গাড়ি আমদানি করে বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেছিল নিটল মোটরস লিমিটেড। এরপর বিদেশী গাড়ি নির্মাতার পরিবেশক হওয়া, দেশে গাড়ি সংযোজন, বাস-ট্রাকের বডি তৈরি এবং বিক্রয়োত্তর সেবা দেয়ার মাধ্যমে অটোমোবাইল ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চার চাকার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মোটরসাইকেল উৎপাদনও। সময়ের সঙ্গে গাড়ির ব্যবসার বাইরে আবাসন, নির্মাণ, সিমেন্ট, বীমা, কাগজ, চিনি ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে নিটল-নিলয় গ্রুপ। ১৯৮২ সালে শুরু হওয়া এ ব্যবসা সাড়ে চার দশকে আমদানি ও বিপণন থেকে স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদনের দিকে এগিয়েছে।
নিটল মোটরসের ব্যবসার এ পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতের অটোমোবাইল শিল্পেরও একটি দীর্ঘ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের টাটা মোটরস ও হিরো মোটোকর্পের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মাধ্যমে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড এবং উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাজার যুক্ত হয়েছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুধু তৈরি পণ্য আমদানিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে।
নিটল-নিলয় গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ড ও জাপান থেকে গাড়ি আমদানির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে হিন্দুস্তান মোটরস ও আইশারের ডিলারশিপ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ১৯৮৮ সালে ভারতের টাটা মোটরসের গাড়ির আমদানিকারক ও পরিবেশক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে নিটল মোটরস। টাটা মোটরসের সঙ্গে এ ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রায় চার দশক ধরে চলছে।
সেই সময়ে বাংলাদেশের গাড়ির বাজার ছিল মূলত আমদানিনির্ভর। গাড়ি এনে বিক্রি করাই ছিল ব্যবসার প্রধান ধরন। তবে ১৯৯১ সালে নিটল-নিলয়ের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। ওই বছর নিটা কোম্পানির মাধ্যমে টাটা ট্রাক, বাস ও মিনিবাসের চেসিস দেশে এনে সংযোজন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে সম্পূর্ণ তৈরি গাড়ি আমদানির পাশাপাশি দেশে গাড়ি সংযোজনের কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত বাজারে গাড়ি সরবরাহের পাশাপাশি অটোমোবাইল শিল্পে স্থানীয় সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। পরের বছর টাটা গাড়ির বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য দেশজুড়ে সেবা কাঠামো গড়ে তোলা হয়। ফলে গাড়ি বিক্রির সঙ্গে চেসিস সংযোজন, বডি তৈরি, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো কার্যক্রমও যুক্ত হয়।
স্থানীয়ভাবে গাড়ি সংযোজনের পরিধি বাড়ানোর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে যশোরের কারখানায় টাটা পিকআপ সংযোজনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এ প্রকল্পে কয়েক শ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল। ভবিষ্যতে চেসিস, বডি, চাকা ও ব্রেকের মতো কিছু যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়। পরে কভিড-১৯ মহামারীর কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। তবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অটোমোবাইল শিল্পবিষয়ক এক প্রতিবেদনে যশোরের কারখানায় টাটা পিকআপ সংযোজন এবং মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিটের সক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চার চাকার পাশাপাশি দুই চাকার যানবাহন উৎপাদনেও যুক্ত হয় নিটল-নিলয়। ২০১৪ সালে ভারতের হিরো মোটোকর্পের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এ উদ্যোগে হিরো মোটোকর্পের অংশীদারত্ব ছিল ৫৫ শতাংশ এবং নিটল-নিলয়ের ৪৫ শতাংশ। যশোরে স্থাপিত কারখানাটি ছিল সে সময় ভারতের বাইরে হিরো মোটোকর্পের প্রথম উৎপাদন কারখানা। এর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ লাখ ৫০ হাজার মোটরসাইকেল।
মোটরসাইকেল উৎপাদনের পাশাপাশি বিপণন ও বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। হিরো মোটোকর্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাদের ৫০০টির বেশি কাস্টমার টাচপয়েন্ট রয়েছে।
অটোমোবাইলের বাইরে বিভিন্ন সময় ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে নিটল-নিলয় গ্রুপ। আবাসন, নির্মাণ, সিমেন্ট, বীমা, পরিবহন, কাগজ, চিনি ও ইলেকট্রনিকস খাতে বিনিয়োগ করেছে তারা। বর্তমানে নিটল ইলেকট্রনিকসের মাধ্যমে টেলিভিশন, ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ, এসি ও মাইক্রোওয়েভ ওভেনসহ বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলায় তাদের ১১০টির বেশি পরিবেশক বা ডিলার রয়েছে।
গ্রুপটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি মার্কিন ডলার এবং বার্ষিক লেনদেন প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ১৭০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিটল-নিলয়ের অটোমোবাইল ব্যবসার সঙ্গে ভারতের শিল্প খাতের যোগাযোগ মূলত টাটা মোটরস ও হিরো মোটোকর্পকে ঘিরে। টাটা মোটরসের সঙ্গে প্রায় চার দশকের আমদানি ও পরিবেশক সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে দেশে গাড়ি সংযোজনের পর্যায়ে গেছে। আর হিরো মোটোকর্পের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতীয় ব্র্যান্ড ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের মোটরসাইকেল উৎপাদন খাতে যুক্ত হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ফলে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে শুধু তৈরি গাড়ি ও মোটরসাইকেল আমদানিই নয়, স্থানীয় সংযোজন, উৎপাদন, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বিক্রয়োত্তর সেবার মতো কার্যক্রমও যুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যে শিল্পভিত্তিক এ ধরনের সহযোগিতা ভবিষ্যতে সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরির সুযোগও বাড়াতে পারে।
১৯৮২ সালে গাড়ি আমদানির মাধ্যমে শুরু হওয়া নিটল-নিলয়ের ব্যবসা তাই সময়ের সঙ্গে কয়েকটি ধাপ পেরিয়েছে—আমদানি, পরিবেশক ব্যবসা, স্থানীয় সংযোজন, উৎপাদন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার যোগাযোগও তৈরি হয়েছে।










