বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারতের বৃহৎ কনগ্লোমারেট আদানি গ্রুপ বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। ২০২৩ সাল থেকে ভারতের গড্ডা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এ বিদ্যুৎ কিনছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এটিই ভারতের বেসরকারি কোনো কেন্দ্র যার কাছ থেকে বাংলাদেশ পুরো বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে। অর্থাৎ ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শুধু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে এমন চুক্তি থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে যখন উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি ছিল এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়, ঠিক সেই সময় ভারতের বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২৫ বছর মেয়াদি এ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক থাকলেও এখনো কেন্দ্রটি থেকে বড় আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিচ্ছে বিপিডিবি।

আদানির বিদ্যুৎ কেনার আগে ভারত থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় কেনা বিদ্যুতের আমদানি বিল ছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদানির বিদ্যুৎ দেশে আমদানি হওয়ার পর এখন ভারতের বিদ্যুৎ আমদানিসংক্রান্ত বিল পরিশোধ করতে হয় প্রতি বছর ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ গত সাড়ে চার বছরের ব্যবধানে ভারত থেকে বিদ্যুতের আমদানি বিল বেড়েছে ২৮০ শতাংশ পর্যন্ত।

ভারতে আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কী পরিমাণ অর্থের বিদ্যুৎ কিনেছে তার এখনো পরিসংখ্যান বা প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি বিপিডিবি। তবে গত তিন অর্থবছরে বিপিডিবির হিসাব থেকে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২৬ হাজার ৩২১ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ হাজার ১৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছে সরকারি সংস্থাটি।

বাংলাদেশে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মধ্যে বিল পরিশোধ নিয়ে এক ধরনের টানাপড়েন ছিল। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে বিল পরিশোধ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সন্তোষজনক বলে মনে করে আদানি পাওয়ার। ভারতের গড্ডা কেন্দ্র থেকে আদানি যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, সেই বিবেচনায় গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার পাচ্ছে আদানি। আদায়ের এ পরিমাণ নিয়মিত মাসের বিলের চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়ায় বকেয়া কমিয়ে ফেলছে বিপিডিবি, যা ভারতীয় দৈনিক হিন্দু বিজনেস লাইনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ কোম্পানিটির পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা)।

হিন্দু বিজনেস লাইনের প্রতিবেদনে সম্প্রতি এক বার্ষিক সভায় আদানি পাওয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এস বি খালিয়া বিনিয়োগকারীদের বলেন, ‘‌বিপিডিবির পক্ষ থেকে নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। গত মাসেও ১০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আমাদের বকেয়া পাওনা সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। জুন-জুলাইয়ে আমাদের এককালীন একটি বড় অংকের অর্থ পরিশোধ করেছে বিপিডিবি। এটি বাংলাদেশ থেকে আমাদের এ পাওনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে দারুণভাবে সাহায্য করেছে। প্রান্তিকভিত্তিক তুলনা করলে বকেয়া পাওনা এখন বেশ ভালোভাবেই কমে এসেছে।’

ভারত থেকে বাংলাদেশের মোট ২ হাজার ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে আদানির সঙ্গে যে পরিমাণ চুক্তি তা ভারত থেকে মোট বিদ্যুৎ আমদানির প্রায় ৫৮ শতাংশ। দেশের প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র পাঁচটি। দেশের বাইরে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির।

ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি শুধু বিদ্যুৎ আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ বিদ্যুৎ কিনতে বৃহৎ সঞ্চালন অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত ১৩৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে হয়েছে। এ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি। যা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী স্থান মনাকষা থেকে রহনপুর হয়ে বগুড়া পর্যন্ত ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। এছাড়া বগুড়ায় ৪০০/২৩০ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণ করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৭ সালে বিশেষ আইনের অধীনে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালের জুনে প্রথমবার বাংলাদেশ সফর করেন। তখন ভারতের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির ধারাবাহিকতায় আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।