বাণিজ্যিক গাড়ি আমদানি ও বিক্রির মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইফাদ গ্রুপ। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে গাড়ি সংযোজন, বাসের বডি ও ট্রাকের কেবিন তৈরি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং বিক্রয়োত্তর সেবায় যুক্ত হয়েছে ইফাদ অটোস পিএলসি। প্রায় চার দশকের পথচলায় আমদানিকারক ও পরিবেশক হিসেবে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি এখন স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদন কার্যক্রমেও যুক্ত। সর্বশেষ বাংলাদেশে সংযোজিত বাস ভুটানে রফতানির মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনের একটি অংশ বিদেশের বাজারেও পাঠিয়েছে তারা।

১৯৮৫ সালে ইফাদ গ্রুপের অটোমোবাইল ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ইফাদ অটোস নিবন্ধিত হওয়ার পর একই বছরের ২০ এপ্রিল বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে দেশের বাণিজ্যিক পরিবহন খাতের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন আমদানি ও বাজারজাত করাই ছিল এর মূল কার্যক্রম।

অটোমোবাইল ব্যবসায় বড় পরিবর্তন আসে ১৯৯৪ সালে। ওই বছর ভারতের বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অশোক লেল্যান্ডের বাংলাদেশে একক ডিলারশিপ পায় ইফাদ অটোস। এরপর ট্রাক, বাস, পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক যানবাহন দেশের বাজারে সরবরাহ করতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিনের এ ব্যবসায়িক সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে স্থানীয়ভাবে যান সংযোজনের ভিত্তি তৈরি করে।

এর ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে অশোক লেল্যান্ডের কারিগরি সহযোগিতায় ঢাকার ধামরাইয়ে বাণিজ্যিক যানবাহন সংযোজন কারখানা চালু করে ইফাদ অটোস। প্রায় ৩৭ একর জায়গার ওপর স্থাপিত এ কারখানায় আমদানি করা বিভিন্ন কম্পোনেন্ট সংযোজন করে বাণিজ্যিক যান তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির বার্ষিক সংযোজন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার ইউনিট।

স্থানীয় সংযোজনের ফলে সম্পূর্ণ তৈরি গাড়ি আমদানির পাশাপাশি খুচরা কম্পোনেন্ট এনে দেশে গাড়ি তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইঞ্জিন ও চেসিসের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট বিদেশ থেকে এলেও সংযোজন, বডি বিল্ডিং ও কেবিন তৈরির কাজ দেশে করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবলের অংশগ্রহণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

২০২৩ সালে ধামরাইয়ের কারখানায় অশোক লেল্যান্ডের ১০ হাজার বাণিজ্যিক যান সংযোজনের মাইলফলক অর্জন করে ইফাদ অটোস। একই শিল্প স্থাপনায় ট্রাক ও পিকআপের কেবিন এবং বাসের বডি তৈরির ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২০ সালের শেষ দিকে কেবিন উৎপাদন ইউনিটে উৎপাদন শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণ সক্ষমতায় বছরে প্রায় ১০ হাজার কেবিন উৎপাদন করা সম্ভব।

বাসের বডি তৈরিও স্থানীয় মূল্য সংযোজনের আরেকটি ক্ষেত্র। গ্রাহকের প্রয়োজন ও বাজারের ধরন অনুযায়ী বাসের বডি দেশে তৈরি ও সংযোজন করা হচ্ছে। ফলে শুধু যানবাহন আমদানি নয়, এর একটি অংশের নকশা, নির্মাণ ও সংযোজনের কাজও স্থানীয় পর্যায়ে করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে ইফাদ অটোস অশোক লেল্যান্ডের বিভিন্ন ধরনের বাস, ট্রাক, পিকআপ ও বিশেষায়িত যান বাজারজাত করছে। পিকআপের মধ্যে Partner, Dost, Phoenix ও Leo এবং ট্রাকের মধ্যে Tusker ও Taurus সিরিজের বিভিন্ন মডেল রয়েছে। বাসের তালিকায় রয়েছে MiTR Mini Bus, B 1616 Super, 12M Prime EX ও Eagle 180।

বাণিজ্যিক যানবাহনের পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশ ও বিক্রয়োত্তর সেবাও ব্যবসার অংশ হয়েছে। ২০১৬ সালে ‘ইফাদ অটোস সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয়। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের ২৪টি সেলস সেন্টার, ৩২টি সার্ভিস সেন্টার ও ৩৫০টি রিটেল আউটলেট রয়েছে। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রীত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সংযোজনের পাশাপাশি বিদেশের বাজারে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংযোজিত অশোক লেল্যান্ডের এসি বাস ভুটানে রফতানি শুরু করে ইফাদ অটোস। প্রথম চালানে ১১টি বাস পাঠানো হয়, যেগুলোর বডি বাংলাদেশে ইফাদের নিজস্ব কারখানায় তৈরি করা হয়েছিল।

বাংলাদেশে সংযোজিত বাসের এ রফতানি দেশের অটোমোবাইল শিল্পে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তবে স্থানীয় উৎপাদনের পরিমাণ, কম্পোনেন্টের দেশীয় উৎস এবং উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নেয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু সংযোজন সক্ষমতা থাকাই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারতীয় বিনিয়োগকে শুধু পুঁজি আনার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; বরং বাংলাদেশী ও ভারতীয় উদ্যোক্তার মধ্যে প্রকৃত অংশীদারত্ব তৈরি করতে হবে। যৌথ উদ্যোগ বলতে শুধু শেয়ারহোল্ডিং নয়—দুই পক্ষের মূলধন, প্রযুক্তি, দক্ষ ও স্থানীয় কর্মী, ব্যবস্থাপনা এবং বাজার—সব কিছুর অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরো যোগ করেন, বিশেষ করে অটোমোবাইল, অটো পার্টস, কৃষিযন্ত্র ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে ভারতীয় কোম্পানির প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতাকে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশকে শুধু বাজার হিসেবে নয়, একটি উৎপাদন ও রফতানি কেন্দ্র হিসেবে দেখবে।

তাসকীন আহমেদের মতে, ভারত থেকে যেসব পণ্য বিপুল পরিমাণে আমদানি করা হয়, সেগুলোর একটি অংশ বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন করা প্রয়োজন। ভারতীয় কোম্পানিগুলো মূলধন, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ সরবরাহ করবে; অন্যদিকে বাংলাদেশ দেবে স্থানীয় উদ্যোক্তা, দক্ষ-অদক্ষ জনবল, উৎপাদন অবকাঠামো ও স্থানীয় সাপ্লাই চেইন। এভাবে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য শুধু ভারতে নয়, তৃতীয় দেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে—যা একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাবে এবং অন্যদিকে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করবে।

সব মিলিয়ে, ইফাদ অটোসের প্রায় চার দশকের ব্যবসায়িক বিবর্তনে আমদানি ও বাজারজাতের পাশাপাশি স্থানীয় সংযোজন, বডি ও কেবিন উৎপাদন এবং রফতানির এক নতুন সংযোগ তৈরি হয়েছে। এ ধারাটি বাংলাদেশের পুরো অটোমোবাইল খাতের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—আমদানি করা কম্পোনেন্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কতটা বাড়ানো সম্ভব এবং সেই উৎপাদনকে আঞ্চলিক বাজারে কতটা প্রতিযোগিতামূলক করা যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।