একসময় চা রফতানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত ছিল। দেশের চা-বাগানে উৎপাদিত চায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে যেত। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ বেড়েছে, উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় স্থানীয় বাজারের চাহিদা আরো দ্রুত বাড়ায় রফতানির জন্য উদ্বৃত্ত চা কমে এসেছে। এখন শুধু রফতানি নয়, নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকেও চা আনছে বাংলাদেশ। এ পরিবর্তিত বাজারে শ্রীলংকার চায়ের উপস্থিতিও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। একই বছরে রফতানি হয়েছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি। ২০২৫ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজিতে। তবে ওই বছর রফতানি কমে হয়েছে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজি। অর্থাৎ দেশে উৎপাদন প্রায় ১০ কোটি কেজির কাছাকাছি পৌঁছালেও তার তুলনায় রফতানির অংশ এখন খুবই সীমিত। চা আমদানির জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ডের অনুমতির ব্যবস্থাও রয়েছে এবং ২০২৬ সালেও আমদানির অনুমতি দেয়ার নোটিস প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

এ পরিসংখ্যান বাংলাদেশের চা অর্থনীতির একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একসময় উৎপাদন বাড়ার অর্থ ছিল রফতানির সুযোগ তৈরি হওয়া। এখন উৎপাদন বাড়লেও দেশের বাজারেই তার বড় অংশ বিক্রি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ একই সঙ্গে চা উৎপাদন, রফতানি ও আমদানির বাজারে অবস্থান করছে। এ বাস্তবতায় বিদেশী চায়ের জন্য যে বাজার তৈরি হচ্ছে, সেখানে শ্রীলংকার মতো ঐতিহ্যবাহী চা রফতানিকারক দেশের প্রবেশ স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রীলংকার ক্ষেত্রে চা শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পণ্য। শ্রীলংকা রফতানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির চা রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১৪৩ কোটি ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার। আগের বছরের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির চা রফতানিতে বাল্ক ও প্যাকেটজাত চা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশে শ্রীলংকার চায়ের উপস্থিতি অবশ্য এখনো খুব বড় পরিসরের নয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব সমন্বিত বাণিজ্য সমাধান ব্যবস্থায়, জাতিসংঘের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শ্রীলংকা বাংলাদেশে এইচএস ০৯০২-এর আওতায় ১ হাজার ৭৪৬ কেজি চা রফতানি করেছে, যার মূল্য ছিল ৪৩ দশমিক ৯৯ হাজার ডলার। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে শ্রীলংকার চা রফতানি ছিল ৬৬৪ কেজি, মূল্য ১৬ দশমিক ৭১ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে শ্রীলংকার চা রফতানির পরিমাণ ও মূল্য দুটোই বেড়েছে।

সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের বাজারে শ্রীলংকার চায়ের উপস্থিতি এখনো খুব ছোট। শ্রীলংকার মোট চা রফতানির তুলনায় বাংলাদেশে যাওয়া পরিমাণ নগণ্য। কিন্তু এ বাণিজ্যের তাৎপর্য কেবল পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বাজারে আমদানি করা চায়ের যে একটি আলাদা জায়গা তৈরি হয়েছে, শ্রীলংকার চা সেখানে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে প্যাকেটজাত ও নির্দিষ্ট স্বাদের চায়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ব্র্যান্ডভিত্তিক চায়ের বাজার

বাংলাদেশের বাজারে শ্রীলংকার চায়ের উপস্থিতির আরেকটি দিক হলো ব্র্যান্ডভিত্তিক আমদানি। স্থানীয় বাজারে শ্রীলংকার উৎপাদিত ডিলমাহসহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত চা পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ বাংলাদেশের চা বাজারে শুধু কাঁচা বা বাল্ক চায়ের প্রতিযোগিতা নয়, উৎসদেশ ও ব্র্যান্ড পরিচিতিও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমানের মতে, শ্রীলংকা থেকে বড় আকারে চা আসছে বলে তার মনে হয় না। তবে বড় সুপারশপগুলোতে শ্রীলংকার ব্র্যান্ডের চা দেখা যায়। তার ভাষায়, শ্রীলংকার চা ভালো। মূলত দু-একটি ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চা ছোট পরিসরে বাংলাদেশে আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

চা আমদানির বিষয়টিকে আবার দুভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। একদিকে দেশের ভোক্তার চাহিদা মেটাতে আমদানি করা চা রয়েছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে চা এনে স্থানীয় চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে পুনরায় রফতানির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে শ্রীলংকা থেকে আসা চা কোন উদ্দেশ্যে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য তার কাছে নেই।

বাংলাদেশের জন্য পরিবর্তনটি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। যে দেশ একসময় নিজের উৎপাদিত চায়ের উদ্বৃত্ত বিদেশে পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত, সেই দেশ এখন অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণে বিদেশী চায়ের ওপরও নির্ভর করছে। উৎপাদন বাড়লেও রফতানি সেই অনুপাতে বাড়ছে না। বিপরীতে আমদানির জন্য সরকারি অনুমোদন অব্যাহত রয়েছে।

শ্রীলংকার সঙ্গে গুণগত ব্যবধান

শুধু বাজারের আকার নয়, বাংলাদেশের চা শিল্পের জন্য শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা ও পণ্যের বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। কামরান তানভিরুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের চায়ের সঙ্গে শ্রীলংকার চায়ের পার্থক্য তৈরিতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের চা-বাগানগুলো তুলনামূলক কম উচ্চতায় অবস্থিত। অন্যদিকে শ্রীলংকার অনেক চা-বাগান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার থেকে তিন হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। বৃষ্টিপাতের ধরনেও দুই দেশের পার্থক্য রয়েছে।

এ কারণে শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করলেই শ্রীলংকার মতো স্বাদ ও ঘ্রাণের চা তৈরি করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের চায়ে বডি ও রঙের মতো বৈশিষ্ট্য শক্তিশালী হলেও শ্রীলংকার চায়ের মতো নির্দিষ্ট ফ্লেভার তৈরি করা কঠিন। তবে দুই ধরনের চা মিশিয়ে ভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের চায়ের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শ্রীলংকার চায়ের ফ্লেভার সমন্বয় করে নতুন ধরনের ব্লেন্ড তৈরি করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এ পার্থক্য বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সম্ভাবনাও তৈরি করছে। অর্থাৎ শ্রীলংকার চাকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্য হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের চায়ের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগও রয়েছে। বিশেষ করে যেসব বাজারে নির্দিষ্ট স্বাদ, ঘ্রাণ ও মিশ্রণের চাহিদা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের পণ্য উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সীমিত সুযোগ

দক্ষিণ এশিয়ার চা বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়েও রয়েছে কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা। ভারত ও শ্রীলংকা নিজেরাই বড় চা উৎপাদক এবং একই সঙ্গে বড় ভোক্তা ও রফতানিকারক। ফলে বাংলাদেশের উৎপাদিত চায়ের জন্য এসব বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ সীমিত।

কামরান তানভিরুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের চায়ের গুণগত মান আরো উন্নত করা গেলে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে গুণগত মানের বিষয়টি শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না। মাটি, পরিবেশ, বৃষ্টিপাত ও বাগানের উচ্চতাও চায়ের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। ফলে শ্রীলংকার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে একই ধরনের চা উৎপাদনের বদলে বাংলাদেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানোই বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যেও দেশের উৎপাদন ও রফতানির ব্যবধানটি স্পষ্ট। ২০২৪ সালে ৯৩ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের বিপরীতে রফতানি হয়েছিল ২ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন কেজি। ২০২৫ সালে উৎপাদন বেড়ে ৯৪ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন কেজি হলেও রফতানি নেমে আসে ১ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন কেজিতে।

ফলে বাংলাদেশের চা শিল্পের সামনে এখন দ্বিমুখী বাস্তবতা। একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ, অন্যদিকে সীমিত উদ্বৃত্ত থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা। এ পরিস্থিতিতে শ্রীলংকার মতো চা উৎপাদক দেশের সঙ্গে শুধু আমদানি-রফতানি নয়, পণ্য উন্নয়ন, ব্লেন্ডিং ও বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বাংলাদেশের চা বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

শ্রীলংকার চায়ের বাংলাদেশে প্রবেশ তাই এখনো বড় আমদানি প্রবাহ নয়। বরং এটি বাংলাদেশের চা অর্থনীতির পরিবর্তনের একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিফলন। একসময় যে বাজার থেকে চা বিদেশে যেত, সেই বাজারেই এখন বিদেশী চায়ের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে। আর সেই জায়গায় শ্রীলংকার চায়ের উপস্থিতি বাড়া দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের পণ্যভিত্তিক নতুন একটি মাত্রাও সামনে আনছে।