বিশেষ করে ডেনিম পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এসেছিল গ্রুপটির প্রথম ক্রয়াদেশ। ২০০৭ সালে ডেনিম ফ্যাব্রিক ও ডেনিম পোশাক নিয়ে কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম ক্রয়াদেশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পরে দ্বিতীয় ক্রয়াদেশ আসে ইউরোপ থেকে। এভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে ডেনিম নিয়ে হা-মীমের যাত্রা শুরু।

প্রায় ২০ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাতে ডেনিম নিয়ে কাজ করছে হা-মীম গ্রুপ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বছরে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে হা-মীমের ক্রেতা তালিকায় রয়েছে আমেরিকান ঈগল, গ্যাপ, জেসিপেনি, জারা, নেক্সট, এইচঅ্যান্ডএম, এমঅ্যান্ডএস, এলডিআই, ইউনিক্লো, কিয়াবি ও লেফটিসের মতো ব্র্যান্ড। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ভিএফ, অ্যাম্বারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ, কোহলস, পিভিএইচ, এসপিরিট, অশকোশ, টমি হিলফিগার, লুইস রাফায়েল, রেইটম্যান্স, নাপাপিজরি, টশ টেইলর, টিসিপি, আসমারা, কন্তুর ও জাস্টিস।

ডেনিম ফ্যাব্রিক ও পোশাকের পাশাপাশি হা-মীম গ্রুপের রয়েছে নিজস্ব ওভেন টেক্সটাইলস ও সুতা উৎপাদন সক্ষমতা। দেশে উৎপাদিত মোট ডেনিম ফ্যাব্রিকের মধ্যে গ্রুপটির হিস্যা উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন করা ফ্যাব্রিক যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের পোশাক তৈরিতে সরবরাহ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে হা-মীমের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে এ কে আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হা-মীম গ্রুপেরও বছরে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি হয়, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের একটি বাস্তব প্রতিফলন।’

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কেবল রফতানি-আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন এ কে আজাদ। তার মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান বাস্তবতায় এ বাজারসহ বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রধান অগ্রাধিকার জ্বালানি নিশ্চয়তা হওয়া উচিত।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পারস্পরিক আস্থা, পূর্বানুমেয় বাণিজ্যনীতি এবং ধারাবাহিক সংলাপকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে হা-মীম গ্রুপ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানীকৃত তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত শুল্ক সুবিধা কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মনে করেন এ কে আজাদ। এতে বাংলাদেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রফতানিও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি মনে করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়াদেশ দিয়ে শুরু ডেনিমের যাত্রা

২০০৭ সালে হা-মীম গ্রুপের ডেনিম ফ্যাব্রিক ও ডেনিম পোশাকের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম ক্রয়াদেশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পরে ইউরোপ থেকে আসে দ্বিতীয় ক্রয়াদেশ। শুরুতে ডেনিম কারখানাটির উৎপাদন ছিল সাত লাখ গজ। তিন বছর পর ১৫ লাখ গজ এবং ছয় বছর পর ৩০ লাখ গজ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করে কারখানাটি। বর্তমানে সক্ষমতা রয়েছে ৫০ লাখ গজ।

বছরে প্রায় ছয় কোটি গজ ডেনিম ফ্যাব্রিক উৎপাদন করে হা-মীম। এছাড়া টেক্সটাইলসের উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় তিন কোটি গজ এবং সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা বছরে প্রায় ৩২ হাজার ৪০০ টন। গ্রুপটি নিজেদের উৎপাদিত সুতার প্রায় ৫০ শতাংশ নিজেদের কাপড় তৈরিতে ব্যবহার করে।

একক কারখানা ইউনিট হিসেবে বিজিএমইএর সদস্যদের মধ্যে হা-মীম গ্রুপের রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড সবচেয়ে বড় রফতানিকারক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩০ কোটি ২৩ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। এর আগে ২০২৩ সালেও একক ইউনিট হিসেবে দেশের শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল রিফাত গার্মেন্টস।

২৬ কারখানায় ৪০০-এর বেশি প্রডাকশন লাইন

১৯৮৪ সালে এ কে আজাদের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়। এরপর গড়ে ওঠা হা-মীম গ্রুপে একে একে যুক্ত হয়েছে ২৬টি কারখানা। ওভেন পোশাক পণ্য প্রস্তুতকারক কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্টিস্টিক ডিজাইন লিমিটেড, হা-মীম অ্যাপারেলস লিমিটেড, দ্যাটস ইট গার্মেন্টস লিমিটেড, দ্যাটস ইট স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেড, দ্যাটস ইট ফ্যাশন লিমিটেড, এক্সপ্লোর গার্মেন্টস লিমিটেড, ক্যাজুয়াল গার্মেন্টস লিমিটেড, অ্যাপারেল গ্যালারি লিমিটেড, রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড, ক্রিয়েটিভ কালেকশন লিমিটেড, নেক্সট কালেকশনস লিমিটেড ও হা-মীম ডিজাইন লিমিটেড। রিফাত গার্মেন্টসের যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটি বিগত কয়েক বছরে জাতীয় রফতানি ট্রফি অর্জন করেছে।

আশুলিয়া, টঙ্গী, টাঙ্গাইল ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে হা-মীম গ্রুপের কারখানাগুলো অবস্থিত। এসব কারখানার সক্ষমতা দিনপ্রতি তিন লাখ পিস। গ্রুপের আওতায় ২৬টি পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানে প্রোডাকশন লাইনের সংখ্যা ৪০০ এর বেশি। প্রতি মাসে উৎপাদন সক্ষমতা ১ কোটি পিস। কর্মকর্তা ও শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ।

ট্রাউজার, জিনস, কার্গো, স্কার্ট, শার্ট, জ্যাকেট ও লেডিস পোশাক তৈরিতে অটো ট্রিমার ও অত্যাধুনিক মেশিন ব্যবহার করা হয়। কাটিংয়ের ক্ষেত্রে অটো কাটার মেশিন ব্যবহার করা হয়। নিজস্ব ফ্যাব্রিক চাহিদার ৫০ শতাংশ ডেনিম ও ৫০ শতাংশ নন-ডেনিম পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি।

হা-মীম গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ডেনিমের একটি ক্রয়াদেশ দিয়ে। সেই যাত্রা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে পোশাকের বিভিন্ন পণ্য ও ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বছরে প্রায় ৬৫ কোটি ডলারের রফতানি সেই দীর্ঘ পথচলারই প্রতিফলন।