দেশের গ্লাস শিল্পের অভ্যন্তরীণ আকারটা কেমন? এ খাতে আমদানি-রফতানি কত?
গ্লাস আমদানি প্রায় শূন্যের কোটায় কারণ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও রফতানি সামান্য পরিমাণ হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। মাসিক অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা ২৫-৩০ হাজার টন। বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার টনের বেশি। কোম্পানি ও গ্লাসের মান ভেদে, ধরনভেদে দামের ভিন্নতা আছে। দেশের বাজারে বার্ষিক গ্লাস বিক্রি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। আরো কয়েকটি কোম্পানি উৎপাদনে আসার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। তারা এলে উৎপাদন আরো বাড়বে। সেটি চাহিদার থেকে অতিরিক্তই হবে বলা যায়। যেটি আন্তর্জাতিক বাজার ধরার ক্ষেত্রে একটি সুযোগ হিসেবেই আমি দেখি। এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান পাঁচ-সাত হাজার আর পরোক্ষভাবে আছে আরো ১৫ হাজারের মতো। সব মিলিয়ে ২০ হাজার বা তার কিছু বেশি।
বর্তমানে বাংলাদেশ গ্লাস রফতানিতে কতটা সক্ষম?
আমরা ভারতে গ্লাস রফতানি করি। সেটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানির পথ তৈরি হচ্ছে। কাজ ও ব্যবহারের ধরনভেদে গ্লাসে বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে ভিন্ন গ্রেডে উৎপাদন করতে হয়। যেমন বর্তমানে কমার্শিয়াল ভবনগুলোয় গ্লাস ব্যবহার হয়, কনস্ট্রাকশন খাতেও গ্লাসের বহু ব্যবহার রয়েছে। ডাবল গ্লেজড গ্লাস, সোলার গ্লাস, লেমিনেটেডসহ বহু রকমের গ্লাস রয়েছে। ফার্নিচার খাতে টেবিল টপ থেকে শুরু করে দরজায় ব্যবহারসহ বিভিন্নভাবে ব্যবহার হয়। ইন্টেরিয়রের ক্ষেত্রেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নামি-দামি কোম্পানি যেমন সেইন্ট-গোবেইন (ফ্রান্স), আসাহি গ্লাস কোম্পানি (জাপান) সমমানের গ্লাস তৈরি করে। নাসির ফ্লোট গ্লাসকে ভারতে জাপানের আসাহি গ্লাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এভাবে বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্লাস আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদর পাচ্ছে। ফলে আমরা দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা তৈরি করেছি।
গ্লাস শিল্পের প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জগুলো কী?
উৎপাদনের সঙ্গে অনেক বড় কর্মযোগ্য জড়িত। গ্লাস শিল্পের অন্যতম একটি কাঁচামাল হচ্ছে বালি। এটি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। বালি ছাড়াও যেসব কাঁচামাল রয়েছে সেসব আমদানি করা হয়। উৎপাদনের আরো একটি যোগ্য উপাদান হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ককর থাকে, এ সবকিছু মিলিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর সঙ্গে রয়েছে দক্ষ শ্রমিক। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পর্যাপ্ত কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া। সেটি আমদানি হোক বা স্থানীয় হোক। এছাড়া অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ জ্বালানির সহজলভ্যতা। গ্যাসের প্রেসার ঠিকভাবে পাওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ। এ ইন্ডাস্ট্রিতে গ্যাসের একটা সংকট দীর্ঘদিনের। সঠিক মাত্রায় গ্যাসের চাপ থাকে না অনেক সময়। তখন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। যেমন ডিজেল, ফার্নেস অয়েল। কারখানা একবার চালু করলে ১০-১২ বছর এটি নন-স্টপ চালাতে হয়। বিকল্প জ্বালানি আগে থেকেই মজুদ রাখতে হয়। না হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, মান খারাপ হয়। এসব কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়।
কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা চ্যালেঞ্জ দেখেন?
আমাদের এখানে শুধু বালিটাই পাওয়া যায়। অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে ভ্যাট, ট্যাক্স, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) দিয়েই আমদানি করতে হয়। ফলে এ জায়গায় আমরা যদি কিছু নীতি সহায়তা পাই এবং আমদানি করের ক্ষেত্রে আরো অন্তত ৫ শতাংশ কমানো হয় তাহলে গ্লাস শিল্প প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে সহায়ক হবে।
রফতানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী?
রফতানির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টি। সেখানে আমাদের ফ্লো গ্লাসের গুণগতমান সন্তোষজনক। এটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মতোই বা কাছাকাছি। আমাদের দেশে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে যে খরচ হয়, সেটি অনেক বেশি। আবার সুদের হার প্রায়ই ওঠানামা করে। এটিও একটি সমস্যা। যেখানে চীনের বাজারে কস্ট অব ফান্ড ৫ শতাংশ, সেখানে আমাদের ১৩-১৪ শতাংশ। কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি দিতে হচ্ছে। এ কারণে পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। অন্যদিকে রফতানি প্রণোদনা ১৫ থেকে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আমরা চাই এটি আগের অবস্থায় অর্থাৎ ১৫ শতাংশ পুনরায় বহাল করা হোক।
বেশকিছু ইন্ডাস্ট্রির ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেটেড প্রডাক্ট হিসেবে গ্লাসের প্রয়োজন পড়ে। দেশীয় কোম্পানিগুলো কি সেই জায়গায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে?
এখানে সরকারের নীতিগত কিছু বিষয় পরিবর্তন করা দরকার। বেশকিছু পণ্য উৎপাদনে গ্লাসের ব্যবহার রয়েছে। এসব পণ্য দেশেই উৎপাদন হয়। ফলে এ পণ্যগুলো তৈরিতে দেশে উৎপাদিত গ্লাস ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া উচিত। কিন্তু বিদ্যমান অবস্থায় গ্লাসকে ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেটেড প্রডাক্ট হিসেবে ব্যবহার করে, এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে গ্লাস আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো দেশীয় গ্লাস না নিয়ে বিদেশী গ্লাস নিচ্ছে। অথচ দেশীয় ফ্লোট গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান ও জোগানের সক্ষমতা রয়েছে। এখন অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেটেডের জন্য গ্লাস আমদানি করায় রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে। অন্যদিকে দেশের বাজারে পরোক্ষভাবে বিদেশী গ্লাস কোম্পানিগুলো আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে। যেমন ফ্রিজ, ইলেকট্রনিক বিভিন্ন পণ্য, ফার্নিচারে ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেটেড হিসেবে গ্লাসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
আমদানি বা রফতানির ক্ষেত্রে কাস্টমসে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার কথা শোনা যায়। সেগুলোর সমাধান কী?
সম্প্রতি কাস্টমসে একটি নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানীকৃত কনটেইনারগুলো প্রথম চারদিন বিনামূল্যে রাখা যায়। এ চারদিন পর প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এ অতিরিক্ত ফি চার গুণ বাড়ানো হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, আমদানিকৃত মালামালের প্রয়োজনীয় শিপিং ডকুমেন্টস বিলম্বে পাওয়া, বিভিন্ন রকমের এনওসি সংগ্রহ করা ও কাস্টমসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে (মালামাল বন্দরে পৌঁছানোর পরও) কখনো কখনো পাঁচ থেকে সাতদিন বা আরো অধিক সময় লেগে যায়। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এবারের বাজেটে কী ধরনের সহায়তা চান?
আমাদের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে যে জটিলতাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো নিরসনে সরকার উদ্যোগী হবে এমনটা প্রত্যাশা। গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট হওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে উৎপাদনকারীদের ভ্যাট ১০ শতাংশ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। গ্যাসের সহজলভ্যতা ও দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে পুনঃপর্যালোচনা করা প্রয়োজন। রফতানির ক্ষেত্রে প্রণোদনাটা আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। আমাদের এখানে শিপিং কস্ট অনেক বেশি যেকোনো দেশের তুলনায়। সেখানে নজর দেয়া দরকার সরকারের, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে।










