বাংলাদেশ-শ্রীলংকা বাণিজ্যের অর্থায়ন ও লেনদেন সহজীকরণে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ভূমিকা কী? ব্যাংকের কার্যক্রমের বড় অংশ কোন কোন খাতে?

বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলংকা থেকে বাংলাদেশে রফতানি প্রায় ২৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশ থেকে শ্রীলংকায় রফতানি প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সে হিসাবে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ থেকে শ্রীলংকায় প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ওষুধ, তৈরি পোশাক, বস্ত্রপণ্য ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য। অন্যদিকে শ্রীলংকা থেকে বাংলাদেশে রফতানি হয় বস্ত্র ও কাপড়, পেট্রোলিয়াম পণ্য, সুতা, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, কাগজ, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক পণ্য। এসব পরিসংখ্যানই দেখায়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

শ্রীলংকার একটি ব্যাংক হিসেবে দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন সহজীকরণে ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমরা আমদানি ও রফতানি অর্থায়ন, ঋণপত্র (এলসি), গ্যারান্টি, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসহ বিভিন্ন ট্রানজেকশন ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকি।

বাংলাদেশে আমাদের প্রধান বাণিজ্য কার্যক্রম তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ওষুধ, দ্রুত বিক্রি হয় এমন ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি), কমোডিটি, উৎপাদন ও পাট খাতে কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে আমাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শ্রীলংকার সঙ্গে এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য করা বাংলাদেশী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমরা সহায়তা করতে পারি।

বাংলাদেশে দুই দশকের বেশি সময়ের কার্যক্রমে ব্যাংকের ব্যবসার ধরন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে? শ্রীলংকার সঙ্গে বাণিজ্যের বাইরে বর্তমানে কোন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও করপোরেট ব্যাংকিং কার্যক্রম বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

২০০৩ সালের নভেম্বরে ক্রেডিট এগ্রিকোল ইন্দোসুয়েজের ব্যাংকিং ব্যবসা অধিগ্রহণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করি। সময়ের সঙ্গে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন বাংলাদেশে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা, কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষতা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার জন্য আমরা স্বীকৃতি পেয়েছি। আমাদের বাংলাদেশ কার্যক্রম টানা ১৬ বছর ধরে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশের (ক্রিসল) সর্বোচ্চ স্থানীয় ক্রেডিট রেটিং ‘এএএ’ ধরে রেখেছে। এটি আমাদের শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান ও সতর্ক ব্যাংকিং পদ্ধতির প্রতিফলন।

আমরা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বড় স্থানীয় করপোরেট, সরকারি সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে করপোরেট ব্যাংকিং, ট্রেড ফাইন্যান্স, ট্রেজারি ও ব্যাংক গ্যারান্টিসহ বিস্তৃত সেবা দিয়ে থাকি।

আমাদের করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে লেনদেনও সহজ করা হচ্ছে। ক্রমেই আমরা পুরো বাণিজ্য ও কার্যকরী মূলধন চক্রকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত সমাধান দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

প্রযুক্তিও এ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দক্ষতা ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নত করতে আমরা ডিজিটাল ট্রেড সেবা, অটোমেশন এবং দ্রুত লেনদেন প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগ করছি।

প্রচলিত পণ্যগুলোর বাইরে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার বাণিজ্য কীভাবে বহুমুখী করা যেতে পারে?

তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও ওষুধের প্রচলিত খাতের বাইরে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বহুমুখী করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও খাদ্যপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা, হালকা প্রকৌশল এবং নির্বাচিত উৎপাদিত পণ্য।

চা, রাবারজাত পণ্য, মসলা, নারকেলজাত পণ্য, পর্যটন এবং কিছু বিশেষায়িত উৎপাদন খাতে শ্রীলংকার শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে শক্তিশালী উৎপাদন ভিত্তি রয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও পাটজাত পণ্যে।

ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরো বেশি যোগাযোগ, বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়ানো হলে নতুন সুযোগ চিহ্নিত করা সম্ভব। ব্যাংকগুলোও ট্রেড ফাইন্যান্স, বাজারসংক্রান্ত তথ্য ও পেমেন্ট সেবা দিয়ে এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ দুই দেশের মধ্যে আরো বিস্তৃত ও টেকসই বাণিজ্যিক ভিত্তি তৈরি করবে।

দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এবং তুলনামূলক কম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা বাণিজ্য বাড়াতে ব্যাংক খাত থেকে কী ধরনের অর্থায়ন, লেনদেন সুবিধা বা নতুন ব্যাংকিং সেবা প্রয়োজন?

দুই দেশের তুলনামূলক কম বাণিজ্যকে শুধু চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা উচিত নয়; এর মধ্যে এখনো কাজে লাগানো হয়নি এমন বড় সম্ভাবনাও রয়েছে। লেনদেনের প্রতিবন্ধকতা কমানো, অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যকে আরো দ্রুত ও সহজ করতে ব্যাংক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিযোগিতামূলক ও নমনীয় ট্রেড ফাইন্যান্স। ব্যাংকগুলো আমদানি ও রফতানি অর্থায়নের পাশাপাশি প্রি-শিপমেন্ট ও পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্স, কার্যকরী মূলধন সুবিধা, ঋণপত্র (এলসি), গ্যারান্টি এবং কাঠামোবদ্ধ ট্রেড ফাইন্যান্সের মতো সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে ছোট ব্যবসার জন্য অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব।

করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ও পেমেন্ট সংযোগ জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক বৈদেশিক মুদ্রা সেবা এবং দ্রুততর আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট লেনদেনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনাও সহজ করতে পারে।

ডিজিটাল ট্রেড সেবার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, অনলাইন এলসি প্রক্রিয়াকরণ, ইলেকট্রনিক গ্যারান্টি, লেনদেনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং স্বয়ংক্রিয় কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা। এসব সমাধান কার্যক্রমের দক্ষতা ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে।

সবশেষে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরিতেও ব্যাংকগুলো আরো বিস্তৃত ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্ভাব্য বাণিজ্য অংশীদার চিহ্নিত করা, বাজারসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ এবং নতুন বাজারে প্রবেশে কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করা সম্ভব।