্রেতাদের সঙ্গে অর্থ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি হলে তা বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকিং সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়লে এসবিআইয়ের মতো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কসমৃদ্ধ ব্যাংকের জন্যও নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশে শাখা সংখ্যা হয়তো স্থানীয় বড় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি সংযোগ, ট্রেড ফাইন্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রা, করপোরেট ব্যাংকিং, রেমিট্যান্স ও অফশোর ব্যাংকিং সক্ষমতার কারণে এসবিআইয়ের ভূমিকা শাখার সংখ্যার চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন শুধু পণ্য আমদানি-রফতানিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিনিয়োগ, সরবরাহ চেইন, সেবা, প্রযুক্তি ও আর্থিক লেনদেন। সেই পরিবর্তিত সম্পর্কের আর্থিক অবকাঠামোয় এসবিআই কতটা বড় ভূমিকা নিতে পারবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং ব্যাংকটির বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের কৌশলের ওপর।










