পাটের সোনালি অধ্যায় এখন অতীত। দেশের পাট খাতের বাজার পুনরুদ্ধার ও টেকসই করতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
বাংলাদেশের অতি পরিচিত সোনালি আঁশ সময়ের পরিক্রমায় এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনের ধাক্কায় নানা সংকটে পড়ে। বিশেষ করে কভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দা ও বাজারে চাহিদা হ্রাসের ফলে পাট খাতের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এছাড়া কিছু অনভিজ্ঞ ক্ষুদ্র পুঁজিপতিরা পাট মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন। ফলে কাঁচাপাটের মূল্য অযৌক্তিকভাবে বাড়ে। এতে পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও রফতানি মূল্য বাড়ছে না। দুই-তিন বছরে কার্পেট শিল্পে ব্যবহৃত পাটের সুতার চাহিদা কমে যায়। তবে তাঁতের মাধ্যমে উৎপাদিত পাটজাত পণ্য যেমন সেকিং ব্যাগ, হেসিয়ান ব্যাগ, ফুল ব্রাইট ব্যাগ ও সয়েল সেভারের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল আছে।
আশার কথা হলো ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পাটের সুতার চাহিদা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ তুরস্কে প্রায় ১১ হাজার টন পাটের সুতা রফতানি করেছে। ফেব্রুয়ারিতে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ টনে এবং মার্চে ১৪ হাজার ৫০০ টন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছরে প্রায় দেড় লাখ টন রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কয়েক বছর ধরে এ পরিমাণ ছিল গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন। তুরস্কের বার্ষিক চাহিদা প্রায় দুই লাখ টন। এ প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে সামনের বছরগুলোয় পাটজাত পণ্যের মোট রফতানি আগের দুই-তিন বছরের তুলনায় বেশি হবে। পাশাপাশি বৈশ্বিকভাবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, ফলে প্রাকৃতিক আঁশ হিসেবে পাট নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, পাটকলের আধুনিকীকরণ ও বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্যের উদ্ভাবনে মনোযোগ দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ খাত আবারো দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
পাট খাতে বৈচিত্র্যকরণ নিয়ে বহুদিন ধরে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি এগিয়ে নিতে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
পাটপণ্যের উৎপাদন ব্যয় ভারতের চেয়ে আমাদের এখানে অনেক বেশি। এর প্রধান কারণ এসব পণ্য এখনো পুরনো প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে। যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল জুট রোপ, বল বা মিনি স্কুল, হ্যান্ডিক্রাফটস, সেকিং ব্যাগ ও হেসিয়ান ব্যাগ ইত্যাদি তৈরিতে যেসব যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলোর উৎপাদনক্ষমতা অনেক কম। এতে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। যখন এসব পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারণ করা হয়, তখন তা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। বিদেশী ক্রেতারা বরং বাংলাদেশ থেকে শুধু পাটের সুতা আমদানি করে তুলনামূলক কম খরচে নিজেরা এসব পণ্য তৈরি করে। এতে বাংলাদেশ পাটপণ্য রফতানি বাজার হারায়। পাট খাত বহুমুখীকরণে অগ্রসর হতে হলে অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, উৎপাদন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী বিপণন কৌশলের প্রয়োগ এবং বাংলাদেশ মিশনগুলোর কার্যকর ভূমিকা। এ পথে এগোলে পাট শিল্প আবারো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বছরে গড়ে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পাটজাত পণ্য রফতানি হয়, সার্বিকভাবে প্রচেষ্টা করলে তা ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যে উন্নীত করা সম্ভব।
আসন্ন বাজেটে পাট খাতের উন্নয়নে আপনারা কী ধরনের ঘোষণা প্রত্যাশা করছেন?
পাটজাত পণ্য রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস করা হয়েছে, যা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। নগদ সহায়তায় উৎসে আয়কর ১০ শতাংশ, রফতানির বিল থেকে ১ শতাংশ অগ্রিম আয়কর, রফতানি বিলের ওপর রাজস্ব ফিস এবং কাঁচাপাট ক্রয়ের ওপর উৎসে আয়কর ১ শতাংশ প্রত্যাহার করা জরুরি। ডিউটি ড্র ব্যাক প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, ছয় বছর ধরে প্রাপ্তি স্থগিত আছে। অবিলম্বে এর সমাধান হওয়া দরকার। পাটজাত পণ্যকে অবিলম্বে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করাও প্রয়োজন, যা দীর্ঘদিন প্রক্রিয়াধীন আছে। ১৯টি পণ্যের ক্ষেত্রে পাট মোড়কী আইন ২০১০ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা জরুরি। এটি বাস্তবায়ন হলে পাট শিল্পের হারানো গৌরব অনেকাংশে ফিরে আসবে। পাট শিল্পের টেকসই উন্নয়নে সহজ শর্তে ব্যাংক লোন দেয়া প্রয়োজন।
পাট খাতের উন্নয়ন কীভাবে করা যায়?
বর্তমান পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি বেশির ভাগই অপ্রচলিত ও অদক্ষ, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। এসব কারখানায় আধুনিক মেশিনারি স্থাপন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার করে উপযোগী কর্মস্থল সৃষ্টি এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এ খাতে স্বল্পসুদে ঋণ, কর রেয়াত ও ভর্তুকি দিতে পারে। পুরনো ধারার শুধু ট্রাডিশনাল পণ্য ইয়ার্ন, বস্তা বা হেসিয়ান তৈরির বদলে এসব পাটকলে ডাইভারসিফায়েড ও হাইভ্যালু পণ্যের উৎপাদন চালু করা যেতে পারে, যেমন হোম টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, কম্পোজিট পণ্য, ইকো-ব্যাগ বা ফ্যাশন পণ্য। এসব পণ্যের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে পাট খাত কতটা এগোতে পেরেছে?
পাট খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গবেষণা ও উদ্ভাবন অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ধরে আকিজ বশির গ্রুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য পাটের মান ও রেটিং পদ্ধতি আধুনিকীকরণ এবং কৃষকদের পাট রেটিংয়ের খরচ কমানো। পাট চাষে কৃষকদের সহায়তা দিতে ৪৫ জন অভিজ্ঞ কৃষিবিদের সমন্বয়ে আমাদের একটি বিশেষজ্ঞ টিম কাজ করছে। এ টিম নিয়মিতভাবে কৃষকদের পাট চাষের উন্নত পদ্ধতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় পরিমাণ পাট বীজ উৎপাদনে সরকারি গবেষণার পাশাপাশি আমরা, জনতা ও সাদাত জুট মিলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি, আশা করি পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের পাটবীজ চাহিদার ৯৫ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়।










