মালদ্বীপের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের পরিচিতি এতদিন মূলত তৈরি পোশাককেন্দ্রিক হলেও রফতানি তথ্য বলছে, সেখানে বাংলাদেশের আরেকটি চিত্র দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ ও মসলা এখন দেশটির বাজারে বাংলাদেশের বড় রফতানি পণ্য হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ দুই অর্থবছরের পণ্যভিত্তিক রফতানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপে বাংলাদেশ থেকে ওষুধ ও মসলা মিলিয়ে রফতানি হয়েছে ৩৬ লাখ ৫৩ হাজার ডলারের পণ্য। বিপরীতে সুতি টি-শার্ট রফতানি হয়েছে ৮ লাখ ১৬ হাজার ডলারের। অর্থাৎ পোশাক পণ্যের তুলনায় ওষুধ ও মসলার সম্মিলিত রফতানি প্রায় সাড়ে চার গুণ।

এক বছর আগেও ব্যবধানটি ছিল বড়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালদ্বীপে ওষুধ ও মসলা মিলিয়ে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ২৩ লাখ ৪৮ হাজার ডলার। ওই বছর সুতি টি-শার্ট রফতানি হয়েছিল ৬ লাখ ১৯ হাজার ডলারের। অর্থাৎ তখনো ওষুধ-মসলার সম্মিলিত রফতানি টি-শার্টের প্রায় ৩ দশমিক ৮ গুণ ছিল। এক বছরের ব্যবধানে ওষুধ ও মসলার রফতানি বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে টি-শার্টের রফতানি বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

পণ্যভিত্তিক এ পরিবর্তনের সঙ্গে মালদ্বীপে বাংলাদেশের সামগ্রিক রফতানিও বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে মোট রফতানি বাড়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কোন পণ্যে এ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত হচ্ছে।

12.1

সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে ওষুধে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালদ্বীপে বাংলাদেশী ওষুধ রফতানি হয়েছিল ১৪ লাখ ৭ হাজার ডলারের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রফতানি বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ। সর্বশেষ অর্থবছরে একাই ওষুধ মোট রফতানির প্রায় ৩১ শতাংশ জুড়ে ছিল। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের পাশাপাশি অন্যান্য ওষুধজাত পণ্যও এ রফতানির আওতায় রয়েছে।

মসলার বাজারেও প্রবৃদ্ধি কম নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালদ্বীপে বাংলাদেশী মসলার রফতানি ছিল ৮ লাখ ৭৮ হাজার ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ ১৬ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মসলা, মরিচ, ধনে, জিরা, হলুদ ও মসলা মিশ্রণ রয়েছে এ রফতানি তালিকায়। ফলে খাদ্যপণ্যের বাজারেও বাংলাদেশের উপস্থিতি শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন পণ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

অন্যদিকে টি-শার্টের রফতানি ৬ লাখ ১৯ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ৮ লাখ ১৬ হাজার ডলারে উঠেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ পোশাকের বাজারও সম্প্রসারণ হচ্ছে। কিন্তু ওষুধ ও মসলার সম্মিলিত রফতানি যে হারে বাড়ছে, তাতে মালদ্বীপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোয় তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন ভিত্তি তৈরি হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে।

12.2

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দেশভিত্তিক রফতানি বিশ্লেষণেও এর একটি বিস্তৃত প্রতিফলন পাওয়া যায়। ওই অর্থবছরে মালদ্বীপে বাংলাদেশের রফতানির মধ্যে রাসায়নিক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের পণ্যের অংশ ছিল ১৯ লাখ ডলার। খাদ্য, পানীয় ও সংশ্লিষ্ট পণ্য থেকে এসেছে ১৫ লাখ ডলার এবং উদ্ভিজ্জ পণ্য থেকে ১৩ লাখ ডলার। বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্যের রফতানি ছিল ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ সরকারি পরিসংখ্যানেও মালদ্বীপের বাজারে পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের পণ্যের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়।

মালদ্বীপের সরকারি পরিসংখ্যানও বাজারটির ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। মালদ্বীপ মুদ্রা কর্তৃপক্ষের মালদ্বীপ শুল্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে দেশটির আমদানি ছিল প্রায় ৮১ লাখ ডলার। একই বছরে মালদ্বীপের মোট পণ্য আমদানি ছিল প্রায় ৩৬২ কোটি ডলার। ফলে দেশটির আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো খুবই ছোট। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর রফতানি প্রবৃদ্ধি বলছে, বাজারটিতে বাংলাদেশের জন্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

দুই অর্থবছরের তথ্য তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিক নির্দেশ করছে। মালদ্বীপে বাংলাদেশের রফতানির গল্পটি আর শুধু পোশাকের নয়। বরং ওষুধ ও মসলা মিলিয়ে সর্বশেষ অর্থবছরে যে ৩৬ লাখ ৫৩ হাজার ডলারের রফতানি হয়েছে, তা মোট রফতানির প্রায় ৪৬ শতাংশ। একদিকে ওষুধে দ্রুত প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে মসলার ধারাবাহিক সম্প্রসারণ, সঙ্গে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উপস্থিতি, সব মিলিয়ে ছোট এ দ্বীপরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়ি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।