দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে রয়েছে এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য। বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এ অঞ্চলে বসবাস করলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য অত্যন্ত সীমিত। আঞ্চলিক বাণিজ্য দক্ষিণ এশিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ; বিপরীতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ২৫ শতাংশ। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার, যেখানে সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ অন্তত ৬৭ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়।

তাই প্রশ্নটা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সহযোগিতার সামর্থ্য নিয়ে নয়; আসল প্রশ্ন হলো পারস্পরিক সহযোগিতা না করার মতো বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ এ অঞ্চলের আছে কি?

আমার প্রস্তাব হলো সার্ককে ধীরে ধীরে একটি ‘দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়’-এ রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নেয়া। এটি কোনো রাজনৈতিক ইউনিয়ন হবে না; কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক মডেল অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার ব্যবস্থাও হবে না। বরং এর লক্ষ্য হবে পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা গড়ে তোলা।

এর ভিত্তি হতে পারে সদস্য দেশগুলোর সম্মতিতে প্রণীত একটি ১৫ বছর মেয়াদি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বিরোধ ও পরিবর্তনের প্রভাব থেকে এ কাঠামোকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখতে হবে। এর মূল লক্ষ্য হবে অত্যন্ত সরল—দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশকে অন্য দেশগুলোর জন্য আরো বেশি অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান করে তোলা।

এ কাঠামোর পাঁচটি পরস্পর-সংযুক্ত স্তম্ভ থাকতে পারে।

প্রথমত, একটি দক্ষিণ এশীয় অভিন্ন অর্থনৈতিক পরিসর। ধাপে ধাপে শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে হবে, পণ্যের মান ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সমন্বিত করতে হবে, ডিজিটাল বাণিজ্য নথির পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত দূরবর্তী কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের চেয়ে প্রতিবেশী দক্ষিণ এশীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সহজ ও সাশ্রয়ী করা।

দ্বিতীয়ত, একটি দক্ষিণ এশীয় সংযোগ নেটওয়ার্ক। সড়ক, রেল, নৌপথ, বন্দর, বিমান যোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামোকে বিচ্ছিন্ন জাতীয় প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে। বাংলাদেশের বন্দর ও নৌপথ, নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ, ভারতের বিশাল বাজার ও শিল্প সক্ষমতা, পাকিস্তানের পশ্চিমমুখী যোগাযোগ, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের সামুদ্রিক অবস্থান এবং আফগানিস্তানের মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনা—এসবকে পৃথক জাতীয় সম্পদ না দেখে পরস্পরের পরিপূরক আঞ্চলিক সম্পদে পরিণত করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশীয় জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা বাজার। তুলনামূলক সুবিধা ও মৌসুমি চাহিদার ভিত্তিতে সীমান্তপারের বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। হিমালয় অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ, বিভিন্ন দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদনকে একটি আঞ্চলিক বাজারের আওতায় আনা গেলে বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরতা ও আকস্মিক সংকটের ঝুঁকি কমবে।

চতুর্থত, দক্ষিণ এশীয় উৎপাদন শৃঙ্খল। শুধু তৈরি পণ্য আমদানি-রফতানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে। তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত, মৎস্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল সেবার মতো খাতে যৌথভাবে উৎপাদন নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি দেশ যেখানে বেশি প্রতিযোগিতামূলক, সেখানে বিশেষায়িত হবে এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারের সুবিধা গ্রহণ করবে।

পঞ্চমত, একটি দক্ষিণ এশীয় উন্নয়ন ও বিনিয়োগ তহবিল। সদস্য দেশ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অর্থায়নে এ তহবিল গড়ে তোলা যেতে পারে। এর অর্থ আঞ্চলিক অবকাঠামো, জলবায়ু সহনশীলতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, প্রযুক্তি এবং সীমান্তপারের ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হবে। এর পরিচালন কাঠামোয় ছোট অর্থনীতিগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থনৈতিক সুফল বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ ও লাভ। সহযোগিতা থেকে ভারত লাভবান হবে, কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানকেও লাভবান হতে হবে। ছোট দেশগুলোর কাছে আঞ্চলিক একীকরণ যেন কখনই বড় প্রতিবেশীর অর্থনৈতিক অধীনতার সমার্থক মনে না হয়—এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

দক্ষিণ এশিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ হতে হবে না। এ অঞ্চলের ইতিহাস, বাস্তবতা ও বৈচিত্র্যের উপযোগী একটি নিজস্ব মডেল প্রয়োজন—রাজনৈতিক অভিন্নতা ছাড়াই সহযোগিতা, সার্বভৌমত্ব বিসর্জন না দিয়েই অর্থনৈতিক একীকরণ এবং আধিপত্য ছাড়াই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বিশেষ সুযোগ। তবে বাংলাদেশের নেতৃত্বের অর্থ হওয়া উচিত শুধু নিজের জন্য আঞ্চলিক সুবিধা আদায় করা নয়; বরং এমন একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিসর গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের সমৃদ্ধি অন্য দেশগুলোর জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। সার্ক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশ এ ধরনের একটি ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গির নেতৃত্ব দেয়ার বিশেষ নৈতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ এমন হওয়া উচিত নয় যেখানে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিচ্ছিন্ন জাতীয় অর্থনীতি সীমান্তের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে; বরং এমন একটি পরস্পর সংযুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে এক দেশের সমৃদ্ধি ক্রমেই অন্য সব দেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।