ইলেকট্রনিকস খাতের বাজার দিন দিন বাড়ছে। উৎপাদক এবং সরবরাহকারীদের মধ্যে আপনারা বড় জায়গা দখল করতে পেরেছেন। অবস্থান ধরে রাখা কীভাবে সম্ভব হলো?

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইলেকট্রনিকস শিল্প খাতে বিপুল অগ্রগতি হয়েছে, এক সময়ে যেটি ছিল নিতান্তই শখের জিনিস, বর্তমানে সেটি সংসারের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। ফলে প্রাত্যহিক জীবনে ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার দিন দিন এ শিল্পকে বিকশিত করছে। বর্তমান জীবনে গ্রাম থেকে শহর কিংবা শহরতলী সর্বত্রই ইলেকট্রনিক পণ্যের শোরুম দেখতে পাওয়া যায়। সময়ের পথপরিক্রমায় দেশী-বিদেশী ব্যান্ডকে পেছনে ফেলে ইলেকট্রনিকস পণ্যের ক্রেতাদের কাছে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে যমুনা ইলেকট্রনিকস। আমরা সবসময় ক্রেতাদের চাহিদা, সন্তুষ্টি ও ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে সর্বোত্তম পণ্যটি উৎপাদন করে থাকি, ফলে সব পর্যায়ের ক্রেতাদের কাছে যমুনা একটি কোয়ালিটি ইলেকট্রনিকস ব্র‍্যান্ড। সাশ্রয়ী মূল্য, গুণগত মান আর টেকসই এবং এ দেশের আবহাওয়ার উপযোগী পণ্য হওয়ায় যমুনা ইলেকট্রনিকস উৎপাদক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ও শক্তিশালী জায়গা দখল করে আছে।

প্রযুক্তি খাতে আপনারা বড় বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগের বিষয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

ইলেকট্রনিকস প্রযুক্তি খাতের শিল্প, তাই এখানে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। প্রযুক্তি খাতে ইনোভেশন বা উদ্ভাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিয়ত ক্রেতাদের চাহিদা আর মার্কেট ট্রেন্ড অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করতে হয়, ফলে এ খাতে বড় বিনিযোগের প্রয়োজন হয়।

যমুনা ইলেকট্রনিকস ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে নিত্যনতুন প্রযুক্তি সংবলিত অত্যাধুনিক মানের পণ্য উৎপাদন করে থাকে, আর এজন্য আমাদের উন্নত মেশিনারিজ এবং আর অ্যান্ড ডি-তে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। আমাদের বিশ্বমানের ল্যাবে প্রতিনিয়ত পণ্যের মান যাচাই করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে ডলার সমস্যায় ভুগছেন আপনারা, আমদানিসংশ্লিষ্ট ইলেকট্রনিকস খাত কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে?

বিশ্বের নানা প্রান্তে অস্থিতিশীল পরিবেশ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা গাজায় ইসরায়েলি হামলার ফলে খাদ্য ও পণ্যের স্বাভাবিক নিরাপত্তা এবং সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হচ্ছে, মূল্যস্ফীতির ফাঁদে পড়ছে মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে ডলার সংকট ও দাম বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানিসংশ্লিষ্ট ইলেকট্রনিক পণ্য এবং কাঁচামাল আমদানিতেও ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাছাড়া পরিবহনসহ অন্যান্য খাতে উৎপাদন খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে, ফলে উৎপাদনকারী কিংবা আমদানিকারককে পণ্যের মূল্য বাড়াতে হচ্ছে, যা এ শিল্পের জন্য নেতিবাচক।

ব্যাংক ঋণ পাওয়া নিয়ে কিছু জটিলতার অভিযোগ আছে। আবার ঋণের সুদ নিয়ে আপনাদের কিছু দাবি ছিল। বিষয়টি এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে?

দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক বিকাশের জন্য বিনিয়োগ করতে হলে অবশ্যই ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল রাখতে হবে। আর ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল রাখতে ব্যাংক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণ আরো সহজ ও দ্রুত করার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, ব্যাংক সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট করার। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদহার দুই অংকে পৌঁছে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। কারণ এটি ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়াবে এবং মুনাফায় প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে আমাদের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যাংক খাতের দিকে নজর দেয়ার পাশাপাশি সুদহার এবং ব্যাংক ঋণ সুবিধা নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে।

গুণগত মানের জায়গায় বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় পণ্য কতটা সক্ষম?

অবশ্যই সক্ষম। যমুনা ইলেকট্রনিকস উৎপাদন শুরুর প্রথম দিন থেকেই সর্বোচ্চ মানের পণ্যটি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, উন্নত কাঁচামাল আর প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী উৎকর্ষ সাধনের ফলে যমুনা ইলেকট্রনিকসের পণ্য আজ কোটি মানুষের আস্থায় ধন্য।

একটা সময় ছিল যখন দেশের বাজারে বিদেশী ব্যান্ডের ইলেকট্রনিক পণ্যের জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু সময়ের পথ পরিক্রমার বিদেশী ব্র‍্যান্ডের পণ্যকে পেছনে ফেলে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো ক্রেতাদের কাছে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। যমুনা ইলেকট্রনিকস তাদের মধ্যে অন্যতম। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে দেশীয় কোম্পানিগুলো সেরা মানের পণ্যটি গ্রাহকের হাতে তুলে দিচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

আমাদের প্রত্যাশা—বাজেট হবে বাস্তবসম্মত ও ব্যবসাবান্ধব, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে অর্থনীতি সংস্কারের মাধ্যমে অবশ্যই একটি কল্যাণমুখী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। আপনারা সবাই অবগত আছেন, গত এক যুগে ইলেকট্রনিকস শিল্প খাতে বিপুল অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে সরকারের শিল্পবান্ধব নীতিমালা এবং এ খাতে উদ্যোক্তাদের দেয়া নানান সুবিধার ফলে। দেশের ইলেকট্রনিকস এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্প খাতে কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীল পরিবেশ এ শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাছাড়া ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধি। গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ ব্যাংকের সদহার নানামুখী সমস্যা রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমাদের প্রত্যাশা—দেশীয় ইলেকট্রনিকস শিল্পের বিকাশ এবং দেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শুল্ককর যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে। এছাড়া করপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ ও অন্যান্য সুবিধা প্রণয়নেরও সুপারিশ করছি। ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ও সরকারের শিল্পবান্ধব নীতি-সহায়তা ইলেকট্রনিকস শিল্পকে বহুদূর এগিয়ে নেবে।

অভিযোগ আছে কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে অনেক পণ্য দেশে আসে, এ বিষয়ে আসলে কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

নানা কূট-কৌশল অবলম্বন করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশের বাজারে অনেক পণ্য প্রবেশ করে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় তেমনি নিম্নমানের পণ্যে ভোক্তারাও প্রতারিত হন। কর ফাঁকি দিয়ে এ সব পণ্য যাতে দেশের বাজারে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরো কঠিন নজরদারি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সততার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

দেশের ইলেকট্রনিকস খাতের বাজারে এখন কত টাকার? দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি এ খাতে বিদেশী কোনো বিনিয়োগ রয়েছে কিনা?

দেশের ইলেকট্রনিকস শিল্প খাতের বাজার এখন প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার মতো। এ শিল্পে বর্তমানে যমুনা ইলেকট্রনিকসের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। বর্তমানে দেশীয় বাজারে ৮০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার দেশীয় কোম্পানিগুলোর কাছে।

গত তিন যুগের ও বেশি সময় ধরে ধরে কিছু গ্লোবাল ব্র‍্যান্ড আমাদের দেশীয় বাজারে তাদের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর বাজার দখলের ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠান দেশে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে।