বাজেট নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় আকিজ রিসোর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ফিড শিল্পের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন।
ফিড শিল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সমাধান কী?
ফিড শিল্পের সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের এখনো ফিড উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে সয়াবিন মিল, ভিটামিন ও মিনারেল জাতীয় উপাদান। এ আমদানিনির্ভরতা ডলার সংকট ও এলসি জটিলতার কারণে আরো তীব্র হয়েছে, ফলে কাঁচামাল সংগ্রহের সময় ও ব্যয় উভয়ই বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, বাজারে নিম্নমানের ফিডের উপস্থিতি, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে কৃষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তৃতীয়ত, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের খামারি এখনো গুণগত ফিডের গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি, যা তাদের উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় আমাদের কয়েকটি সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সরকারি পর্যায়ে ফিড শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং নীতিগত সহায়তা প্রদান করা জরুরি। পাশাপাশি ফিডের মান নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করতে হবে, যারা বাজারে নিম্নমানের পণ্য নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কৃষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রাখাও সমাধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
দেশে ফিড শিল্পের বর্তমান বাজার ও উৎপাদনক্ষমতা কেমন?
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের জন্য বছরে ৬৫-৭০ লাখ টন ফিডের চাহিদা রয়েছে, যার ৮৫-৯০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদনে পূরণ হচ্ছে। এটি একটি বড় মাইলফলক, কারণ এক দশক আগেও আমরা আমদানিনির্ভর ছিলাম। পোলট্রি ও ডেইরি খাতের দ্রুত বিকাশ ফিড শিল্পকে গতিশীল করেছে। গুণগত ফিড উৎপাদনই প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।
আকিজ ফিডের বাজার অংশীদারত্ব ও লক্ষ্য কী?
বাংলাদেশে ২৫০টির বেশি নিবন্ধিত ও ৮৩টি অনিবন্ধিত ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আকিজ ফিড অল্প সময়ের মধ্যেই এক হাজার টনের বেশি ক্যাটল ফিড বিক্রি করে কৃষকদের আস্থা অর্জন করেছে। আমাদের লক্ষ্য পোলট্রি, ক্যাটল ও মৎস্য ফিডে শীর্ষস্থানীয় হয়ে কৃষকদের জন্য সমন্বিত সমাধান প্রদান করা।
ফিডের কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা কমানোর উপায় কী?
সয়াবিন মিল, ভিটামিন প্রিমিক্স ও ফিশ মিলের ২৫-৩০ শতাংশ এখনো আমদানি করতে হয়। তবে স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক কাঁচামাল (যেমন সয়াবিন চাষ, মিনারেল সমৃদ্ধ ফসল) উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও গবেষণা জোরদার করতে হবে।
ভেটেরিনারি মেডিসিন শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
১০ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন এ শিল্পের বাজার ৪ হাজার কোটি টাকা, যার ৭৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। আকিজ ফিড শিগগিরই এ খাতে প্রবেশ করে বিশ্বমানের ওষুধ, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও গবেষণাভিত্তিক সমাধান নিয়ে আসবে। সরকারের নীতিগত সহায়তা (যেমন কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত) শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত করবে।
কৃষি খাতের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে?
আকিজ ফিড আইওটি ভিত্তিক স্মার্ট ফার্মিং প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেখানে সেন্সরের মাধ্যমে খামারের তাপমাত্রা, খাদ্যগ্রহণ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য মনিটরিং করা হবে। ডাটা বিশ্লেষণ করে রোগ প্রতিরোধ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি আমাদের লক্ষ্য। সরকারের উচিত স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তিতে বাজেট বরাদ্দ ও প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রদান করা।
২০২৫-২৬ বাজেটে আপনার প্রত্যাশা কী?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আমরা ফিড ও ভেটেরিনারি খাতের জন্য কিছু বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করছি। প্রথমত, ফিড উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং ভেটেরিনারি ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় সুবিধা প্রয়োজন, যা উৎপাদন খরচ কমিয়ে বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্মার্ট ফার্মিং প্রযুক্তি এবং আইওটি ভিত্তিক সরঞ্জামাদি আমদানিতে কর রেয়াত দেয়া যেতে পারে।
তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের খামারিদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা চালু করা প্রয়োজন, যাতে তারা সহজ শর্তে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে পারেন। সর্বোপরি গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ এ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আকিজ ফিড কেবল ফিড বিক্রয় করে না—আমরা পুষ্টি, প্রাণিসম্পদ স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে টেকসই কৃষির জন্য কাজ করছি। ভবিষ্যতের কৃষি হবে ডাটা চালিত, দক্ষ ও লাভজনক এটাই আমাদের অঙ্গীকার।










