বৈশ্বিক ব্যবসা ও শীর্ষস্থানীয় মার্কিন করপোরেশনগুলোর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্ব ট্রান্সকমের এ বিকাশের পথকে সমৃদ্ধ করেছে।
১৯৯০ সালে ট্রান্সকম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করে। সে বছর প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি স্মিথক্লাইন অ্যান্ড ফ্রেঞ্চের (এসকে অ্যান্ড এফ) বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণ করে। এটি ছিল কোনো বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের একটি বহুজাতিক কোম্পানির কার্যক্রম অধিগ্রহণের প্রথম ঘটনা। অধিগ্রহণের পর ট্রান্সকম আন্তর্জাতিক মান, নৈতিক মূল্যবোধ ও বৈশ্বিক সর্বোত্তম চর্চা বজায় রাখার অঙ্গীকার অব্যাহত রাখে। এ অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই এসকে অ্যান্ড এফ রূপান্তরিত হয় এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর অন্যতম।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসকেএফ উন্নত উৎপাদন, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক এবং বাণিজ্যিক সক্ষমতা শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি আস্থাভাজন ব্র্যান্ডেড জেনেরিক ওষুধের একটি শক্তিশালী পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছে এবং যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএমপি, অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ, ব্রাজিলের আনভিসা এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর মতো কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন অর্জন করেছে।
এসকেএফের মার্কিন বাজারে প্রবেশ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির ইনজেক্টেবল ওষুধ উৎপাদন কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর অনুমোদন লাভ করে, যা বাংলাদেশে কোনো ইনজেক্টেবল উৎপাদন কারখানার জন্য প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র এমন অনুমোদন। ফলে এসকেএফ বিশ্বের অন্যতম কঠোর ওষুধ বাজার যুক্তরাষ্ট্রে ইনজেক্টেবল ওষুধ রফতানির সুযোগ পায়। এরই মধ্যে এসকেএফ যুক্তরাষ্ট্রে ইনজেক্টেবল পণ্য রফতানি করছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির ওরাল-সলিড উৎপাদন কারখানাও যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর অনুমোদন পেয়েছিল, যা প্রমাণ করে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে সক্ষম। জটিল ইনজেক্টেবল ও প্রযুক্তিনির্ভর ওরাল-সলিড ওষুধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসকেএফ তার বিশেষায়িত পণ্যভাণ্ডার ও বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব আরো বিস্তৃত করে চলেছে, যা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ওষুধ শিল্পের সক্ষমতাকে তুলে ধরে।
পেপসিকোর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের মধ্য দিয়েও ট্রান্সকমের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক যাত্রা সমৃদ্ধ হয়েছে। ২০০০ সালে এ অংশীদারত্বের সূচনা হয়, যখন ট্রান্সকম বেভারেজেস বাংলাদেশে পেপসিকোর বেভারেজ ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ কোমলপানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যা পেপসি, সেভেন আপ, মিরিন্ডা, স্লাইস, মাউন্টেন ডিউ ও অ্যাকোয়াফিনা উৎপাদন করে। ট্রান্সকম বেভারেজেস একাধিক গুণগত উৎকর্ষ পুরস্কার এবং ধারাবাহিকভাবে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বেকিং ইন্টারন্যাশনালের (এআইবিআই) গোল্ড স্কোর অর্জন করেছে, যা এর শক্তিশালী উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতিফলন। এছাড়া বিশ্বের শত শত বোতলজাতকরণ অংশীদারের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি দুবার পেপসিকোর ‘ইন্টারন্যাশনাল বটলার অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছে।
২০১২ সালে অংশীদারত্বটি স্ন্যাকস খাতেও সম্প্রসারণ হয়, যখন ট্রান্সকম কনজিউমার প্রডাক্টস বিশ্বব্যাপী পেপসিকোর প্রথম স্ন্যাকস ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বগুড়ায় অবস্থিত অত্যাধুনিক কারখানায় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের এক নম্বর স্ন্যাকস ব্র্যান্ড লে’জ উৎপাদন করে। পেপসিকোর বিশেষভাবে উন্নত আলুর জাত চাষ থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় লে’জের বিভিন্ন স্বাদ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন পর্যন্ত—উদ্যোগটি খামার থেকে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কুরকুরে উৎপাদন এবং কোয়াকার ওটস প্যাকেজিং করে। ট্রান্সকম কনজিউমার প্রডাক্টসের কারখানাটি ধারাবাহিকভাবে আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বেকিংয়ের ৯৩০-৯৫০+ উচ্চ স্কোর অর্জন করেছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও মানের ক্ষেত্রে শক্তিশালী মানদণ্ডের প্রতিফলন।
ট্রান্সকম ফুডস বাংলাদেশে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইয়াম! ব্র্যান্ডসের কেএফসি ও পিৎজা হাট নিয়ে এসেছে। ২০০৩ সালে পিৎজা হাট এবং ২০০৬ সালে কেএফসি চালুর মাধ্যমে ট্রান্সকম দেশের আধুনিক দ্রুতসেবা রেস্তোরাঁ শিল্পের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। বর্তমানে ১০টিরও বেশি শহরে এ দুই ব্র্যান্ডের ৭১টি রেস্তোরাঁ পরিচালিত হচ্ছে, যা ট্রান্সকম ফুডসকে দেশের বৃহত্তম রেস্তোরাঁ কোম্পানিতে পরিণত করেছে।
আগামীর দিকে তাকিয়ে ট্রান্সকম ওষুধ, উন্নত উৎপাদন, ভোক্তাপণ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা দেখছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরো গভীর করতে নতুন মার্কিন অংশীদারত্ব ও যৌথ উদ্যোগের সুযোগ অনুসন্ধানেও প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহী।
এ পুরো যাত্রার ভিত্তিতে রয়েছে সততা ও নৈতিকতা। ব্যবসায় সাফল্য অর্জনের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, কিন্তু শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মার্কিন শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ট্রান্সকমের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়—আস্থা, মান ও নৈতিক মূল্যবোধই পারে টেকসই বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে।
সিমিন রহমান: গ্রুপ সিইও, ট্রান্সকম গ্রুপ










