পাকিস্তানে ২০০১ সালের দিকে আমি ডেপুটি হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছিলাম। দীর্ঘদিন পর এখন দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেমন তা অভিজ্ঞতার নিরিখে বিশ্লেষণ করা কঠিন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের আলোচনা সচরাচর প্রচলিত কিছু পণ্য দিয়ে শুরু হয় এবং শেষও হয় সেখানেই। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ কত, কোন দেশ কত আমদানি করছে কিংবা বাণিজ্য ঘাটতি কত—এসব পরিসংখ্যান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই পাকিস্তানের বাজারকে যথেষ্টভাবে চিনেছি?
বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা শুধু পণ্যের স্বল্পতা নয়; বরং বাজার অনুসন্ধানের অভাব। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। আমরা অনেক সময় হাতের কাছে থাকা প্রচলিত পণ্য নিয়েই রফতানির চিন্তা করি, কিন্তু যে দেশের বাজারে পণ্য পাঠাতে চাই, সেই দেশের ভোক্তার চাহিদা, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও সম্ভাব্য নতুন পণ্যের ক্ষেত্রগুলো যথেষ্টভাবে অনুসন্ধান করি না। এ নিয়ে গবেষণা, পর্যাপ্ত পরিসংখ্যান একেবারেই নেই। যতটুকু পাওয়া যায় তা টেকসই বাণিজ্য সম্প্রসারণে পর্যাপ্ত নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এ কথাটি প্রযোজ্য। বাংলাদেশে এমন বহু কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রয়েছে, যেগুলো পাকিস্তানের বাজারে নতুনভাবে পরিচিত করা সম্ভব। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানই এমন যে তারা মাংস বা আমিষজাতীয় খাবার বেশি খায়। তাদের ওখানে মৌসুমি ফল বা অন্য সবজির সমাহার কম। কিন্তু যদি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কৃষিজ পণ্যের চাহিদা সেখানে ভালোভাবেই তৈরি হতে পারে।
সম্ভাবনা থাকলেই বাজার তৈরি হয় না। একটি পণ্য বিদেশে বিক্রি করতে হলে প্রথমে সেই দেশের মানুষকে পণ্যটির সঙ্গে পরিচিত করতে হয়। পণ্যটি কী, কীভাবে ব্যবহার করা যায় এবং কেন সেটি তাদের জন্য আকর্ষণীয়—এসব বিষয়ও জানাতে হয়। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফল ও শুকনো ফল আসে। কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব কৃষিপণ্যকে পাকিস্তানের বাজারে একইভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। দেশের কালোজাম, আমড়া, সাতকরা কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক ফল শুধু কৃষিপণ্য নয়; সঠিক প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতের মাধ্যমে এগুলো রফতানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হতে পারে। এখন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ খাতে এসব পণ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির মাধ্যমে রফতানি করা সম্ভব। ফল ও কৃষিজাত পণ্য পচনশীল হলেও এখন প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটায় এটি কোনো বাধা নয়। কালোজামের জুস, কনসেনট্রেট বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা সম্ভব।
একই কথা আমড়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আমড়ার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের কিছু আমড়া স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা পরিচিতি বহন করে। কিন্তু স্থানীয় বাজারের বাইরে একটি পণ্যকে পরিচিত না করেই আন্তর্জাতিক বাজারে তার চাহিদা তৈরি করা সম্ভব নয়।
কোনো পণ্য বিদেশে রফতানি করার আগে সেটিকে আগে নিজের দেশের বাজারে পরিচিত করতে হয়। সিলেটের একটি স্থানীয় পণ্য যদি ঢাকাতেই পরিচিত না হয়, তবে সেটি পাকিস্তানের ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয়া আরো কঠিন হবে। এটা শুধু পাকিস্তান নয়, যেকোনো দেশের বাজারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এখানে শুধু কৃষিপণ্য উৎপাদন নয়, প্রয়োজন পণ্য উদ্ভাবন ও ব্যবহারভিত্তিক বাজারজাত। সিলেটে সাতকরা দিয়ে আচার তৈরি হয় এবং এর একটি বিশেষ স্বাদ রয়েছে। পাকিস্তানের খাদ্যাভ্যাসে মাংসের ব্যবহার ব্যাপক। সেই বাজারে সাতকরার স্বাদ ও ব্যবহার পরিচিত করানো গেলে নতুন একটি বাজার তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ পণ্য তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; পণ্যের ব্যবহারও বাজারের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটাই আধুনিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। অনেক সময় বাজার আগে থেকে তৈরি থাকে না; বাজার তৈরি করতে হয়।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই সুযোগ রয়েছে। আমসত্ত্ব, আচার, ফলের জুস কিংবা স্থানীয় ফলের প্রক্রিয়াজাত পণ্য পাকিস্তানের বাজারে সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একইভাবে শীতলপাটি, নকশিকাঁথা ও অন্যান্য হস্তশিল্প বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এগুলো শুধু পণ্য নয়, একটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিও। পাকিস্তানে গরমের সময় ওখানকার মানুষ সতরঞ্জি বিছিয়ে বিশ্রাম নেয়। ফলে আমাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অনেক পণ্যই তাদের চাহিদা মেটাতে পারবে। এজন্য প্রচারটা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলা আয়োজন ও তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। বিদেশের বাজার সম্পর্কে জানার জন্য ব্যবসায়ীদের সেখানে যেতে হবে, পণ্য প্রদর্শন করতে হবে এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য বাজার অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। একটি দেশ কোন পণ্য আমদানি করে, কোন পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন সীমিত, এবং কোন নতুন পণ্যের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে—এসব নিয়ে গবেষণা করতে হবে। পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তাই শুধু প্রচলিত রফতানি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নতুন ও স্বতন্ত্র পণ্য চিহ্নিত করার মধ্যেই বড় সুযোগ থাকতে পারে।
এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও ভূমিকা রয়েছে। বাণিজ্য ও সংস্কৃতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি দেশের সংস্কৃতি, খাদ্য, পোশাক ও হস্তশিল্পের সঙ্গে পরিচিতি বাড়লে সেই দেশের পণ্যের প্রতিও মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পণ্যমেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য ও ঐতিহ্যকে পাকিস্তানের মানুষের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। শীতলপাটি, নকশিকাঁথা, সিল্ক, বাটিক বা অন্যান্য হস্তশিল্পের প্রদর্শনী শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নয়; এগুলো সম্ভাব্য বাজার তৈরিরও একটি মাধ্যম।
বাংলাদেশের হাতে পণ্য আছে। রয়েছে বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু এসব পণ্যের সবগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছেছে—এ কথা বলা যাবে না। পাকিস্তানের বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে হলে তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাজার অনুসন্ধান। কোন পণ্যের সম্ভাবনা রয়েছে, কোন পণ্য পাকিস্তানে উৎপাদিত হয় না বা সীমিত পরিমাণে হয়, কোন পণ্য বাংলাদেশের বিশেষত্ব বহন করে—এসব চিহ্নিত করতে হবে। এরপর প্রয়োজন পণ্যের মানোন্নয়ন, প্রক্রিয়াজাত, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং ও পরিকল্পিত প্রচার।
সবশেষে প্রয়োজন একটি মানসিকতার পরিবর্তন। আমরা শুধু যা উৎপাদন করি, তা বিক্রি করার চেষ্টা করলেই হবে না; বরং বাজার কী চায় এবং বাজারে নতুন কী চাহিদা তৈরি করা যায়, সেটিও ভাবতে হবে। পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের বড় সম্ভাবনা হয়তো প্রচলিত পণ্যের তালিকায় নেই। সেই সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশের কোনো স্থানীয় ফলের জুসে, কোনো আঞ্চলিক আচারে কিংবা শত বছরের পুরনো কোনো হস্তশিল্পে। এজন্যই বাজারটিকে নতুন চোখে দেখা দরকার।










