দেশের বাজারে দুই দশকের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্মার্ট টেকনোলজিস। স্মার্টের এ যাত্রাপথের গল্প শুনতে চাই।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পরই কম্পিউটারের প্রতি আমার মুগ্ধতা তৈরি হয়। সে সময় গুলশানের একটি দোকানে কম্পিউটার গেম খেলতাম। একই সময়ে আমার বড় ভাই (স্মার্ট টেকনোলজিসের চেয়ারম্যান) সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন কম্পিউটার সায়েন্স পড়তে। সেখান থেকেই তিনি কম্পিউটার সম্পর্কে বলতেন। তখনই আমার মনে হলো কম্পিউটার নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করবে এবং কম্পিউটার বিষয়ে যারা শিখবে, তারাই ভবিষ্যতে পৃথিবীটাকে এগিয়ে নেবে। এভাবেই কম্পিউটারের প্রতি আমার ঝোঁক তৈরি হয়। আর ব্যবসার যাত্রা শুরু হয় বড় ভাইয়ের হাত ধরে। তিনিই সিঙ্গাপুরে নিজের কম্পিউটার ব্যবসা শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে আমাকে কম্পিউটারের ব্যবসা বিষয়ে উৎসাহ দিতে থাকেন। স্নাতকোত্তর করার সময় আমি একটি কম্পিউটার কোম্পানিতে চাকরি শুরু করি। কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে আমার বেশ ভালো লাগত। তখন আমি এবং আমার বড় ভাই মিলে পরিকল্পনা করলাম, কম্পিউটারের ব্যবসা করার এখনই সময়। এরপর ১৯৯৮ সালে আমরা ব্যবসা শুরু করি।
আপনাদের ব্যবসা শুরু হয়েছিল পরিবেশক হওয়ার মাধ্যমে। এখন আপনারা উৎপাদনে যাচ্ছেন। হাইটেক পার্কেও আপনারা বিনিয়োগ করছেন। পরিবর্তনের এ সময়ে কোন কোন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন?
ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রথমেই সক্ষমতা তৈরি করা দরকার। বলতে পারি, আমাদের সে সক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলও আছে। আমাদের স্থানীয় বাজারও প্রস্তুত। তাহলে কেন আমরা নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করব না? সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা উৎপাদনের দিকে যাচ্ছি। চট্টগ্রামে আমাদের একটি কারখানা আছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আরেকটি কারখানা নির্মাণ করছি। আশা করছি, ছয়-সাত মাসের মধ্যে আমরা সেখানে উৎপাদন শুরু করতে পারব।
আমাদের হাইটেক পার্কগুলোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আসছে না। বিনিয়োগ না আসার পেছনে আপনি কী কারণ দেখছেন?
বিনিয়োগ করে কেউ যদি মুনাফা ঘরে তুলতে না পারে, তাহলে সে বিনিয়োগ করবে কেন? এখানে রাজনীতি থেকে শুরু করে আমলাতান্ত্রিক বিভিন্ন জটিলতা আছে। বিদেশী বিনিয়োগ তখনই আসবে, যখন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে এসে কম দামে পণ্য উৎপাদন করে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। কিন্তু সে যদি দেখে যে শুধু পলিসি পূরণ করতে গিয়েই তার বিনিয়োগের অংশ শেষ হয়ে যায়, তাহলে কেন সে এখানে বিনিয়োগ করবে? পাশের দেশ ভারতে রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা চলে। প্রয়োজনে আমাদের এখানে শিল্পভেদে আলাদা পলিসি নির্ধারণ করা যেতে পারে। আমার মনে হয়, তাহলেই এখানে বিনিয়োগ আসবে।
আমাদের মোবাইল ফোন উৎপাদকরা বলছেন, অবৈধ আমদানির কারণে তারা মার্কেটে টিকতে পারছেন না। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও এটি বন্ধ করতে পারছে না। সরকারের আসলে কী করা উচিত?
সরকার বলছে, তারা অবৈধ আমদানি বন্ধে অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা আসলে কতটুকু চেষ্টা করছে, সেটা একটা প্রশ্ন। দেশে বৈধভাবে যেসব মোবাইল ফোন আসছে, সেগুলোর আইএমইআই কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়। সরকার চাইলেই সিস্টেমটাকে আরেকটু আপডেট করে অবৈধ মোবাইল ফোনের আইএমইআই ব্লক করে দিতে পারে। অনেক দেশেই এ প্রক্রিয়া আছে। সবগুলো কোম্পানিই এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশে অনেকগুলো মোবাইল কারখানা আছে। তাদের ব্যবসায়ও বড় আকারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যারা আইনকানুন মেনে কাজ করবে, তারা যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সরকারের রাজস্বও দুর্বল হয়ে পড়বে। সরকার অবৈধ ফোন আমদানি বন্ধ না করায় মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। আমি মনে করি, এখানে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। এ বিষয়ে তাদের কঠোর একটি পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
দেশে আইটি ও আইটিইএস (সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা) খাতে কর অব্যাহতির জন্য সংশ্লিষ্টরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের কর ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
গত দুই-তিন বছর আইটি ও আইটিইএসকে করমুক্ত রাখার জন্য আন্দোলন করা হচ্ছে। কেন প্রতি বছর এটা নিয়ে আন্দোলন করতে হবে? ২০৩৫ সালের আগে তো এ ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনাই হওয়া উচিত না। এটা তো একটা প্রজন্মগত বিষয়, তিন-চার বছরের পলিসিগত কোনো বিষয় নয়।
আমাদের কাছে তো আইটি রফতানি করার মতো কোনো কাঁচামাল নেই। হার্ডওয়্যার রফতানি করে খুব একটা মুনাফা করা যাবে না। মুনাফা হবেই পরিষেবা রফতানির মাধ্যমে। আমাদের পরিষেবা খাত যদি না দাঁড়ায়, তাহলে এখানে বড় কোনো কোম্পানি তৈরি হবে না। করমুক্ত সুবিধা যদি একটা প্রজন্মকে দেয়া না হয়, তাহলে রাজস্ব খাতের বৈচিত্র্যায়ণ সম্ভব নয়।
আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ আইটি কোম্পানি হতে চাই। ১০ বছরে বৈশ্বিক বাজারে একটা ভালো পদচিহ্ন রাখতে চাই এবং ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় আইটি কোম্পানি হতে চাই।










