সাধারণ টি-শার্ট, প্যান্ট বা অন্যান্য মৌলিক পোশাকের পাশাপাশি এখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য প্রশিক্ষণ, দৌড়, শরীরচর্চা ও দৈনন্দিন সক্রিয় ব্যবহারের পোশাক তৈরি করছে দেশের কারখানাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের নাইকি ও আন্ডার আর্মারের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের কারখানার উপস্থিতি এ পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পোশাকে শুধু পোশাক তৈরির সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। কাপড়ের গুণগত বৈশিষ্ট্য, সেলাইয়ের নিখুঁততা, স্থায়িত্ব, মাপ, নকশা, আরাম এবং নির্দিষ্ট ব্যবহারের উপযোগিতা নিশ্চিত করতে হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনার মানদণ্ডও পূরণ করতে হয়। ফলে এ বাজারে প্রবেশ বাংলাদেশের কারখানাগুলোর সক্ষমতার একটি উন্নত স্তরের প্রতিফলন।

বাজারটির আর্থিক আকারও বেশ বড়। নাইকি ২০২৬ অর্থবছরে ৪ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে নাইকি ব্র্যান্ডের আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ৫২০ কোটি ডলার। অন্যদিকে আন্ডার আর্মারের ২০২৬ অর্থবছরের বিক্রি ছিল প্রায় ৪৯৭ কোটি ডলার। বৈশ্বিক বাজারে এ দুই ব্র্যান্ডের বিশাল ব্যবসা তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে জায়গা করে নেয়ার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।

বাংলাদেশের সঙ্গে নাইকির সরবরাহসংযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব উৎপাদন মানচিত্রে। নাইকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য তৈরিতে যুক্ত স্বাধীন কারখানা ও উপকরণ সরবরাহকারীদের তথ্য প্রকাশ করে। সেখানে কারখানার অবস্থান, উৎপাদিত পণ্যের ধরন এবং শ্রমিক সংখ্যার মতো তথ্যও রয়েছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলোও এ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ।

তবে নাইকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান সরবরাহকারী কারখানার সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। বাংলাদেশের খাতসংশ্লিষ্টরাও দিতে পারছেন না স্পষ্ট কোনো ধারণা।

আন্ডার আর্মারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী সরবরাহকারীদের পরিচয় আরো স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের প্রকাশিত সরবরাহকারী তালিকায় বাংলাদেশ থেকে অ্যামিগো বাংলাদেশ লিমিটেড ও আরএসবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেডকে পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যামিগো বাংলাদেশের কারখানা গাজীপুরের কালীগঞ্জে এবং আরএসবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় অবস্থিত। দুই কারখানারই কর্মীসংখ্যা এক হাজার থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পোশাক তৈরির সক্ষমতা অবশ্য শুধু নাইকি বা আন্ডার আর্মারের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের পোশাক কারখানাগুলো ক্রমেই টি-শার্ট, শর্টস, জ্যাকেট, ট্র্যাকস্যুট, প্রশিক্ষণ ও শরীরচর্চার পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে নিট পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এ ধরনের পণ্যের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।

ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের আরেকটি সুবিধা হলো বড় পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো একই নকশা ও মান বজায় রেখে বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রুত সরবরাহ করতে চায়। বাংলাদেশের বড় কারখানা ও সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থাগুলো এ ধরনের চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি করে। তবে একই সাথে ছোট লট, দ্রুত নকশা পরিবর্তন ও স্বল্প সময়ের মধ্যে নমুনা তৈরির সক্ষমতাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এ বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন সরবরাহকারীর কর্মপরিবেশ, শ্রমিক অধিকার, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা যাচাই করে। নাইকির সরবরাহ শৃঙ্খলসংক্রান্ত নীতিতেও এসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারখানাগুলোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের উপস্থিতি একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নাইকি ও আন্ডার আর্মারের মতো ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরির সক্ষমতা দেখায়, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা এখন শুধু মৌলিক পণ্যের পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে না। পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, প্রযুক্তি, দ্রুত সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতাও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ফলে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন খাত নয়; বরং বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতাকে আরো মূল্য সংযোজনকারী পণ্যে কাজে লাগানোর একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। নাইকি ও আন্ডার আর্মারের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলে দেশের কারখানার অংশগ্রহণ সেই সম্ভাবনারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।